ডাক্তারদের নীরব মানবিকতা বনাম ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা: দায় কার?
১৮ আগস্ট ২০২৫, সোমবার
জনতার কণ্ঠস্বর ডেস্ক:
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রতিদিন ঘটে চলেছে একের পর এক ট্র্যাজেডি। সরকারি হাসপাতালে ফ্লোরে শুয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, একশো বেডের হাসপাতালে ভর্তি থাকছে ৫০০ রোগী। আবার অপর দিকে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ— অতিরিক্ত টেস্ট, কমিশন, কিংবা রোগীর কথা না শোনা।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ডাক্তাররা প্রতিদিনই নীরবে এমন সব মানবিক কাজ করে যাচ্ছেন যা প্রচারের আলোয় আসে না। আর পুরো ব্যর্থতার দায়ভার আসলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপরেই বর্তায়।
নবজাতককে ফেলে পালানো, ডাক্তারদের চাঁদায় মুক্তি
একটি প্রাইভেট মেডিকেলে ১.৫ কেজি ওজনের এক শিশুর জন্ম হয়। গুরুতর অসুস্থতায় তাকে NICU-তে রাখা হয়। কিছুদিন পর মা সন্তানকে ফেলে পালিয়ে যান। এক মাসের চিকিৎসা শেষে বিল দাঁড়ায় প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। ইন্টার্ন ডাক্তাররা নিজেদের চাঁদা তুলে প্রায় ৫০ হাজার টাকা জোগাড় করেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে রাজি করিয়ে এক লাখ টাকা মওকুফ করান, তারপর শিশুটিকে রিলিজ করান।
রোগীর জানাজা থেকে শুরু করে নিজের রক্ত দেওয়া
অসহায় রোগীর জানাজার খরচ থেকে শুরু করে প্রসূতির জন্য রক্তের ব্যবস্থা— ডাক্তাররাই এগিয়ে আসেন। অনেকেই নিজের শরীর থেকে রক্ত দেন, নিজের বেতন দিয়ে রোগীর অপারেশনের খরচ বহন করেন। এমনকি কলেজ ছাত্ররা তাদের উৎসবের টাকা দিয়ে রোগীর ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালান।
দায় এড়াতে পারে না রাজনীতি
তবে এইসব মানবিকতার আড়ালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক গভীর সত্য— বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধ্বংস আজ পরিকল্পিত।
ডা. আহমেদ জুবায়ের স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,
“ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ না করে প্রশ্ন করুন— কেন দেশের এমপি-মন্ত্রীদের কেউ উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেয় না? কেন তাদের পরিবার-পরিজন বিদেশে চিকিৎসা নেয়, অথচ আপনাদের সন্তানকে সরকারি হাসপাতালের ফ্লোরে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হয়?”
হাতুড়ে চিকিৎসক আর ভাঙা সিস্টেম
দেশে ডেঙ্গু রোগীকে স্টেরয়েড ও ব্যথার ওষুধ দিয়ে মারাত্মক অপচিকিৎসা করা হচ্ছে হাতুড়ে ডাক্তারদের মাধ্যমে। অথচ এসব হাতুড়ে ক্লিনিকগুলো চালু থাকে প্রশাসনের আশীর্বাদে। রোগীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দায়ভার কারা নেবে?
রাজনৈতিক দায়
স্বাস্থ্যখাতে ভাঙন এসেছে বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি আর রাজনৈতিক উদাসীনতার কারণে। যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন তারা নিজেদের জন্য বিদেশে চিকিৎসা নিশ্চিত করেছেন, অথচ দেশের সাধারণ মানুষকে ফেলে রেখেছেন অবহেলায়।
আজ দেশের ডাক্তাররা প্রতিদিন নিজেদের রক্ত, টাকা, শ্রম দিয়ে রোগী বাঁচাচ্ছেন, অথচ রাজনীতিবিদরা তাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দায় এড়াচ্ছেন।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের আসল সংকট ডাক্তার নয়, সিস্টেম। আর এই সিস্টেমকে অকার্যকর ও দুর্বল করে রেখেছে রাজনীতি।
যেদিন এই দেশের জনগণ তাদের এমপি-মন্ত্রীদের উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে বাধ্য করতে পারবে, সেদিন থেকে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার আসল সংস্কার শুরু হবে। তার আগে নয়।