ফেসবুকে সেক্সের ওষুধের রমরমা ব্যবসা, অকাল মৃত্যুর হাতছানি ও জনস্বাস্থ্যের চরম ঝুঁকি
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এখন যেন মরণফাঁদ। বিশেষ করে ‘ইউনাইটেড হোমিওপ্যাথি ক্লিনিক’ সহ বেশ কিছু কথিত চিকিৎসা কেন্দ্রের পেজ থেকে ‘এক মাসেই পরিবর্তন’ বা ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন’ বলে যে সেক্সের ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ বিপদ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অনিবন্ধিত এবং উচ্চমাত্রার রাসায়নিক মিশ্রিত ওষুধ সেবনে লিভার, কিডনি বিকল হওয়া থেকে শুরু করে তাৎক্ষণিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে ১০০ ভাগ।
১. চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে বিষ
আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকার কথিত এই ক্লিনিকটি তাদের ফেসবুক পেজে অভিজ্ঞ চারজন চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ধরনের বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত অধিকাংশ ওষুধই ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (DGDA) অনুমোদিত নয়। ‘এক মাসেই স্থায়ী সমাধান’-এর লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশজুড়ে এই বিষ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
২. কেন এই ওষুধগুলো মৃত্যুর কারণ?
গবেষণায় দেখা গেছে, কথিত ‘হোমিওপ্যাথি’ বা ‘ভেষজ’ বলে দাবি করা হলেও দ্রুত ফল দেওয়ার জন্য এগুলোতে সিলেনাফিল (Sildenafil) বা টাডালাফিল-এর মতো উপাদানের অতি উচ্চমাত্রা ব্যবহার করা হয়। এর ফলে:
হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ: এই ওষুধ সেবনে রক্তচাপ হঠাৎ মারাত্মকভাবে কমে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
কিডনি ও লিভার বিকল: দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে শরীরের ছাঁকনি খ্যাত কিডনি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়।
মানসিক অবসাদ ও যৌন অক্ষমতা: সাময়িক উত্তেজনার পর শরীর স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং রোগী দীর্ঘমেয়াদী ডিপ্রেশনে ভোগে।
৩. আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ ও নিশ্চিত শাস্তি
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এই ধরনের ব্যবসা এবং প্রচারণা কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ:
ঔষধ ও কসমেটিকস্ আইন, ২০২৩: এই আইনের অধীনে লাইসেন্স ব্যতীত অনলাইনে ওষুধ বিক্রি করলে ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
দ্য ড্রাগস (কন্ট্রোল) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২: ধারা ১৪ অনুযায়ী, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ওষুধের কোনো প্রকার বিজ্ঞাপন দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর ব্যত্যয় ঘটলে ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান আছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন: মিথ্যা তথ্য দিয়ে পণ্য বিক্রি করলে জেল ও জরিমানা উভয় দণ্ডই হতে পারে।
৪. বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, যৌন সমস্যার জন্য কোনো চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ না হয়ে সরাসরি রেজিস্টার্ড ইউরোলজিস্ট বা সেক্সোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ফেসবুকের বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ডাক্তারদের পদবি (যেমন- DHMS) থাকলেও, এই ধরনের সেনসিটিভ ওষুধের ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা অনুমোদন ছাড়াই তা বিক্রি করা পুরোপুরি অনৈতিক ও বেআইনি।
সতর্কতা
“ইউনাইটেড হোমিওপ্যাথি ক্লিনিক”-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অনুমোদনহীনভাবে ফেসবুকের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো উপাদান বিক্রি করে থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ক্রেতা সাধারণের প্রতি অনুরোধ, নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে অনলাইনে এমন মরণঘাতি ওষুধ অর্ডার করবেন না।