কলারোয়ায় খাস জমির পজেশন বিক্রির অভিযোগ
ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, প্রশাসনের তদন্তে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা
নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
সাতক্ষীরার কলারোয়ায় সরকারি খাস জমির পজেশন অবৈধভাবে হস্তান্তর ও বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দেয়াড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান মফের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিধিবিধান ও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ২০২৩ সাল থেকে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় খাস জমির পজেশন ও দোকানঘর কথিতভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, অভিযোগ দেওয়ার পরও কথিত পজেশন হস্তান্তর ও দোকানঘর নির্মাণের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি; বরং কোনো কোনো এলাকায় তা আরও বেড়েছে।
সম্প্রতি কলারোয়া উপজেলার পশ্চিম খোর্দ এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও অভিযোগকারীদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়। অভিযোগের একটি অংশের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সরেজমিন তদন্তও করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
৬২ শতক জমির দাগে পাকা স্থাপনা
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, কলারোয়া উপজেলার ১০৩ নম্বর খোর্দ মৌজার ৪৬৭ নম্বর দাগে মোট ৬২ শতক জমি রয়েছে। এর মধ্যে ‘ক’ তপশিলভুক্ত ৫ শতক এবং ‘খ’ তপশিলভুক্ত ৫৪ শতক জমি রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, ওই দাগে ইউনিয়ন পরিষদের সম্পত্তি রয়েছে মাত্র প্রায় ৩ শতক। অথচ সেখানে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ঘরের পজেশন ৭ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বর্তমানে কয়েকটি স্থাপনার নির্মাণকাজও চলমান রয়েছে। ফলে সরকারি সম্পত্তির ওপর নতুন করে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
দোকানঘর বরাদ্দের নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, দোকানঘর কিংবা পজেশন বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে ২ লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের মধ্যে খোরদো গ্রামের ইমরান হোসেন, পাটুলিয়া গ্রামের গোলাম কিবরিয়া, উলুডাঙ্গা গ্রামের নজরুল গাজী, ওজিয়ার মোল্লা ও সোহগসহ একাধিক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে।
তাদের অভিযোগ, টাকা নেওয়ার পরও অনেককে দোকান বা পজেশন বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। এসব অর্থ সরকারি কোনো নির্ধারিত খাতে জমা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, সরকারি সম্পত্তির পজেশন বা দোকান বরাদ্দের নামে যদি অর্থ নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার যথাযথ হিসাব, রসিদ এবং সরকারি কোষাগারে জমার তথ্য প্রশাসনের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বীর মুক্তিযোদ্ধার একাধিক অভিযোগ
সরকারি সম্পত্তি রক্ষা এবং কথিত অবৈধ পজেশন হস্তান্তর বন্ধের দাবিতে উপজেলা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ করেছেন পশ্চিম খোর্দ এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা ইবাদুল্লাহ গাজী।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, দেয়াড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই মাহবুবুর রহমান মফের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি দখল, পজেশন হস্তান্তর এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
ইবাদুল্লাহ গাজীর দাবি, ইউনিয়নের হাট-বাজারসহ বিভিন্ন সরকারি সম্পত্তির পজেশন অন্যের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা যাচাই করে সরকারি সম্পত্তির মালিকানা, দখল, বরাদ্দ ও অর্থ লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব বের করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ইউএনওর নির্দেশে তদন্ত
এদিকে সরকারি সম্পদ বিক্রি, অর্থ আত্মসাৎ এবং আইন অমান্য করে খাস জমি অতিরিক্ত মূল্যে বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ এনে সম্প্রতি খোর্দ গ্রামের শওকত সরদারের ছেলে আলমগীর হোসেন কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলামের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরেজমিন তদন্ত করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা আরবি কর্মকর্তা সোহেল রানা।
তদন্ত কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, আলমগীর হোসেনের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তদন্তকাজ এখনও চলমান রয়েছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হবে।
তদন্ত কর্মকর্তার এই বক্তব্যের ফলে অভিযোগের অন্তত একটি অংশ প্রশাসনিকভাবে যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের আর্থিক পরিমাণ, দায়ী ব্যক্তির ভূমিকা এবং সরকারি সম্পত্তির প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
চেয়ারম্যানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এসব অভিযোগের বিষয়ে দেয়াড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান মফের বক্তব্য জানতে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে চেয়ারম্যানের পক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া সম্ভব হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য পাওয়ার পর বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপের দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি খাস জমি বা ইউনিয়ন পরিষদের সম্পত্তির পজেশন ব্যক্তি পর্যায়ে হস্তান্তর কিংবা বিক্রির সুযোগ থাকলে তা সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। একই সঙ্গে এসব জমি ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি বিরোধ, দখলদারিত্ব ও সাধারণ মানুষের হয়রানির আশঙ্কাও রয়েছে।
তাদের দাবি, তদন্ত দ্রুত শেষ করে ১০৩ নম্বর খোর্দ মৌজার ৪৬৭ নম্বর দাগের জমির প্রকৃত মালিকানা, শ্রেণি, খতিয়ান, দখল পরিস্থিতি, নির্মিত স্থাপনার বৈধতা এবং পজেশন হস্তান্তরের সঙ্গে জড়িত অর্থনৈতিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হোক।
একই সঙ্গে যেসব ব্যক্তি সরকারি সম্পত্তির পজেশন বা দোকান বরাদ্দের নামে অর্থ দিয়েছেন বলে দাবি করছেন, তাদের অভিযোগ ও অর্থ লেনদেনের প্রমাণ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
প্রশাসনের তদন্তে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার বক্তব্যের পর এখন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন কী আসে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।