তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক
বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ, সমপরিমাণ অনুদান; উপজেলা পর্যায় থেকে উদ্যোক্তা খুঁজে বের করার উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং উপজেলা পর্যায়ের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে নতুন একটি বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ: উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ নামে এই উদ্যোগের আওতায় নির্বাচিত তরুণ উদ্যোক্তারা তাঁদের প্রকৃত ব্যবসায়িক প্রয়োজনের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন সুবিধা পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ‘উদ্যোগ (UDYOG): উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ শীর্ষক নীতিমালা জারি করা হয়। সার্কুলারটি দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়ে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচিত উদ্যোক্তার জন্য সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়ন প্যাকেজের অর্ধেক থাকবে ব্যাংকঋণ এবং বাকি অর্ধেক দেওয়া হবে অনুদান হিসেবে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ সীমার ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ এবং সমপরিমাণ ১০ লাখ টাকা অনুদান পেতে পারেন। ঋণের ক্ষেত্রে কোনো সহায়ক জামানত দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু ঋণ দেওয়া নয়; বরং উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করা, প্রকৃত উদ্যোক্তা নির্বাচন করা, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা, উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দেওয়া এবং বাজারের সঙ্গে তাদের সংযোগ তৈরিতে সহায়তা করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় তরুণদের আয় উৎসারী, উৎপাদনমুখী ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে অর্থায়নের আওতায় এনে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যেসব উদ্যোগে পাওয়া যাবে অর্থায়ন
‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির আওতায় নির্দিষ্ট একটি খাতের ব্যবসাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবা খাতসহ বৈধ বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগ এ কর্মসূচির আওতায় বিবেচিত হবে। নতুন কোনো উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণার পাশাপাশি বিদ্যমান বৈধ ব্যবসায়িক উদ্যোগও নীতিমালার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অর্থায়নের জন্য বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-কমার্স, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, ফিনটেক, এডটেক, এগ্রিটেক ও হেলথটেকের মতো নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, পর্যটন এবং স্থানীয় সম্পদভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।
কারা আবেদন করতে পারবেন
নীতিমালা অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে আবেদনের ক্ষেত্রে বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা। আবেদন জমা দেওয়ার শেষ তারিখে আবেদনকারীকে সর্বোচ্চ ২৮ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিক হতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শর্তও রয়েছে।
ঋণখেলাপিদের এই কর্মসূচির আওতায় অর্থায়নের সুযোগ থাকবে না। সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীর ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো বা সিআইবি প্রতিবেদনে ঋণখেলাপির তথ্য পাওয়া গেলে আবেদন বাতিল হওয়ার বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি, আধা-সরকারি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরাও এই কর্মসূচির আওতায় অর্থায়নের জন্য যোগ্য হবেন না। নীতিমালায় আবেদনকারীর দেওয়া তথ্যের সত্যতা এবং ব্যবসায়িক ধারণার মৌলিকত্বের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অসত্য তথ্য দেওয়া বা অন্যের ব্যবসায়িক ধারণা নিজের নামে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে আবেদন বাতিল এবং সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীকে কালো তালিকাভুক্ত করার বিধান রয়েছে।
ঋণের সঙ্গে থাকছে অনুদান
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ কর্মসূচির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ঋণের পাশাপাশি সমপরিমাণ অনুদানের ব্যবস্থা। ফলে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার প্যাকেজের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ কাঠামো তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক মূলধনের চাপ কমানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহক পর্যায়ে সুদ বা মুনাফার হার সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনুদানের অংশ সুদবিহীন ঋণে রূপান্তরিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ অনুদান পাওয়ার সুযোগ থাকলেও কর্মসূচিটির অর্থায়নকে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত অর্থ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। উদ্যোক্তাকে নীতিমালার শর্ত, ব্যবসার কার্যকারিতা এবং ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে।
প্রথম ধাপে ৬৪ উপজেলায় কার্যক্রম
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, কর্মসূচিটির প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আট বিভাগের আট জেলার ৬৪টি উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানানো হয়েছে। ওই পর্যায়ে উপজেলা থেকে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজে বের করে তাদের অর্থায়নের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে কর্মসূচির আওতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। এর ফলে উপজেলা পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে সীমিত মূলধনের কারণে ব্যবসায়িক উদ্যোগ শুরু করতে না পারা তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
শুধু অর্থায়ন নয়, উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্ব
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং বাজার সংযোগের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো তরুণকে শুধু অর্থ দিয়ে ব্যবসা শুরু করিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তাকে টেকসই উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সম্পদ, কৃষি, খাদ্য, হস্তশিল্প, পর্যটন ও সেবা খাতকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ তৈরি হলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে গ্রাম থেকে শহরমুখী কর্মসংস্থানের চাপ কিছুটা কমিয়ে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা
নীতিমালাটি বাস্তবায়নের জন্য দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। ফলে কর্মসূচিটির বাস্তবায়নে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে আবেদন যাচাই, উদ্যোক্তা নির্বাচন, অর্থায়ন ও ঋণ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, তরুণ উদ্যোক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা যাচাই এবং প্রকৃত ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অনুদান ও ঋণের অর্থ যাতে নির্ধারিত ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার হয়, সে বিষয়েও যথাযথ তদারকি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থান ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে কর্মসূচিটির কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করবে যোগ্য উদ্যোক্তা নির্বাচন, অর্থের যথাযথ ব্যবহার, ব্যাংকগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী পর্যায়ের তদারকির ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত নীতিমালাই এ সংবাদের প্রধান তথ্যসূত্র। পাশাপাশি বিএনপির মিডিয়া সেল থেকেও এ কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্য প্রচার করা হয়েছে; তবে সরকারি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্যগুলোই প্রতিবেদনে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।