নিজস্ব প্রতিবেদক
পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার শাহাবুদ্দিন কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং বিতর্কিত শিক্ষাগত সনদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলো ঘিরে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, নিয়োগ প্রক্রিয়া, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষকদের যোগ্যতা যাচাই নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, মাদ্রাসার বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করার প্রবণতা রয়েছে। এর মধ্যে অধ্যক্ষ আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে ৫ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের একটি গুরুতর অভিযোগও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, প্রশাসনিক রেকর্ড এবং দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে বিষয়গুলো যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৫ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ
অধ্যক্ষ আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর একটি হলো ৫ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ। অভিযোগের প্রকৃতি, কার সঙ্গে লেনদেন এবং কোন প্রশাসনিক কাজের বিনিময়ে এই অর্থ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত যাচাই প্রয়োজন।
ঘুষের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত অনিয়মের বিষয় নয়; বরং একটি ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অন্যদিকে অভিযোগটি সত্য না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ কীভাবে এসেছে, তারও অনুসন্ধান প্রয়োজন।
এ কারণে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আর্থিক লেনদেনের নথি, ব্যাংক হিসাব, নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং মাদ্রাসার প্রশাসনিক রেকর্ড যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ
মাদ্রাসাটির শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় সনদ যাচাইয়ের পাশাপাশি স্বচ্ছ ও বিধিসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ, সনদ যাচাই, নিয়োগ কমিটির সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা অনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কোনো আর্থিক লেনদেন বা অনিয়ম হয়ে থাকলে তা নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে সহজেই নির্ধারণ করা সম্ভব।
জাল বা বিতর্কিত সনদের অভিযোগ
মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে কোনো শিক্ষক জাল, ভুয়া বা বিতর্কিত সনদ ব্যবহার করে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন কি না—এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে একজন জুনিয়র শিক্ষক ফারজানার শিক্ষাগত সনদ নিয়েও প্রশ্ন ওঠার কথা জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর সনদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর প্রায় দুই মাস ধরে বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে।
তবে বেতন-ভাতা বন্ধ থাকার প্রকৃত কারণ কী, এ বিষয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের লিখিত সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না এবং সনদ যাচাইয়ের জন্য কোনো তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
কোনো শিক্ষকের সনদ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটি সামাজিক বা মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর বা অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা উচিত।
অধ্যক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগগুলোর একটি অংশে মাদ্রাসার প্রশাসনিক কার্যক্রমে অধ্যক্ষ আব্দুর রহিমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে নিয়োগ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং সনদ যাচাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কতটা স্বচ্ছতা ও নিয়মনীতি অনুসরণ করেছে—তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর নিজস্ব বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিযোগের বিপরীতে তাঁর ব্যাখ্যা, সংশ্লিষ্ট নথি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত জানার সুযোগ না থাকলে প্রতিবেদনটি একপাক্ষিক হয়ে যেতে পারে।
বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা
অভিযোগগুলোর বিষয়ে অধ্যক্ষ আব্দুর রহিমের বক্তব্য জানার জন্য দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক জানিয়েছেন। তাঁকে লিখিতভাবে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়েছে।
বিশেষভাবে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে—৫ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য কী, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, জুনিয়র শিক্ষক ফারজানার শিক্ষাগত সনদ কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল,

তাঁর বেতন-ভাতা কেন প্রায় দুই মাস বন্ধ রয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো লিখিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা তদন্ত হয়েছে কি না।
এ ছাড়া মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষক-কর্মচারীর সনদ যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কেও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
তবে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রস্তুত হওয়ার সময় পর্যন্ত অধ্যক্ষ আব্দুর রহিমের কোনো বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি বক্তব্য না দিলে সেটিকে অপরাধ স্বীকার বা অভিযোগের সত্যতা হিসেবে গণ্য করা যায় না। তাঁর বক্তব্য পাওয়ার সুযোগ প্রতিবেদনের পরবর্তী সংস্করণেও উন্মুক্ত থাকবে এবং তিনি যে ব্যাখ্যা বা নথি দেবেন, তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগগুলো নিয়ে কোনো পক্ষের প্রতি পূর্বধারণা তৈরি না করে একটি নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তে মাদ্রাসার নিয়োগসংক্রান্ত সব নথি, শিক্ষক-কর্মচারীদের শিক্ষাগত সনদ, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন, নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাচাই করা যেতে পারে।
বিশেষ করে ৫ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং প্রয়োজনীয় নথি পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।
একইভাবে শিক্ষক ফারজানার সনদ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটিও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যাচাই করা প্রয়োজন। সনদ বৈধ হলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অবসান ঘটবে এবং কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা, মিথ্যা হলে দায় নির্ধারণের দাবি
শিক্ষাঙ্গনে দুর্নীতি, ঘুষ, নিয়োগ বাণিজ্য কিংবা জাল সনদের মতো অভিযোগ অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগ মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হলে যাঁরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
কারণ একজন শিক্ষকের সনদ নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ যেমন তাঁর পেশাগত ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষতি করতে পারে, তেমনি প্রকৃতপক্ষে কোনো অনিয়ম থাকলে সেটি তদন্ত ছাড়া উপেক্ষা করাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর।
কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, শাহাবুদ্দিন কামিল মাদ্রাসার বিষয়ে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগের নথি, শিক্ষাগত সনদ, আর্থিক লেনদেন এবং বেতন-ভাতা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি এবং প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করা। সেখানে নিয়োগ বাণিজ্য, ঘুষ, সনদ জালিয়াতি বা প্রশাসনিক অনিয়মের মতো অভিযোগের ছায়া পড়লে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
তাই ভান্ডারিয়া শাহাবুদ্দিন কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদও অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, নথিপত্র ও প্রমাণ প্রকাশের সুযোগ রাখছে। তদন্তে অভিযোগ সত্য, আংশিক সত্য কিংবা ভিত্তিহীন—যে ফলই পাওয়া যায়, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই তা পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে।