ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির কথিত অডিও ঘিরে তীব্র প্রশ্ন
‘দেশের সব পুলিশ আওয়ামী লীগের পক্ষে’, ‘হাসিনা ফিরলে পুলিশ সহযোগিতা করবে’—কথিত বক্তব্যের সত্যতা যাচাই ও তদন্তের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নামে একটি কথিত অডিও রেকর্ডকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রচারিত বক্তব্যে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশের পুলিশ বাহিনীর রাজনৈতিক অবস্থান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা এবং পুলিশি সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করতে শোনা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে অডিওটির পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড, উৎস, রেকর্ডের সময় ও প্রেক্ষাপট এবং কণ্ঠের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এসব বক্তব্যকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
প্রচারিত বক্তব্যের দাবি অনুযায়ী, ওই কর্মকর্তা কথোপকথনের একপর্যায়ে বাংলাদেশের পুলিশের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগের পক্ষে রয়েছে—এমন মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একইসঙ্গে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে পুলিশ তাকে সহযোগিতা করবে—এমন বক্তব্যও দিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
আরও অভিযোগ করা হচ্ছে, কথিত ওই বক্তব্যে শেখ হাসিনার দ্রুত দেশে ফিরে আসার প্রসঙ্গও এসেছে।
একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার নামে এমন বক্তব্য প্রচারিত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—কোনো সরকারি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনকালে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কোনো রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক নেতার বিষয়ে এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন কি না এবং এমন বক্তব্য সত্য হলে তার প্রশাসনিক ও আইনগত দায় কতটুকু।
বক্তব্য সত্য হলে তদন্ত জরুরি
কথিত অডিওর বক্তব্য সত্য হলে বিষয়টি শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মতামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা পুলিশের নিরপেক্ষতা, দায়িত্বশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত কথিত অডিওটির ফরেনসিক পরীক্ষা, কণ্ঠ শনাক্তকরণ, পূর্ণ রেকর্ড উদ্ধার এবং বক্তব্যের সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা।
একইসঙ্গে ওই কর্মকর্তাকে বক্তব্যের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ দেওয়াও প্রয়োজন। অডিওটি সম্পাদিত, খণ্ডিত বা প্রসঙ্গের বাইরে প্রচারিত হয়েছে কি না—তাও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।
ঢাকার থানাগুলোর কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অতীত নিয়েও প্রশ্ন
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় ঢাকার বিভিন্ন থানার তৎকালীন ওসিদের ভূমিকা নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, আন্দোলনের সময় ডিএমপির ৫০ থানায় দায়িত্ব পালন করা ৫৮ জন ওসির মধ্যে মাত্র ১০ জন কোনো না কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়েছিলেন। একই প্রতিবেদনে পুলিশের তৎকালীন আইজি বলেছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং শুধু পুলিশ সদস্য হওয়ার কারণে কাউকে হয়রানি না করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
এ ধরনের তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে কোনো সাধারণীকরণ না করে প্রত্যেক কর্মকর্তার অতীত ভূমিকা, নিয়োগ, পদায়ন, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং অভিযোগ পৃথকভাবে যাচাই করার দাবি উঠতে পারে।
‘সব ওসি আওয়ামী লীগের’—দাবিটির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের বিভিন্ন থানার ওসিদের রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়লেও ‘দেশের সব থানার ওসি আওয়ামী লীগের’ বা ‘ঢাকার সব থানার ওসি আওয়ামী লীগের’—এ ধরনের সর্বব্যাপী দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্য পাওয়া না গেলে তা সংবাদ হিসেবে নিশ্চিতভাবে প্রকাশ করা সমীচীন নয়।
বরং কোন কর্মকর্তা কোন সময়ে কোথায় দায়িত্ব পালন করেছেন, অতীতে কোনো রাজনৈতিক সরকারের সময় কী দায়িত্বে ছিলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা, বিভাগীয় তদন্ত বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে কি না—এসব তথ্যের ভিত্তিতে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পুলিশ সদস্যদের পদায়ন নিয়ে অভিযোগ
আরেকটি অভিযোগ হলো, রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমতাবলম্বী বা বিএনপিপন্থী পরিবারের সদস্যদের পুলিশ বাহিনীতে পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে এবং ঢাকায় পদায়নের জন্য অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের প্রয়োজন হয়।
তবে এই অভিযোগেরও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, নির্দিষ্ট কর্মকর্তা, নির্দিষ্ট পদায়ন এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
যদি এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা থাকে, তাহলে তা তদন্তের আওতায় এনে পদায়ন ও বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, পেশাগত নিরপেক্ষতাই পুলিশের ভিত্তি
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য দেখানো নয়; বরং সংবিধান, আইন এবং জনগণের নিরাপত্তার প্রতি দায়িত্ব পালন করা।
কোনো পুলিশ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে যে রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করেন, সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয় হতে পারে। কিন্তু দায়িত্ব পালনের সময় রাজনৈতিক পক্ষপাত, কোনো দল বা নেতার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করা হলে তা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এ কারণে কথিত অডিওটি সত্য হলে যথাযথ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠতেই পারে। তবে তদন্তের আগে ওই কর্মকর্তাকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’, ‘দালাল’ বা অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে আখ্যায়িত করা আইনগতভাবে নিরাপদ নয়।
নিয়োগ ও সংস্কার নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন
পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনার অংশ। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক এড়াতে মেধা, পেশাগত দক্ষতা, সততা, মানবাধিকার ও আইনানুগ দায়িত্ব পালনের রেকর্ডকে পদায়নের প্রধান মানদণ্ড করার দাবি উঠছে।
একইসঙ্গে যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টের সহিংসতা, রাজনৈতিক পক্ষপাত, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অন্য কোনো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে কর্মকর্তার অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের প্রতি প্রশ্ন
কথিত অডিওটি সত্য কি না—তা তদন্ত করবে কে?
একজন থানার ওসি সত্যিই যদি পুলিশ বাহিনীর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এমন বক্তব্য দিয়ে থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত হবে কি না?
পুলিশের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা কী?
বদলি, পদায়ন ও নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ কি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে নয়, বরং সংবিধান ও আইনের প্রতি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, দৃশ্যমান প্রশাসনিক সংস্কার, স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইনের সমান প্রয়োগের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি—কথিত অডিওটির সত্যতা দ্রুত যাচাই করা হোক, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হোক এবং অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একইসঙ্গে কোনো নিরপরাধ পুলিশ সদস্য যেন কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।