উখিয়ার দুই কলেজে এইচ.এস.সি ফলাফলের বিপর্যয়: কারণ ও বিশ্লেষণ
প্রতিবেদন: কামরুন তানিয়া, উখিয়া থেকে
তারিখ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫
উখিয়া সরকারি কলেজ ও উখিয়া মহিলা কলেজ— দুটি প্রতিষ্ঠানের এবারের এইচ.এস.সি পরীক্ষার ফলাফল স্থানীয় সমাজে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বহু বছর ধরে শিক্ষার উৎকর্ষে এগিয়ে থাকা এই দুই কলেজে এমন হতাশাজনক ফলাফল কেন, সেই প্রশ্ন ঘুরছে অভিভাবক থেকে শুরু করে শিক্ষানুরাগী মহলে।
অনেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক এনজিও চাকরির প্রবণতাকে দায়ী করছেন, কেউ আবার রাজনৈতিক প্রভাব বা সামাজিক অবক্ষয়কে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— এই বিপর্যয়ের কারণ একক নয়; বরং এটি সামাজিক, পারিপার্শ্বিক, প্রযুক্তিগত ও শিক্ষাগত নানা ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল।
নিচে মূল কারণগুলো বিশ্লেষণধর্মীভাবে তুলে ধরা হলো—
১. ডিজিটাল আসক্তি ও সময় অপচয়
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চেয়ে মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত সময় ব্যয়— বিশেষ করে টিকটক, ফেসবুক রিলস ও অনলাইন গেমিং— তাদের মনোযোগ ও একাডেমিক ফোকাস নষ্ট করছে।
২. অভিভাবকীয় নজরদারির ঘাটতি
বেশিরভাগ অভিভাবক সন্তানদের পড়াশোনার অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করেন না। সন্তানদের খেয়ালখুশি পূরণে তৎপর হলেও তাদের শিক্ষাগত অগ্রগতি নিয়ে দায়িত্বশীলতা কম।
৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত ক্লাস ও তদারকি দুর্বলতা
শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, ক্লাস না নেওয়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা শিক্ষার মান কমিয়ে দিচ্ছে। কিছু শিক্ষক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি যুক্ত থাকায় একাডেমিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
৪. অটোপাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব
বিগত সময়ে অটোপাশের সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মতুষ্টি সৃষ্টি করেছে। পরিশ্রম না করেও পাস করা যাবে— এমন মানসিকতা শিক্ষায় শৃঙ্খলা নষ্ট করেছে।
৫. প্রশিক্ষিত ও আপডেট শিক্ষকের অভাব
নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি বা প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাদানে অনেক শিক্ষক এখনো অদক্ষ। ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হারাচ্ছে।
৬. রাজনীতিতে শিক্ষার্থীদের অতি সম্পৃক্ততা
শিক্ষার পরিবর্তে ছাত্র রাজনীতি, মিছিল-মিটিং ও সংগঠনের কর্মকাণ্ডে সময় নষ্ট করাটা ফলাফল বিপর্যয়ের একটি বড় কারণ।
৭. মাদকাসক্তি ও অনৈতিক সম্পর্ক
কিছু শিক্ষার্থী নেশা, পরকীয়া ও অসামাজিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। এতে একদিকে তাদের মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পড়াশোনার প্রতি অনীহা বাড়ছে।
৮. লাইব্রেরির অপ্রয়োগ
কলেজে লাইব্রেরি থাকলেও সেটি ব্যবহার হয় না। শিক্ষার্থীরা বইয়ের পরিবর্তে সময় কাটায় চায়ের দোকান বা রাস্তায় গল্প-আড্ডায়।
৯. রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক চাকরির ভ্রান্ত ধারণা
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিও চাকরির আশায় অনেকে এইচ.এস.সি শেষ না করেই পড়াশোনা থেকে বিমুখ হচ্ছে। অথচ বাস্তবে চাকরির সুযোগ সেখানে অত্যন্ত সীমিত।
১০. পারিবারিক অবাধ্যতা ও বিলাসী মানসিকতা
অল্প বয়সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিলাসপ্রবণতা তরুণদের পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত করছে।
১১. ছাত্র রাজনীতি ও আন্দোলনের অজুহাতে একাডেমিক ক্ষতি
ছাত্র রাজনীতি অনেক সময় শিক্ষার পরিবেশকে প্রতিযোগিতামূলক নয়, বরং বিভাজিত করছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মানসিক মনোযোগ বিচ্যুত হচ্ছে।
১২. সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়
অশ্লীল ভিডিও, প্রেমনির্ভর গান, অনলাইন কনটেন্ট ও “পণ্য গ্রাফিক্স”–এ আসক্তি শিক্ষার্থীদের নৈতিক ভারসাম্য ও একাগ্রতা নষ্ট করছে।
—
সমাধান ও উত্তরণের পথ
এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য দায় চাপিয়ে না দিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
অভিভাবকদের আরও সক্রিয় নজরদারি ও নৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
শিক্ষক ও প্রশাসনকে একাডেমিক তদারকি ও ক্লাসনিয়ম কঠোরভাবে মানতে হবে।
প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে— যেমন অনলাইন ক্লাস, ই-লার্নিং ও ডিজিটাল লাইব্রেরি।
সামাজিক মূল্যবোধ ও শ্রদ্ধাবোধ ফিরিয়ে আনতে হবে পরিবার ও বিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে।
সবশেষে বলা যায়—
উখিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার এই সংকট সাময়িক হলেও উদ্বেগজনক। এখনই যদি অভিভাবক, শিক্ষক, প্রশাসন ও সমাজ একসাথে কাজ না করে, তবে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে। শিক্ষা শুধু সনদ নয়— এটি জাতির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ড যেন আবারও দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়, সেটাই সময়ের দাবি।
—