প্রকাশিত: ৫ জুলাই ২০২৫
অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট
শেখ আফিল উদ্দিন: চারবার এমপি, চল্লিশ টি অভিযোগ—একটি নৈতিক পতনের প্রতিচ্ছবি আর সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো।
ভূমিকা: শার্শার রাজনীতিতে একটি বিতর্কিত নাম
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যিক ও সীমান্তবর্তী এলাকা বেনাপোল-শার্শা। এখানে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিত শেখ আফিল উদ্দিন—একাধারে চারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য, আবার একাধিক বিতর্ক ও অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু।
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে যখন নির্বাচন, প্রশাসন, সীমান্ত ও সমাজ—সব খাতে অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তখন বিষয়টি কেবল ব্যক্তির নয়, পুরো ব্যবস্থার প্রশ্ন তুলে দেয়।
—
🧾 চারবার নির্বাচিত, চার দফা অভিযোগ: এক নজরে
বিষয় সময়কাল মূল অভিযোগ
নির্বাচনী জালিয়াতি ২০১৪, ২০১৮ ভয়েস রেকর্ড ফাঁস—ভোট কিভাবে কারসাজি করতে হয় শেখাচ্ছেন
পুলিশ কর্মকর্তার ওপর চড়াও ২০১৫ শার্শা থানার ওসি এনামুল হককে হেনস্থা ও অপদস্থ
সীমান্ত চোরাচালান ও মাদক সিন্ডিকেট চলমান বেনাপোল হয়ে ইয়াবা, গরু, সোনা পাচার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
ছাত্র-আন্দোলন দমন ও খুনের মামলায় নাম ২০২৪ কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের হামলায় নিহত ছাত্র—FIR-এ নাম
—
ভোট শেখানোর অডিও: “রাতেই ভোট করে ফেলো, দিনের দরকার কী?”
২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে এক ভয়েস রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে শেখ আফিল উদ্দিন বলছেন—
> “ভোটের দিন না, আগের রাতে ভোট শেষ করে ফেলো। যাদের দরকার, তাদের ঢুকিয়ে দাও। যারা বিরোধিতা করবে, তাদের আটকে রাখো।”
এই ভয়েস ক্লিপটি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশীয় রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নির্বাচন কমিশন অস্বস্তিকর নীরবতা পালন করে। দলীয়ভাবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
—
পুলিশকে দলীয় দাস বানানোর অভিযোগ
২০১৫ সালে শার্শা থানার ওসি এনামুল হককে এক সভায় অপমান ও হুমকি দেন আফিল উদ্দিন। ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকেও অভিযোগ জানানো হয়, কিন্তু তৎকালীন জেলা প্রশাসন সেটিকে “ভুল বোঝাবুঝি” বলে ফাইল চাপা দেয়।
এই ঘটনাই বারবার প্রমাণ করে, আফিল উদ্দিন প্রশাসনকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে এনে তাঁর ব্যক্তিস্বার্থ বাস্তবায়ন করে এসেছেন।
—
সীমান্ত বাণিজ্য না সিন্ডিকেট?
বেনাপোল বন্দরে পণ্য আমদানি-রপ্তানি, পাসপোর্ট যাত্রী চলাচল, ও অবৈধ গরু-সোনা পাচারের ক্ষেত্রে আফিল উদ্দিনের ঘনিষ্ঠজনদের নাম স্থানীয়ভাবে বারবার আলোচিত।
বিশেষ করে “জয়নাল সিন্ডিকেট”, “নাসির ট্যুরিজম” ও কিছু রাজনৈতিক কর্মীকে ঘিরে তৈরি হয় এক অদৃশ্য চোরাচালান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা—যেখানে থানার পুলিশ, কাস্টমস, এমনকি স্থানীয় সাংবাদিকরাও মুখ খুলতে সাহস করেন না।
—
কোটা আন্দোলনের সময় ছাত্র নিহত, এফআইআরে আফিলের নাম
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় যশোর-শার্শা অঞ্চলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন এক ছাত্রনেতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এক ভিডিও—যেখানে দেখা যায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে পুলিশ কনভয়ে শেখ আফিল উদ্দিন নিজেই উপস্থিত ছিলেন।
নিহতের পরিবার থানায় এফআইআর করলে সেখানে শেখ আফিল উদ্দিনসহ ৬ জন আওয়ামী লীগ নেতার নাম উঠে আসে। যদিও মামলাটি রহস্যজনকভাবে “রাজনৈতিক নির্দেশে স্থগিত” হয়।
—
📉 শার্শার মানুষ কী ভাবছে?
> “ভোট তো দিতাম, কিন্তু ওনি ভোটের আগেই বাক্স ভর্তি করতেন।” — এক স্থানীয় বৃদ্ধা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)
> “কোথায় না ছুঁয়েছেন উনি? সীমান্ত, হাসপাতাল, প্রশাসন—সবখানেই ওনার হাত।” — একজন ব্যবসায়ী
> “দীর্ঘদিন এমপি হয়ে থেকেও শার্শায় বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক হাসপাতাল তো দূরের কথা, একটা ভালো ড্রেনেজ সিস্টেমও হয়নি।” — এক যুবক ভোটার
—
🔚 উপসংহার: ক্ষমতা যখন অপরাধের ঢাল
শেখ আফিল উদ্দিন চারবার এমপি হয়েছেন। কিন্তু জনগণের অধিকার রক্ষার চেয়ে নিজের প্রভাব বিস্তার, নির্বাচনী কারসাজি, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, এবং সীমান্তের চোরাচালান সিস্টেমের অপব্যবহারেই তাঁর পরিচিতি বেশি। দলীয় ছত্রচ্ছায়ায় এসব অপরাধ ধামাচাপা থাকলেও, জনগণের স্মৃতিতে প্রতিটি অন্যায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে।
প্রশ্ন রয়ে যায়—দল কি তাঁকে আশ্রয় দিয়ে প্রকৃতপক্ষে নিজেদেরও কালিমালিপ্ত করছে না?
—
🖋️
Daily Prothom Bangladesh
শার্শা, যশোর