২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, সময়: রাত ১২:৪৫
জনতার কণ্ঠস্বর ডেস্ক
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ – জনতার কণ্ঠস্বর
www.bangladeshprothomsangbad.com
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাসে রাজনীতি ও সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকা সবসময় বিতর্কিত আলোচনার বিষয়। পাকিস্তানের নবাব বংশের সন্তান, সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল খাজা ওয়াসি উদ্দিন ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান আর্মির একজন সম্মানিত জেনারেল। ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি অবস্থায় তিনি তুলনামূলক আরামদায়ক জীবনযাপনের সুযোগ করে দেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য থেকে জানা যায়।
তথ্যমতে, গৃহবন্দি অবস্থায় শেখ মুজিবের জন্য বরাদ্দ ছিল সজ্জিত এ/সি ডুপ্লেক্স বাড়ি, ব্যক্তিগত বাবুর্চি, কক্ষে গ্রামোফোনে বাংলা গানের লং প্লে রেকর্ড, প্রতিদিনের উর্দু ও ইংরেজি সংবাদপত্র। এই সময়ে ওয়াসি উদ্দিন নিয়মিত তার সঙ্গে দেখা করতেন এবং খোঁজখবর নিতেন। পাকিস্তানি সেনাদের ভেতর থেকেও তিনি মুজিবের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।
তবে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে খাজা ওয়াসি উদ্দিনকে সেনাপ্রধান করার প্রশ্নে শেখ মুজিব অনীহা দেখান। সেনাপ্রধান শফিউল্লাহসহ অনেকেই এই প্রস্তাব দেন। জনসাধারণের মধ্যেও তাঁকে নিয়ে ইতিবাচক আশা ছিল। কিন্তু শেখ মুজিব মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের চাপ ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের কারণে পাকিস্তানফেরত এই সেনা কর্মকর্তাকে প্রাধান্য দেননি। পরবর্তীতে তাঁকে কুয়েতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানো হয়। পরে জিয়াউর রহমান তাঁকে ফ্রান্স এবং জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দেন।
১৯৮২ সালে ঢাকার এক সামাজিক অনুষ্ঠানে এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিলেন তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফিরোজ সালাউদ্দিন। তিনি উল্লেখ করেন, মুজিব “অকৃতজ্ঞ” চরিত্রের পরিচয় দিয়েছিলেন, কারণ যিনি তাঁর বন্দিজীবনে এতটা সহায়তা করেছিলেন, তাকেই পরবর্তীতে সেনাপ্রধানের পদ থেকে বঞ্চিত করেন।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেন নৌবাহিনীর তৎকালীন মন্ত্রী ক্যাপ্টেন নুরুল হক ভূঁইয়া। তিনি জানান, তাঁর শিক্ষক রিয়ার অ্যাডমিরাল এম.এইচ. খানকে নৌপ্রধান করতে মুজিব কোনো দ্বিধা করেননি, বরং তাৎক্ষণিকভাবে সম্মতি দেন।
ফলত, ইতিহাসবিদদের মতে, শেখ মুজিব কৃতজ্ঞতার রাজনীতি নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছিলেন। তবুও সমালোচকরা মনে করেন, এই সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত তাঁকে জনমানসে দুর্বল ও একঘরে করে তোলে।
লে. জেনারেল খাজা ওয়াসি উদ্দিন ১৯৯২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হলেও, বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে তাঁর অবদান এবং মুজিবকে ঘিরে তাঁর ভূমিকাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—শেখ মুজিব কি সত্যিই অকৃতজ্ঞ ছিলেন, নাকি সময়ের রাজনৈতিক চাপে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে?