বিশেষ প্রতিবেদন | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
ঢাকা | ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে আরও আধুনিক, সমন্বিত ও সময়োপযোগী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামাল। তাঁর বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য—একটি দেশের সামরিক শক্তির লক্ষ্য যুদ্ধ শুরু করা নয়; বরং সম্ভাব্য যেকোনো নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় এমন প্রস্তুতি ও প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা, যাতে প্রতিপক্ষ আগ্রাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একাধিকবার চিন্তা করতে বাধ্য হয়।
আধুনিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা এখন কেবল সীমান্ত পাহারা কিংবা প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রের সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আকাশসীমা, সমুদ্রসীমা, স্থলসীমা, সাইবার অবকাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো—সবকিছুই একটি দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামালের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা, আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন সক্ষমতা, নৌ-নিরাপত্তা, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ। তাঁর দৃষ্টিতে, এসব সক্ষমতা পরস্পর বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং একটি সমন্বিত জাতীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশ হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
যুদ্ধের জন্য নয়, যুদ্ধ ঠেকানোর জন্য প্রস্তুতি
সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একটি দেশ কেন তার প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করবে? ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামালের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে এই প্রশ্নেরই একটি স্পষ্ট উত্তর: যুদ্ধ করার জন্য নয়, সম্ভাব্য যুদ্ধ ঠেকানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে এই ধারণাকে সাধারণভাবে ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনো রাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সক্ষমতা এমন পর্যায়ে থাকলে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের কাছে আগ্রাসনের সম্ভাব্য মূল্য অত্যন্ত বেশি হয়ে ওঠে। তখন শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংঘাত উসকে দেওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে সংঘাতের সম্ভাবনাই কমিয়ে দিতে পারে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নকে কেবল অস্ত্র কেনার কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, আন্তঃবাহিনী সমন্বয়, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা।
আকাশ প্রতিরক্ষায় সমন্বিত সক্ষমতার প্রয়োজন
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়। যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন কিংবা অন্যান্য আকাশভিত্তিক হুমকি মোকাবিলায় শুধু যুদ্ধবিমান থাকা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আগাম সতর্কীকরণ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, ট্র্যাকিং, কমান্ড ও কন্ট্রোল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামালের বক্তব্যে এ কারণেই আধুনিক রাডার ও সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একটি কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা কাঠামোয় বিভিন্ন স্তরের সক্ষমতা একে অপরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘপাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক রাডার, নজরদারি প্রযুক্তি এবং যুদ্ধবিমান—এসবকে একটি সমন্বিত কমান্ড কাঠামোর আওতায় পরিচালনা করা গেলে আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ ও সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা আরও কার্যকর হতে পারে।
তবে এ ধরনের সক্ষমতা গড়ে তোলা শুধু প্রযুক্তি সংগ্রহের বিষয় নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষ জনবল, প্রশিক্ষিত অপারেটর, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সহায়তা।
ড্রোনের যুগে অ্যান্টি-ড্রোন সক্ষমতা কেন গুরুত্বপূর্ণ
গত এক দশকে সামরিক প্রযুক্তির অন্যতম বড় পরিবর্তন এসেছে ড্রোন বা আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমের ব্যবহারে। তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ে নজরদারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামরিক কাজে ড্রোন ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে ড্রোন মোকাবিলার প্রযুক্তিও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কাঠামোয় শুধু প্রচলিত বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়, ড্রোন শনাক্ত, পর্যবেক্ষণ ও প্রতিহত করার সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনায় এ বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর, সরকারি স্থাপনা ও কৌশলগত অবকাঠামোর নিরাপত্তায় অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে।
শুধু স্থলসীমা নয়, সমুদ্রসীমার নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সামুদ্রিক নিরাপত্তাও জাতীয় প্রতিরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং সামুদ্রিক সম্পদ জড়িত।
ফলে জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নৌ-নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক নজরদারির বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
আধুনিক নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সমুদ্র পর্যবেক্ষণ, যোগাযোগ, নজরদারি, উদ্ধার সক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা—সবকিছু একটি সমন্বিত কাঠামোর অংশ হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা এখন জাতীয় প্রতিরক্ষার অংশ
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের ধারণাও পরিবর্তিত হচ্ছে। কোনো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে সরাসরি হামলা ছাড়াও সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা, আর্থিক ব্যবস্থা, সরকারি তথ্যভান্ডার কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে অকার্যকর করার চেষ্টা হতে পারে।
এ কারণে জাতীয় প্রতিরক্ষার আলোচনায় সাইবার নিরাপত্তাকে আলাদা কোনো প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার পরিবর্তে সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, বিমান চলাচল, বন্দর, সরকারি ডেটা অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতের সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিরক্ষা ও বেসামরিক প্রযুক্তি খাতের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামালের বক্তব্যে এই বৃহত্তর নিরাপত্তা ধারণাটিই বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে—জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সীমান্তে নয়; রাষ্ট্রের ডিজিটাল অবকাঠামোতেও রক্ষা করতে হবে।
দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প: আমদানিনির্ভরতা কমানোর প্রশ্ন
প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ। দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যদি অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে সংকটকালীন সময়ে সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও খুচরা যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ কারণে প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ, সামরিক সরঞ্জাম, যোগাযোগ প্রযুক্তি ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা উপকরণের অন্তত একটি অংশ দেশে উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির বিষয়টি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ শুধু সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রকৌশল দক্ষতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও যুক্ত হতে পারে।
তবে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার নির্ধারণ। কোন প্রযুক্তি দেশে তৈরি করা সম্ভব, কোনটি যৌথ উদ্যোগে করা যেতে পারে এবং কোন ক্ষেত্রে বিদেশি প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের প্রয়োজন থাকবে—এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা জরুরি।
প্রতিরক্ষা বাজেটে শুধু কেনাকাটা নয়, রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি
সামরিক সরঞ্জাম কেনার পর তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। একটি আধুনিক যুদ্ধবিমান, রাডার, নৌযান বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করলেই সক্ষমতা অর্জিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো, খুচরা যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত সহায়তা।
তাই প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের পরিকল্পনায় ‘কেনা’ এবং ‘চালু রাখা’—দুই বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় সরঞ্জামের জীবনচক্র, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, প্রশিক্ষণ, আপগ্রেডেশন এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের বিষয়গুলো আগে থেকেই বিবেচনা করা গেলে বিনিয়োগের কার্যকারিতা বাড়তে পারে।
প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, বদলাতে হবে প্রশিক্ষণও
আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ শুধু অস্ত্র নয়—দক্ষ জনবল। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও তত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হচ্ছে।
রাডার পরিচালনা, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, ডেটা বিশ্লেষণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আধুনিক কমান্ড-কন্ট্রোল প্রযুক্তি পরিচালনায় দক্ষতা ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।
অর্থাৎ প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নকে যদি শুধু যন্ত্রপাতি কেনার প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা অর্জন কঠিন হতে পারে। এর সঙ্গে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিন বাহিনীর সমন্বয় আরও গুরুত্বপূর্ণ
একটি দেশের স্থল, নৌ ও বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আলাদা আলাদা শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। কারণ বাস্তব পরিস্থিতিতে একটি নিরাপত্তা হুমকি একই সঙ্গে স্থল, আকাশ, সমুদ্র ও সাইবার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে আন্তঃবাহিনী যোগাযোগ, তথ্য বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং সমন্বিত কমান্ড কাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামোর লক্ষ্য হতে পারে—কোনো হুমকি শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা।
কূটনীতি ও সামরিক প্রস্তুতি—দুটিই পাশাপাশি
জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে সামরিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা একমাত্র উপায় নয়। কূটনৈতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক আইন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও একটি দেশের নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামালের বক্তব্যের মূল দর্শনও যুদ্ধকে উৎসাহিত করা নয়। বরং তাঁর বক্তব্যে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শান্তি বজায় রাখার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টার গুরুত্বও উঠে এসেছে।
একটি রাষ্ট্র যত বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তত বেশি কার্যকরভাবে কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে—এমন ধারণা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান।
বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার প্রয়োজন
বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, সমুদ্রসীমার গুরুত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা, সাইবার ঝুঁকি এবং নতুন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর হুমকির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে নিয়মিতভাবে আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে হঠাৎ করে বড় ধরনের সরঞ্জাম কেনার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা বেশি কার্যকর হতে পারে।
কোন ক্ষেত্রে আগামী পাঁচ বছরে সক্ষমতা প্রয়োজন, কোন ক্ষেত্রে দশ বছরের পরিকল্পনা দরকার এবং কোন প্রযুক্তিতে দেশীয় গবেষণা ও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব—এসব প্রশ্নকে সামনে রেখে জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করা যেতে পারে।
নিরাপত্তা প্রস্তুতির সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতার সম্পর্ক
একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপরও নির্ভরশীল। কারণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের পাশাপাশি এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
ফলে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতের সমন্বয় ঘটানো গেলে এর সুফল বহুমুখী হতে পারে।
একদিকে যেমন জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
যুদ্ধ নয়—সার্বভৌমত্ব রক্ষার সক্ষমতা
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামালের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিকে যুদ্ধপ্রবণতার সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই শক্তির ব্যবহার কখন, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে করা হবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতির মূল লক্ষ্য হতে পারে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে সামরিক প্রস্তুতি হতে পারে একটি প্রতিরোধমূলক হাতিয়ার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যত বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়, সম্ভাব্য আগ্রাসনের ঝুঁকি তত বেশি নিরুৎসাহিত করা সম্ভব হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এই সক্ষমতা যেন অর্থনৈতিক বাস্তবতা, কূটনৈতিক নীতি ও জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে যে প্রশ্নগুলো
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচনায় এখন কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসছে—দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ঝুঁকি কোনগুলো? আগামী দশকে কোন প্রযুক্তিগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে? আকাশ প্রতিরক্ষায় কোন ধরনের সমন্বিত কাঠামো কার্যকর হতে পারে? দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে কোন খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব? সাইবার ও ড্রোনভিত্তিক নতুন হুমকি মোকাবিলায় কী ধরনের সক্ষমতা প্রয়োজন? এবং সর্বোপরি, প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের অর্থনৈতিক ব্যয় ও জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করেই একটি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা কৌশল প্রণয়ন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একটি অংশ।
উপসংহার
যুদ্ধ কোনো দেশের কাম্য হতে পারে না। কিন্তু যুদ্ধ না চাইলেও সম্ভাব্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই বাস্তবতার জায়গা থেকেই বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিক ও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামাল।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা—শক্তিশালী প্রতিরক্ষা মানেই যুদ্ধের ডাক নয়; বরং শক্তিশালী প্রতিরোধক্ষমতা অনেক সময় যুদ্ধ ঠেকানোর অন্যতম উপায়।
আধুনিক রাডার, সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি, নৌ-নিরাপত্তা, সাইবার প্রতিরক্ষা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প—সবকিছুকে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসতে পারলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা কাঠামো আরও কার্যকর ও ভবিষ্যৎমুখী হতে পারে।
সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে প্রস্তুতির বিকল্প নেই। তবে সেই প্রস্তুতি হতে হবে দায়িত্বশীল, প্রযুক্তিনির্ভর, অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত এবং শান্তিকেন্দ্রিক।
যুদ্ধ নয়—প্রস্তুতি। আগ্রাসন নয়—প্রতিরোধ। আর লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষা।