সালিসে দেড় লাখ টাকার মীমাংসা, ‘খাটুনির মজুরি’ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা রাখার অভিযোগ
জমি বিরোধ মীমাংসায় নির্ধারিত অর্থের পুরোটা না পাওয়ার দাবি; চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধেও ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ | তদন্তের দাবি স্থানীয়দের | ইউএনও বলছেন, ‘খাটুনির নামে’ মজুরি নেওয়ার বিধান নেই
মোঃ সারোয়ার হোসেন অপু
নওগাঁ প্রতিনিধি
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নের বৈকুণ্ঠপুর গ্রামে পারিবারিক জমি বিরোধ মীমাংসার জন্য অনুষ্ঠিত সালিস বৈঠককে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীর দাবি, জমি সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসার পর নির্ধারিত ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে তাঁকে ১ লাখ টাকা দেওয়া হলেও বাকি ৫০ হাজার টাকা ‘খাটুনির মজুরি’ হিসেবে রেখে দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একে এম রেজাউল কবির পল্টনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন নুর ইসলামের স্ত্রী তাহমিনা বেগম। একই ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাহাতাব আলী প্রামাণিকের বিরুদ্ধেও সালিসের আগে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে ইউপি সদস্য এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ আলী পরামানিক নামের আরেকজন ইউপি সদস্যও এ সালিস ও অর্থ লেনদেনের ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এবং তাঁর নির্দেশে অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম, নির্যাতন ও অত্যাচারের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এমন অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা হলে ভবিষ্যতে তা জনআস্থা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে চেয়ারম্যান একে এম রেজাউল কবির পল্টনও ৫০ হাজার টাকা নিজের কাছে রাখার অভিযোগকে মিথ্যা, বানোয়াট ও রাজনৈতিক চক্রান্ত বলে দাবি করেছেন।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—সালিসে যদি দেড় লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে অভিযোগকারী পক্ষের হাতে কেন পুরো টাকা দেওয়া হলো না? বাকি ৫০ হাজার টাকার প্রকৃত হিসাব কী? সালিস পরিচালনার নামে অর্থ গ্রহণের কোনো বৈধ বিধান রয়েছে কি না—এসব বিষয় প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
—
দুই দিনের সালিসের পর দেড় লাখ টাকায় মীমাংসা
অভিযোগকারী তাহমিনা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৭ আগস্ট সোমবার ও ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার বৈকুণ্ঠপুর গ্রামে তাঁদের বাড়ির সামনে পারিবারিক জমি নিয়ে বিরোধের সালিস বসে। এতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য মাহাতাব আলী প্রামাণিক, ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী পরামানিকসহ স্থানীয় কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগকারীর দাবি।
দুই দিন ধরে আলোচনার পর বিরোধ মীমাংসার সিদ্ধান্ত হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, জমির একটি অংশ ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে নুর ইসলামকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়ে সালিসে সিদ্ধান্ত হয়।
তাহমিনা বেগমের দাবি, সালিসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯ আগস্ট বুধবার ওই টাকা আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানের কক্ষে দেওয়া হয়।
কিন্তু অভিযোগকারীর হাতে পুরো টাকা না দিয়ে পরবর্তীতে মাত্র ১ লাখ টাকা দেওয়া হয় বলে তাঁর দাবি।
—
‘৫০ হাজার টাকা আমরা রাখব’—এমন বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ
তাহমিনা বেগমের অভিযোগ, ২০ আগস্ট রাতে চেয়ারম্যান তাঁদের ডেকে নিয়ে তাঁর হাতে ১ লাখ টাকা তুলে দেন। বাকি ৫০ হাজার টাকা চেয়ারম্যান নিজের কাছে রেখে দেন।
তাঁর দাবি, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে চেয়ারম্যান সালিস পরিচালনায় তাঁদের শ্রম ও সময় দেওয়ার কথা উল্লেখ করে ওই টাকা রাখার যৌক্তিকতা দেখান।
তাহমিনা বেগম বলেন, “চেয়ারম্যান আমার হাতে ১ লাখ টাকা দিয়েছেন। আর ৫০ হাজার টাকা তিনি রেখে দিয়েছেন। চেয়ারম্যান বলেছেন—‘আমরা খেটেছি, আমরা খাব না?’”
অভিযোগকারীর এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে সালিসে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য, অর্থ লেনদেনের কোনো লিখিত প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নথিপত্র পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
—
সালিসের খরচ কত, আর ৫০ হাজার টাকার হিসাব কোথায়?
অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সালিসের খরচ বাবদ অপর পক্ষের প্রায় ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিল। একই সঙ্গে বকশিশ দেওয়ার কথাও ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে—সালিসের প্রকৃত খরচ যদি প্রায় ১৫ হাজার টাকা হয়ে থাকে, তাহলে বাকি অর্থের হিসাব কী?
অভিযোগকারী পরিবারের দাবি, তাঁরা ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাওয়ার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেছিলেন। কিন্তু হাতে পেয়েছেন ১ লাখ টাকা। ফলে বাকি ৫০ হাজার টাকা কোন খাতে রাখা হয়েছে, তার কোনো স্পষ্ট হিসাব তাঁদের দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, নুরে আলম বাবুর পক্ষে মুমিন নামে এক ব্যক্তি চেয়ারম্যানের কাছে টাকা পৌঁছে দেন। তবে এই দাবির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
—
ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধেও ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ
ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি অভিযোগ উঠেছে ইউপি সদস্য মাহাতাব আলী প্রামাণিকের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, সালিসে বিচার শুরুর আগে তাঁর বিরুদ্ধে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে মাহাতাব আলী প্রামাণিক এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। টাকা-পয়সার বিষয়ে আমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। টাকা লেনদেনের সময় আমি উপস্থিতও ছিলাম না।”
অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
—
মোহাম্মদ আলী পরামানিকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগকারীর দাবি, ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী পরামানিকও সালিসের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং ঘটনায় তাঁর ভূমিকা ছিল।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, মোহাম্মদ আলী পরামানিক চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তাঁর নির্দেশে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম, নির্যাতন ও অত্যাচার চালানো হয়েছে বলেও স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ বা সরকারি তদন্তের মাধ্যমে এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে নয়, স্থানীয়দের দাবির ভিত্তিতে উল্লেখ করা হলো।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, এমন অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা হলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁদের দাবি, মোহাম্মদ আলী পরামানিকের ভূমিকা এবং অতীতের অভিযোগগুলোও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা হোক।
—
চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আগের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একে এম রেজাউল কবির পল্টনের বিরুদ্ধে এর আগেও সালিসের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে বৈকুণ্ঠপুর গ্রামের মিষ্টিআলার মোড় এলাকার একটি জমি বিরোধের সালিসে এক পক্ষের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
এ ছাড়া বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রেও চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ৯ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কেউ কেউ।
উত্তর আধাইপুর হিন্দুপাড়ায় প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক ও গর্ভধারণের ঘটনায় অনুষ্ঠিত সালিসে লক্ষাধিক টাকার লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে বলেও স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এসব পূর্ববর্তী অভিযোগের কোনোটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ বা সরকারি তদন্তের মাধ্যমে এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে নয়, স্থানীয়দের দাবির ভিত্তিতে উল্লেখ করা হলো।
—
চেয়ারম্যানের বক্তব্য: ‘অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট’
অভিযোগের বিষয়ে আধাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একে এম রেজাউল কবির পল্টনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন।
চেয়ারম্যান বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। রাজনৈতিক চক্রান্তের মাধ্যমে তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা ৫০ হাজার টাকা নিজের কাছে রেখে দেওয়ার বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন।
চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, সালিসে কোনো অনিয়ম বা ব্যক্তিগতভাবে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেনি।
—
ইউএনও: ‘খাটুনির নামে’ মজুরি নেওয়ার বিধান নেই
বিষয়টি নিয়ে বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি-র সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর কাছে এখনো লিখিত কোনো অভিযোগ আসেনি।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গ্রাম আদালতে বিচার করার পর ‘খাটুনির নামে’ মজুরি নেওয়ার কোনো বিধান নেই।
ইউএনও আরও বলেন, এমনটা হয়ে থাকলে এবং অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের এই বক্তব্যের পর অভিযোগটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
—
অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী ধরনের ব্যবস্থা হতে পারে?
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—অভিযোগ উঠলেই চেয়ারম্যান বা ইউপি সদস্য অপরাধী হয়ে যান না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, নথিপত্র পরীক্ষা এবং আইন অনুযায়ী তদন্তের পরই দায় নির্ধারণ করা সম্ভব।
তবে কোনো জনপ্রতিনিধি দায়িত্ব পালনের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থের অনিয়ম বা অসদাচরণের সঙ্গে জড়িত প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন আসতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ সংক্রান্ত আইনি কাঠামোতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অপসারণের কার্যক্রম এবং ফৌজদারি কার্যক্রম চললে সাময়িক বরখাস্তের ব্যবস্থার সুযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু ‘সালিসের টাকা’ নিয়ে স্থানীয় বিরোধ হিসেবে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ বা অন্য কোনো আইনি অপরাধের উপাদান পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনে পৃথক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
তবে কোন ধারায় মামলা হবে, আদৌ ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না এবং কী শাস্তি হতে পারে—এসব নির্ভর করবে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ও প্রযোজ্য আইনের ওপর।
—
শুধু পদ থেকে অপসারণ নয়, ফৌজদারি তদন্তের দাবিও উঠছে
স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন, একজন জনপ্রতিনিধি যদি সালিসের নামে নির্ধারিত অর্থের একটি অংশ ব্যক্তিগতভাবে রেখে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না।
তাঁদের দাবি, অভিযোগ সত্য হলে অর্থের উৎস, অর্থ প্রদানের ব্যক্তি, সালিসের সিদ্ধান্ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অর্থ গ্রহণের প্রমাণ সংগ্রহ করা উচিত।
একই সঙ্গে সালিসে উপস্থিত চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য মাহাতাব আলী প্রামাণিক, ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী পরামানিক ও অন্যান্য ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।
প্রয়োজনে—
১. অভিযোগকারীর লিখিত বক্তব্য গ্রহণ,
২. সালিসে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি,
৩. অর্থ লেনদেনের সাক্ষী শনাক্তকরণ,
৪. কোনো লিখিত সিদ্ধান্ত বা রসিদ থাকলে তা পরীক্ষা,
৫. ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই,
৬. উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং
৭. প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত
করা যেতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
—
‘সালিস’ কি অর্থ আদায়ের মাধ্যম হতে পারে?
গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্ব, বিয়ে, পারিবারিক কলহসহ নানা সামাজিক সমস্যা স্থানীয়ভাবে মীমাংসার জন্য সালিসের প্রচলন রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মানুষের বিরোধ মিটিয়ে সামাজিক শান্তি বজায় রাখতে ভূমিকা রাখেন।
কিন্তু সালিসের নামে যদি কোনো পক্ষের কাছ থেকে অননুমোদিত অর্থ নেওয়া হয়, কিংবা মীমাংসায় নির্ধারিত অর্থের অংশ গোপনে রেখে দেওয়া হয়—তাহলে সেটি জনসেবা ও ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতার প্রত্যাশা করেন। সেই জায়গায় অর্থ গ্রহণের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।
—
দেড় লাখ টাকার মধ্যে ৫০ হাজার—প্রশ্নের কেন্দ্রে এই অর্থ
পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার টাকা।
যদি অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী জমির অংশ ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে—
১. ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা কার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল?
২. টাকা গ্রহণের সময় কারা উপস্থিত ছিলেন?
৩. ১ লাখ টাকা কেন অভিযোগকারীকে দেওয়া হলো?
৪. বাকি ৫০ হাজার টাকা কে গ্রহণ করেছেন?
৫. ওই টাকা গ্রহণের কোনো রসিদ বা হিসাব আছে কি না?
৬. সালিস পরিচালনার জন্য কোনো অনুমোদিত ফি ছিল কি না?
৭. ‘খাটুনির মজুরি’ নামে অর্থ নেওয়ার কোনো বিধান আছে কি না?
৮. সালিসের প্রকৃত ব্যয় কত হয়েছিল?
৯. বাকি অর্থ কোনো খাতে ব্যয় করা হয়েছে কি না?
১০. অর্থ লেনদেনের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রমাণ রয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলেই ঘটনার প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে।
—
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চায় স্থানীয়রা
স্থানীয়দের একাংশ বলছেন, অভিযোগটি সত্য হলে এটি শুধু একজন পরিবারের জমি বিরোধের ঘটনা নয়; বরং ইউনিয়ন পর্যায়ে সালিসি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে।
তাঁদের দাবি, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না মিললে চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য মাহাতাব আলী প্রামাণিক এবং ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী পরামানিকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও অবসান হবে। আবার অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পথও পরিষ্কার হবে।
এতে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সালিসের নামে অর্থ লেনদেন নিয়ে বিভ্রান্তিও কমবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
—
জনপ্রতিনিধির জবাবদিহি কতটা জরুরি?
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাঁদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা।
কোনো বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে যদি অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ একটি অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা—দুটিই তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া সম্ভব। কিন্তু তদন্ত না হলে অভিযোগটি একদিকে যেমন জনমনে সন্দেহ তৈরি করে, অন্যদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিনের প্রশ্ন থেকে যেতে পারে।
—
শাস্তির প্রশ্নে শেষ কথা বলবে তদন্ত ও আইন
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগই রয়েছে; তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ আদালত বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
সুতরাং তাঁদের দোষী বা অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করার সুযোগ নেই।
তবে অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা, পদসংক্রান্ত ব্যবস্থা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনগত/ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে পারে।
ইউনিয়ন পরিষদ-সংক্রান্ত আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অপসারণের প্রক্রিয়া এবং ফৌজদারি কার্যক্রম চলাকালে সাময়িক বরখাস্তের ব্যবস্থা থাকার বিষয়টি সরকারি আইনভান্ডারের তথ্যেও উল্লেখ রয়েছে।
অতএব, এখন মূল বিষয় হলো—অভিযোগের সত্যতা যাচাই।
—
তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে আসল রহস্য
বৈকুণ্ঠপুরের এই সালিসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে একটি নিরপেক্ষ তদন্তই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
দেড় লাখ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত, টাকা প্রদান, ১ লাখ টাকা হস্তান্তর এবং বাকি ৫০ হাজার টাকা রাখার অভিযোগ—প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ইউপি সদস্য মাহাতাব আলী প্রামাণিকের বিরুদ্ধে ওঠা ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ এবং ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলী পরামানিকের কথিত ভূমিকার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হলে পুরো ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, উপজেলা প্রশাসন অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় তদন্ত করবে। তদন্তে অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা সন্দেহের অবসান—দুই ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
কারণ সালিসের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বিরোধ মীমাংসা, অর্থ আদায় নয়। আর জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব হওয়া উচিত জনগণের আস্থা রক্ষা করা।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন