মোঃ আবুল কালাম, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে রাতের আঁধারে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলা, আরসিসি পিলার ক্ষতিগ্রস্ত করা, কেয়ারটেকারকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম এবং বাড়িয়ারটেক জামে মসজিদের জমিতে বালি ফেলে দখলের চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ও রাজভ্যালি সিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী জমির মালিক শুকুর আহম্মদের দাবি, জমির মালিকানা ও সীমানা নিয়ে বিরোধের জেরে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত আনুমানিক ২টার দিকে একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাঁর মালিকানাধীন সম্পত্তিতে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় তিনি রূপগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, বাড়িয়ারটেক জামে মসজিদ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিরোধপূর্ণ জমির পাশাপাশি মসজিদের মালিকানাধীন জমিতেও বালি ফেলে দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির বিরোধের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নিয়েও নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
রাতের আঁধারে ভাঙচুরের অভিযোগ
ভুক্তভোগী শুকুর আহম্মদ থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের পশ্বি মৌজায় তিনি ক্রয়সূত্রে ১৪ দশমিক ১৭ শতাংশ জমির মালিক। জমিটি তাঁর নামে নামজারিও করা হয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছেন বলে দাবি তাঁর।
অভিযোগে বলা হয়, জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ চলমান থাকলেও বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ২টার দিকে হঠাৎ করে সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীদের নেতৃত্বে একদল লোক সেখানে উপস্থিত হয়।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-১৬ জন ব্যক্তি লোহার রড, শাবল, হাতুড়িসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জমিতে প্রবেশ করে। পরে তারা জমির সীমানাপ্রাচীরের আরসিসি পিলার ও বাউন্ডারি ওয়াল ভাঙচুর করে চলে যায়।
এ সময় জমির কেয়ারটেকারকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করা এবং সেখানে থাকা মালামাল লুট করে নেওয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে।
মসজিদের জমিতে বালি ফেলার অভিযোগ
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাড়িয়ারটেক জামে মসজিদের জমি নিয়ে অভিযোগ।
মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সেলিম মিয়া অভিযোগ করে বলেন, মসজিদের নিজস্ব জমিতে জোরপূর্বক বালি ফেলে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তাঁর দাবি, মসজিদের জমির সীমানা নিয়ে কোনো ধরনের বৈধ সমাধান বা সমঝোতা ছাড়াই সেখানে বালি ফেলার ঘটনায় স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মসজিদের জমি নিয়ে কোনো পক্ষ যাতে বেআইনিভাবে দখল নিতে না পারে, সে জন্য প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপও দাবি করেছেন তিনি।
অভিযুক্তের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, শুকুর আহম্মদ ও তাঁর ছেলে ভাটারা এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতা এবং তাঁদের ক্রয় করা জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে।
তিনি দাবি করেন, জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেও তা সমাধান না করে তাঁরা কাজ শুরু করায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে মসজিদের জমিতে বালি ফেলার অভিযোগ অস্বীকার করে সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম বলেন, তিনি মসজিদের জমিতে কোনো বালি ফেলেননি। বরং মসজিদ সংশ্লিষ্ট লোকজনই সেখানে বালি ফেলেছেন বলে তাঁর দাবি।
অভিযোগের অন্যান্য বিষয়, বিশেষ করে রাতের আঁধারে লোকজন নিয়ে জমিতে প্রবেশ, সীমানাপ্রাচীর ভাঙচুর এবং কেয়ারটেকারকে মারধরের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও এ প্রতিবেদনে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
থানায় লিখিত অভিযোগ, তদন্তে পুলিশ
ঘটনার বিষয়ে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএইচএম সালাহউদ্দিন বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
তিনি জানান, ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্তে তাদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের এই বক্তব্যের পর স্থানীয়দের মধ্যে আশা তৈরি হয়েছে যে, অভিযোগটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জমির প্রকৃত মালিকানা, সীমানা, ভাঙচুর, মারধর ও মসজিদের জমিতে বালি ফেলার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে।
জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, বাড়ছে উত্তেজনা
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধের মূল বিষয় জমির মালিকানা ও সীমানা নির্ধারণ। জমির কাগজপত্র, নামজারি, দখল এবং সংশ্লিষ্ট দাগ-খতিয়ানের তথ্য যাচাই না করে কোনো পক্ষের দাবিকেই চূড়ান্তভাবে সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
তবে অভিযোগ অনুযায়ী, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে যদি রাতের আঁধারে সীমানাপ্রাচীর ভাঙচুর, হামলা কিংবা জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত জমি বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে একটি জামে মসজিদের জমি নিয়েও অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
প্রকৃত মালিকানা যাচাইয়ের দাবি
এলাকাবাসীর দাবি, বিরোধপূর্ণ জমির দাগ, খতিয়ান, দলিল, নামজারি, খাজনা এবং সীমানা সরেজমিনে যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মসজিদের জমির মালিকানা ও রেকর্ডও সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের মাধ্যমে পরীক্ষা করা দরকার।
অভিযোগকারীর দাবি করা ১৪ দশমিক ১৭ শতাংশ জমির প্রকৃত মালিকানা এবং মসজিদের জমির সীমানা নির্ধারণে প্রয়োজন হলে ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সরেজমিন পরিমাপের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
এতে দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনো পক্ষের জোরপূর্বক দখল বা ভাঙচুরের সুযোগও কমবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তদন্তেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত ঘটনা
ঘটনার বিষয়ে ইতোমধ্যে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে রাতের ঘটনার সময় কারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল, সীমানাপ্রাচীর কীভাবে ভাঙা হয়েছে, কেয়ারটেকার আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে কি না এবং মালামাল লুটের অভিযোগের সত্যতা রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করতে পারে।
একই সঙ্গে মসজিদের জমিতে বালি ফেলার অভিযোগের ক্ষেত্রেও কারা বালি ফেলেছে, জমিটি কার নামে রেকর্ডভুক্ত, সেখানে কার দখল রয়েছে এবং কোনো বৈধ অনুমতি বা চুক্তি ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভুক্তভোগী ও মসজিদ কমিটি দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, জমির সরকারি রেকর্ড এবং মামলার/অভিযোগের নথি যাচাই করে পরবর্তী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত শেষে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও দায়ীদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।
প্রতিবেদক:
মোঃ আবুল কালাম
রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
মুঠোফোন: ———
প্রকাশনা:
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ