বদলগাছীতে ইজারা ছাড়াই খাস পুকুরে বিএনপি নেতার মাছ চাষের অভিযোগ
সরকারি নথিতে ইজারাবিহীন, সরেজমিনে মাছ চাষ—রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ; প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্
জেলা প্রতিনিধি, নওগাঁ
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের চাঁপাডাল মৌজায় সরকারি খাস পুকুর ইজারা ছাড়াই মাছ চাষের অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আহসান হাবিব ভুট্টুর বিরুদ্ধে। একই পুকুরে তাঁর স্ত্রী মিনু আরা, যিনি পাহাড়পুর ইউনিয়ন মহিলা দলের সভানেত্রী হিসেবে পরিচিত, মাছ চাষের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। সরকারি নথিতে পুকুরটি ইজারাবিহীন থাকার পরও সেখানে মাছ চাষ চলার অভিযোগে সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আদায় এবং প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
চাঁপাডাল মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ৪৬৯ নম্বর দাগে প্রায় ৫৮ শতাংশ জমির ওপর পুকুরটির অবস্থান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৪৩৩ থেকে ১৪৩৫ সন মেয়াদে তিন বছরের জন্য উপজেলার কয়েকটি খাস পুকুর ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য একাধিকবার বিজ্ঞপ্তি ও প্রকাশ্য নিলামের আয়োজন করা হলেও ৪৬৯ নম্বর দাগের পুকুরটির জন্য কোনো ইজারাদার পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
পরবর্তীতে ইজারাবিহীন জলমহালটি ১৪৩৩ সনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য খাস আদায়ের লক্ষ্যে প্রকাশ্য নিলামে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে পুনরায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও পুকুরটি ইজারা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অথচ এর মধ্যেই পুকুরটিতে মাছ চাষের দৃশ্য দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পুকুরটি আহসান হাবিব ভুট্টুর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বৈধ ইজারা ছাড়া সরকারি খাস পুকুর ব্যবহার করে মাছ চাষ করা হচ্ছে—এমন অভিযোগের পরও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের দাবি।
সরকারি পুকুর, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি—উঠছে বড় প্রশ্ন
সরকারি খাস সম্পত্তি ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার বা জলমহাল থেকে মাছ আহরণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধি অনুযায়ী অনুমোদন বা ইজারা প্রয়োজন। কিন্তু স্থানীয়দের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য পুকুরটির ক্ষেত্রে এমন কোনো বৈধ ইজারার কাগজপত্র সামনে আসেনি।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—ইজারা না থাকলে সরকারি পুকুরে কে মাছ চাষ করছেন, কীভাবে সেখানে মাছের চাষাবাদ শুরু হলো এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি সম্পর্কে কতটা অবগত?
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে থাকার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা হয়নি।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রশাসনিক তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই প্রয়োজন।
‘লিজ ছাড়াই মাছ চাষ করছি’—আহসান হাবিব ভুট্টু
পুকুরটি বর্তমানে বৈধভাবে ইজারা নেওয়া হয়েছে কি না জানতে আহসান হাবিব ভুট্টুর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে পাহাড়পুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন।
পুকুরের বৈধ ইজারা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি লিজ ছাড়াই পুকুরটিতে মাছ চাষ করছেন।
তিনি আরও দাবি করেন, এলাকায় তাঁর প্রভাব রয়েছে এবং অন্য কেউ পুকুরটি ইজারা নিলেও তাঁকে সেখানে মাছ চাষ করতে দেওয়া হবে না।
তাঁর এই বক্তব্যের ফলে সরকারি খাস পুকুরটির নিয়ন্ত্রণ, ইজারা প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ আরও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে। তবে পুকুরের প্রকৃত আইনগত অবস্থান নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের।
স্ত্রী মিনু আরার স্বীকারোক্তি
পুকুরে মাছ চাষের বিষয়ে আহসান হাবিব ভুট্টুর স্ত্রী মিনু আরার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও পুকুরটিতে তাঁদের মাছ চাষের বিষয়টি স্বীকার করেন।
তবে পুকুরটির বৈধ ইজারা নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি কোনো ইজারার কাগজপত্র দেখাতে পারেননি বলে প্রতিবেদকের কাছে জানা গেছে।
পুকুরটি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকার বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেন।
তবে পুকুরটির নিয়ন্ত্রণ কীভাবে তাঁদের হাতে এসেছে—এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও দখল-নিয়ন্ত্রণের একটি দাবি।
‘১৭ বছর আগে থেকেই আমাদের দখলে ছিল’—মিনু আরা
মিনু আরার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৭ বছর আগে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে পুকুরটি তাঁদের দখলে ছিল। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জোর করে পুকুরটি নিয়ে নেন বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁরা পুনরায় পুকুরটিতে মাছ চাষ শুরু করেছেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অতীতে পুকুরটি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি থাকলেও বর্তমানে সরকারি নথিতে পুকুরটির ইজারার বৈধতা কী—সেটিই মূল প্রশ্ন। অতীতের দখল বা ব্যবহারের দাবি কোনো সরকারি খাস সম্পত্তির বর্তমান বৈধ ইজারার বিকল্প কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নথি ও আইন অনুযায়ী নির্ধারণের বিষয়।
‘পূর্বের মালিকের কাছ থেকে সমঝোতায় নিয়েছেন’—বিএনপি নেতা
পাহাড়পুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. জিল্লুর রহমান (জিল্লু মাস্টার) বলেন, পুকুরটি বর্তমানে ইজারা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আহসান হাবিব ভুট্টু পুকুরটি পূর্বের মালিকের কাছ থেকে সমঝোতার মাধ্যমে নিয়ে মাছ চাষ করছেন বলে তিনি জানেন।
কিন্তু সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তির ক্ষেত্রে ‘পূর্বের মালিক’ বলতে কাকে বোঝানো হচ্ছে—এ প্রশ্নেরও সৃষ্টি হয়েছে। জানতে চাইলে তিনি ওই ব্যক্তির নাম জানাতে পারেননি।
ফলে পুকুরটির প্রকৃত মালিকানা, পূর্ববর্তী ব্যবহারের অধিকার এবং বর্তমান নিয়ন্ত্রণের আইনগত ভিত্তি—সবকিছুই এখন প্রশাসনিক যাচাইয়ের দাবি রাখে।
দলীয় নেতৃত্বের বক্তব্য: ‘এ ব্যাপারে আমার জানা নেই’
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল হাদী চৌধুরী টিপুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর জানা নেই।
তিনি তখন দলীয় কার্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে থাকার কথা জানিয়ে পরবর্তীতে সাক্ষাতের কথা বলেন। ফলে তাঁর কাছ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এখানে উল্লেখ্য, কোনো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতার ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের ওপর সরাসরি বর্তায় না, যদি না সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে তার অনুমোদন বা সম্পৃক্ততার কথা জানায়।
প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
সরকারি খাস পুকুরটি ইজারাবিহীন থাকা অবস্থায় সেখানে মাছ চাষের অভিযোগের বিষয়ে জানতে বদলগাছী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) পলাশ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
বৃহস্পতিবার তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
ফলে পুকুরটি বর্তমানে সরকারি নথিতে ঠিক কী অবস্থায় রয়েছে, কোনো ইজারা বা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কি না, এবং ইজারাবিহীন অবস্থায় মাছ চাষের অভিযোগ সম্পর্কে প্রশাসন কী জানে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট হয়নি।
ইজারা প্রক্রিয়া থাকলেও মাছ চাষ কীভাবে?
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—যদি পুকুরটির জন্য একাধিকবার ইজারা বা নিলামের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে এবং তাতেও কোনো ইজারাদার পাওয়া না যায়, তাহলে পরবর্তীতে সেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাছ চাষের সুযোগ তৈরি হলো কীভাবে?
আরও প্রশ্ন রয়েছে—
• পুকুরটিতে মাছ চাষের অনুমতি কে দিয়েছে?
• কোনো সরকারি দপ্তর থেকে লিখিত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল কি না?
• মাছ চাষের জন্য সরকারি রাজস্ব বা খাস আদায় হয়েছে কি না?
• পুকুরটির বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কার নামে সরকারি নথিতে রয়েছে?
• ২৭ জুলাইয়ের পুনঃবিজ্ঞপ্তির পর পুকুরটি কেন ইজারা হলো না?
• ইজারা না হলে সেখানে মাছ চাষ বন্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না?
• সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের কারণে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
রাজনৈতিক পরিচয় কি সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে?
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি।
তাঁদের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পরিচয় থাকা মাত্রই কোনো ব্যক্তিকে সরকারি সম্পত্তি দখল বা অবৈধভাবে ব্যবহারের জন্য দায়ী করা যায় না। একইভাবে স্থানীয়দের অভিযোগও তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
তাই প্রকৃত সত্য জানতে প্রয়োজন সরকারি খতিয়ান, দাগ নম্বর, ইজারা রেজিস্টার, নিলামের নথি, বিজ্ঞপ্তি, খাস আদায়ের হিসাব এবং সরেজমিন তদন্ত।
সরকারি সম্পত্তির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
সরকারি খাস পুকুর বা জলমহাল শুধু একটি জলাশয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সম্পদ। এসব সম্পত্তি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা ও ইজারার মাধ্যমে ব্যবহার করা হলে সরকার রাজস্ব পায় এবং একই সঙ্গে সম্পত্তির ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।
কিন্তু কোনো সরকারি জলমহাল যদি ইজারা ছাড়াই দীর্ঘদিন ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা শুধু একটি পুকুরের বিষয় থাকে না—এটি সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ও প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
চাঁপাডাল মৌজার ৪৬৯ নম্বর দাগের পুকুরের ক্ষেত্রেও তাই স্থানীয়দের দাবি—কাগজপত্র যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করা হোক।
তদন্ত চান স্থানীয়রা
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে পুকুরটির প্রকৃত আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করা হোক।
যদি পুকুরটি সরকারি খাস সম্পত্তি হয়ে থাকে এবং কোনো বৈধ ইজারা ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
একই সঙ্গে পুকুরটি ইজারার উপযোগী হলে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় ইজারা দেওয়ার দাবি রয়েছে তাঁদের।
স্থানীয়দের ভাষায়, সরকারি সম্পত্তি কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকার সুযোগ সৃষ্টি হলে ভবিষ্যতে আরও সরকারি সম্পত্তি নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে।
শেষ কথা
চাঁপাডাল মৌজার প্রায় ৫৮ শতাংশের এই পুকুরকে ঘিরে যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সরকারি খাস পুকুর যদি ইজারা না হয়, তাহলে সেখানে ব্যক্তিগতভাবে মাছ চাষের বৈধ ভিত্তি কী?
অভিযোগকারী স্থানীয়দের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য এবং সরেজমিনের চিত্র—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি প্রশাসনিক তদন্তের দাবি রাখে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই ছাড়া পুকুরটির নিয়ন্ত্রণের বৈধতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এখন দেখার বিষয়, বদলগাছী উপজেলা প্রশাসন ও ভূমি প্রশাসন বিষয়টি কতটা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে এবং সরকারি খাস সম্পত্তিটির প্রকৃত অবস্থান জনগণের সামনে কত দ্রুত পরিষ্কার করে।
দলীয় পদমর্যাদাকে ঢাল বানিয়ে সরকারি খাস সম্পত্তি দখল, আইন প্রয়োগে বাধা প্রদান এবং হুমকি-ধামকির মাধ্যমে স্থানীয় এলাকায় এক ধরনের ‘সন্ত্রাসী রাজত্ব’ কায়েমের অভিযোগ উঠেছে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আহসান হাবিব ভুট্টুর বিরুদ্ধে। সরকারি খাস পুকুর ইজারা ছাড়াই গায়ের জোরে দখলে নিয়ে মাছ চাষের পর তিনি প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন—অন্য কেউ লিজ নিলেও এলাকা ছেড়ে দেওয়া হবে না। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও নৈরাজ্যমূলক এমন আচরণের বিরুদ্ধে তাঁকে অবিলম্বে দল থেকে আজীবন বহিষ্কার, সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ তৃণমূল কর্মীরা।
নথিপত্র অনুযায়ী, চাঁপাডাল মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ৪৬৯ নম্বর দাগের প্রায় ৫৮ শতাংশ সরকারি খাস পুকুরটি বাংলা ১৪৩৩ থেকে ১৪৩৫ সন মেয়াদে ইজারা দেওয়ার জন্য গত ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও সরকারি নিয়মে ইজারাদার পাওয়া যায়নি। সরকারিভাবে পুকুরটি পুরোপুরি ইজারাবিহীন ও খাস আদায়ের অধীন থাকা সত্ত্বেও গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই আহসান হাবিব ভুট্টু নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুকুরটি একক নিয়ন্ত্রণে নেন।
পুকুরটির বৈধ ইজারা আছে কি না জানতে চাইলে বিএনপি নেতা আহসান হাবিব ভুট্টু সাংবাদিকদের কাছে কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় বলেন, “আমি পাহাড়পুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। লিজ ছাড়াই পুকুরটিতে মাছ চাষ করছি। এলাকায় আমার প্রভাব আছে, অন্য কেউ লিজ নিলেও কাউকে মাছ চাষ করতে দেওয়া হবে না।”
একইভাবে তাঁর স্ত্রী ও পাহাড়পুর ইউনিয়ন মহিলা দলের সভানেত্রী মিনু আরা ইজারার কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পেরে উল্টো স্বীকার করেন, প্রায় ১৭ বছর আগে বিএনপি আমলে পুকুরটি তাঁদের দখলেই ছিল এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুনরায় তাঁরা এটি দখলে নিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আইন বহির্ভূতভাবে ভোগদখল করা এবং ‘প্রভাবের’ ভয় দেখিয়ে সাধারণ মৎস্যজীবী ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখানো সরাসরি সন্ত্রাসী আচরণের নামান্তর বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কতিপয় ব্যক্তির এমন বেপরোয়া আচরণ ও অপকর্মে দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বিএনপির ত্যাগী নেতা-কর্মীরা। স্থানীয়দের মতে, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী আমলের জবরদখলের সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে যারা রাজপথে আন্দোলন করেছেন, তাঁদের নাম ভাঙিয়ে এখন যদি বিএনপির নিজস্ব দায়িত্বশীল পদধারী নেতারা একই কায়দায় গায়ের জোরে সম্পদ দখল শুরু করেন, তবে জনগণের বিশ্বাস ভঙ্গের কারণ ঘটবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তৃণমূল কর্মী জানান, “দলীয় পদ ব্যবহার করে কেউ সন্ত্রাসী কায়দায় সরকারি সম্পত্তি দখল করবে আর হুমকি দেবে—এটা শহীদ জিয়া বা তারেক রহমানের রাজনীতির আদর্শ হতে পারে না। এই ধরনের অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে এখনই দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও দ্রুত বহিষ্কারাদেশ ঘোষণা না করলে পুরো এলাকায় অসন্তোষ আরও দানাবাঁধবে।”
সরকারি জমি ইজারা ছাড়া ব্যবহারে আইনত কঠোর দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিসের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। স্থানীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসিয়ালি সাড়া না দেওয়ায় সরকারি জমি উদ্ধারে প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। জনগণের দাবি, অবিলম্বে বদলগাছী উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে খাস পুকুরটি দখলমুক্ত করুক এবং অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।
রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সাংগঠনিক পদ কোনোভাবেই অপরাধ বা দখলাভিযানের লাইসেন্স হতে পারে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দলের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে আহসান হাবিব ভুট্টু ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে দুটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি:
সাংগঠনিক পদক্ষেপ: দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় অনতিবিলম্বে মো. আহসান হাবিব ভুট্টুকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সকল পদ থেকে বহিষ্কার করা এবং তাঁর যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা।
প্রশাসনিক পদক্ষেপ: জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুগ তল্লাশি চালিয়ে সরকারি খাস পুকুরটি উদ্ধার করা এবং অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি গ্রাস ও প্রাণনাশের হুমকির অপরাধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা।
দলীয় পদকে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ভয়ভীতি দেখানোর হাতিয়ার বানানোর প্রক্রিয়া এখনই বন্ধ না হলে বদলগাছীর এই অনিয়ম অন্যত্রও সংক্রামিত হতে পারে। তাই দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত তৈরিতে দল ও প্রশাসন উভয় পক্ষকেই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।