বিশেষ প্রতিবেদক, বগুড়া:
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা আঞ্চলিক যুবদলের সদ্য ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটিতে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক নেতা সাব্বির আহমেদকে ১৭ নম্বর সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনায় স্থানীয় রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করা ত্যাগী ও নির্যাতিত কর্মীদের অবমূল্যায়ন করে অনুপ্রবেশকারীকে গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দেওয়ায় দলীয় নীতি ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঘটনার বিস্তৃত প্রেক্ষাপট ও বিতর্ক
সম্প্রতি বগুড়া জেলা যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের যৌথ স্বাক্ষরে মোকামতলা আঞ্চলিক যুবদলের ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট নতুন আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। উক্ত কমিটিতে দেউলি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী এবং পরবর্তীতে দেউলি ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাব্বির আহমেদকে সদস্য পদ দেওয়া হয়।

সংবাদমাধ্যমে এই কমিটির তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিগত সরকারের শাসনামলে যিনি বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন ও স্বৈরাচারী শাসনের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি কীভাবে রাতারাতি যুবদলের মূল ধারার কমিটিতে জায়গা পেলেন—তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন। স্থানীয় তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আর্থিক লেনদেন কিংবা বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেই এই অযোগ্য ও বিতর্কিত অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
মোকামতলা ও দেউলি এলাকার প্রবীণ বিএনপি ও যুবদলের একাধিক ত্যাগী নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বিগত ১৫ বছর ধরে একাধিক মামলা-হামলা সহ্য করে যারা দলের পতাকা ধরে রেখেছিলেন, তাদের বাদ দিয়ে সুবিধাবাদী ও রাজনৈতিক রূপ পরিবর্তনকারী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের অসন্তোষ: স্থানীয় যুবদল কর্মীদের দাবি, আওয়ামী শাসনামলে বিভিন্ন সুবিধা ভোগকারী ব্যক্তিরা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেদের বাঁচাতে কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে বিএনপির সহযোগী সংগঠনগুলোতে অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
পদত্যাগের হুমকি: বিতর্কিত এই পদায়ন বাতিল না হলে কমিটির অন্যান্য ত্যাগী সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ এবং কঠোর সাংগঠনিক কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সাংগঠনিক গঠনতন্ত্র ও আইনি বিধিমালা সংক্রান্ত বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের স্পষ্ট গঠনতান্ত্রিক বিধি এবং প্রচলিত আইনের আলোকেও এই ধরণের পদায়ন প্রশ্নবিদ্ধ:
যুবদলের গঠনতন্ত্রের ধারা ৫ (সদস্যপদ ও অনুশাসন): জাতীয়তাবাদী যুবদলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলীয় নীতি ও আদর্শ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা বা অন্য দলের আদর্শ ধারণ করা ব্যক্তি সংগঠনের পদে আসার অযোগ্য। এছাড়া অর্থের বিনিময়ে পদ বণ্টন কিংবা অনুপ্রবেশের প্রমাণ মিললে পদায়ন বাতিলসহ সুপারিশকারী ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
কেন্দ্রীয় নির্দেশনার ব্যত্যয়: বিএনপির কেন্দ্র থেকে বারবার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, বিগত সরকারের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনের পদধারী কোনো ব্যক্তি বা সুবিধাবাদীকে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনে সরাসরি পদ দেওয়া যাবে না। মোকামতলার কমিটিতে এর স্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটেছে।
দণ্ডবিধি (Penal Code) ১৮৬০ এর প্রাসঙ্গিক ধারা: যদি কোনো রাজনৈতিক পদ বাগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন বা অনিয়মের সত্যতা মেলে, তবে প্রচলিত আইনের দৃষ্টিতে তা অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১৬১ ও ১৬৫ ধারা (অবৈধ সুবিধা গ্রহণ) এবং ৪২০ ধারা (প্রতারণা ও বিশ্বাস ভঙ্গ) অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পথ উন্মুক্ত থাকে।
অবিলম্বে তদন্ত ও পদক্ষেপের দাবি
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মোকামতলা উপজেলা ও দেউলি ইউনিয়নের সাধারণ সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা অবিলম্বে সাব্বির আহমেদের পদ স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই অনুপ্রবেশের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ত্যাগী ও রাজপথের পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়নের মাধ্যমে অবিলম্বে মোকামতলা যুবদলের কমিটিকে পুনর্গঠন করার জোর দাবি তুলেছেন তৃণমূলের রাজনীতিবিদেরা।