নির্বাচনের ঘোষণা ইতিবাচক, তবে জুলাই সনদ অপূর্ণাঙ্গ ও প্রশ্নবিদ্ধ: জামায়াতে ইসলামী
মোঃ শাহজাহান বাশার ,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার,
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চলতি বছরের নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণাকে জাতীয় স্বার্থে একটি ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে স্বাগত জানালেও, সম্প্রতি ঘোষিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’কে জনআকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতা বিবর্জিত, অপূর্ণাঙ্গ এবং বিভ্রান্তিকর আখ্যা দিয়েছে। দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বুধবার (৬ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “বিগত ১৬ বছরের নিপীড়ন, গুম, খুন, বিচারহীনতা ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার যে ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিহাসের এক নতুন বাঁক। সেই অভ্যুত্থানের ফলেই আজ ফ্যাসিবাদ পতনের মুখে এবং অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তবে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এই আন্দোলনের ফসল হিসেবে ঘোষিত জুলাই জাতীয় সনদে জনগণের মূল দাবি ও আত্মত্যাগের যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি।”
ডা. তাহের বলেন, “২৮ দফার যে জুলাই ঘোষণাপত্র ৫ আগস্ট সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় উপস্থাপন করা হয়েছে, তা একটি অসম্পূর্ণ দলিল। এতে ১৯৪৭-এর আজাদি আন্দোলন, পিলখানা ট্র্যাজেডি, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড কিংবা ২৮ অক্টোবরের নৃশংসতার কোনো উল্লেখ নেই। এ ছাড়া, যাঁরা এই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন—আলেম-ওলামা, মাদ্রাসা শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রবাসী ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ভূমিকা পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে, যা ইতিহাসের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।”
তিনি আরও বলেন, “এই ঘোষণাপত্রে জুলাই আন্দোলনের ৯ দফা এবং তা থেকে এক দফায় উত্তরণের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকেও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ১৯টি বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে জাতীয় সনদ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার কোনো উল্লেখই করা হয়নি। এর ফলে ঘোষণাটি জনগণের দৃষ্টিতে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত নেতৃবৃন্দ জানান, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের দীর্ঘদিনের রেওয়াজকে উপেক্ষা করা হয়েছে। তথাপি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই সময়সীমা ঘোষণাকে দেশের স্বার্থে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।
ডা. তাহের বলেন, “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অতীতে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী একটি বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে সব সময় গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে। আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে এখনো যে নির্বাচন উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়নি, সেটিও পরিষ্কার। এজন্য আমরা মনে করি, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে হলে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নির্বাচন পরিচালনার আইনগত ভিত্তি তৈরি করতে হবে।”
তিনি বলেন, “১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যেমন ১৯৭০ সালের নির্বাচন লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তেমনি বর্তমান সরকারের উচিত জুলাই আন্দোলনের ফলাফলকে আইনি কাঠামোতে রূপ দেওয়া। অধ্যাদেশ, গণভোট কিংবা এলএফও (লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার) জারি করে তা বাস্তবায়নের পথ সুগম করতে হবে।”
ডা. তাহেরের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধুই একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের এক সর্বজনীন ঘোষণা। সেই লক্ষ্যেই ৬টি কমিশন গঠনের প্রস্তাব, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার রূপরেখা প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ঘোষিত সনদে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে জনগণের আশাভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, “নতুন সরকার ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। শহীদদের পরিবার, আহত ও নির্যাতিতদের মাঝে নতুন করে হতাশা ও সংশয় দেখা দিয়েছে। অথচ এই সময়টাতেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের রূপরেখা উপস্থাপন করা দরকার ছিল।”
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে জামায়াতের নায়েবে আমির সরকারের প্রতি একগুচ্ছ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “অনতিবিলম্বে জুলাই সনদে গুরুত্বপূর্ণ জনআকাঙ্ক্ষাগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নির্বাচনের পূর্বে একটি গ্রহণযোগ্য ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনের ভেতরে দুঃশাসনের দোসরদের অপসারণ এবং সকল বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাই চেতনার অবমাননা করে যেকোনো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব হলো জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি নতুন, ইনসাফপূর্ণ ও বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমাদের সকল রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে পথ চলতে হবে।”