২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, সোমবার
আহমদ রেজা, আনোয়ারা প্রতিনিধি
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
স্লোগান: জনতার কণ্ঠস্বর
www.bangladeshprothomsangbad.com
আনোয়ার নামেই টিকে আছে পারকি সমুদ্র সৈকত
চট্টগ্রামের আনোয়ারার পারকি সমুদ্র সৈকত একসময় পরিচিত ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য। ঝাউবাগানের ঘন ছায়া, লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ, জাহাজ চলাচল আর সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের আকর্ষণ করত। কিন্তু আজ সেই পারকি সৈকত আর আগের মতো নেই। সৌন্দর্য হারিয়েছে, ঝাউগাছ বিলুপ্তপ্রায়, বসার জায়গার অভাব আর ন্যূনতম অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকায় দর্শনার্থীরা হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
অব্যবস্থাপনা ও সংকট

সরেজমিনে দেখা গেছে, সৈকতে প্রবেশপথে বিভিন্ন যানবাহন থেকে টোল আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে পর্যটকদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয় প্রায়ই। অনেকেই টোলের ঝামেলা এড়াতে সৈকতে না গিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। সৈকত এলাকায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে, ঝাউগাছ কেটে জায়গা দখল করে দোকান ও ঝুপড়ি গড়ে উঠেছে। একসময়কার সবুজ বেষ্টনী এখন প্রায় বিলীন।

গত চার বছরে অন্তত ৫ শতাধিক ঝাউগাছ জোয়ার-ভাটার প্রভাবে উপড়ে পড়েছে। সন্ধ্যা নামতেই বিদ্যুতের অভাবে সৈকত অন্ধকারে ঢেকে যায়। ফলে ভুতুড়ে পরিবেশে পর্যটকরা দ্রুত ফিরে যান।
পর্যটকদের দুর্ভোগ
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক তানবির বলেন, “নাম শুনে এখানে এলাম, কিন্তু বসার জায়গা নেই, খাওয়ার ভালো ব্যবস্থা নেই, হতাশ হয়েছি।” কুষ্টিয়া থেকে আসা গাদ্দাফি রাজন জানান, “পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসে নানা হয়রানি আর অব্যবস্থাপনার মুখে পড়েছি।”
বর্তমানে সৈকতে রয়েছে মাত্র দুটি রেস্তোরাঁ, কয়েক ডজন ঝুপড়ি দোকান ও অস্থায়ী দোকান। খাবারের মান অস্বাস্থ্যকর। দুটি পাবলিক শৌচাগার থাকলেও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই।
বন বিভাগের তথ্য
বন বিভাগ জানায়, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে পারকি সৈকতের বালিয়াড়িতে ঝাউগাছ লাগানো শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক বছরে শত শত একর জায়গা জুড়ে ঝাউবাগান তৈরি করা হয়। এটি সৈকতের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি দুর্যোগ থেকে উপকূল রক্ষা করত। কিন্তু প্রতিবছরের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝাউগাছের সংখ্যা ক্রমেই কমছে।
উন্নয়ন প্রকল্পের বিলম্ব
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ২০১৯ সালে পারকি সৈকতে ৭৯ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। প্রকল্প পরিচালক মাজেদুর রহমান জানান, “৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হবে। তখন সৈকতের সেবার মান বৃদ্ধি পাবে।”
স্থানীয়দের অভিমত
দোকানি লেয়াকত আলী বলেন, “এখানে আসল সৌন্দর্য ছিল ঝাউবাগান আর লাল কাঁকড়া। এখন আর কিছুই নেই। পর্যটকরা হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।” পাশের এক হোটেলের কর্মচারী মো. রানা বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পরপরই লোকজন সৈকত ছেড়ে চলে যান।”
একসময়কার প্রাণবন্ত পারকি আজ টিকে আছে কেবল ‘আনোয়ার নামেই’। অব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত অভাব ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এর খ্যাতি। দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প সম্পন্ন না হলে এ সৈকত তার অস্তিত্ব ও জনপ্রিয়তা হারাবে আরও দ্রুত।