মেসার্স দুর্গা এন্টারপ্রাইজের মালিকের বিরুদ্ধে সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ
জাকিরুল ইসলাম বাবু, জেলা প্রতিনিধি, জামালপুর
জামালপুরে পাইলিংয়ের বোল্ডার তৈরি সংক্রান্ত অনিয়মের চিত্র ধারণ করাকে কেন্দ্র করে এক টেলিভিশন সাংবাদিকের ওপর ন্যক্কারজনক হামলার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (বিকাল) শহরের একটি শিল্পকারখানা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান মেসার্স দুর্গা এন্টারপ্রাইজ–এর স্বত্বাধিকারী শ্যামল চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও স্থানীয় সংবাদকর্মীরা।
ঘটনাস্থলে কী ঘটেছিল
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, চলমান একটি নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা পাইলিং বোল্ডারের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি সরেজমিনে দেখতে যান মুভি বাংলা টেলিভিশন–এর জামালপুর প্রতিনিধি। তিনি কারখানায় গিয়ে বোল্ডার তৈরির প্রক্রিয়া ও উপকরণের মান সংক্রান্ত কিছু চিত্র ধারণ করেন।
এ সময় কারখানার পক্ষ থেকে তাকে বাধা দেওয়া হয়। পরে শ্যামল চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি সাংবাদিকসহ আরও কয়েকজনকে একটি কক্ষে ডেকে নিয়ে যান বলে অভিযোগ। সেখানে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ওই টেলিভিশন প্রতিনিধির ওপর হামলা চালানো হয়।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়, হত্যার হুমকি দেওয়া হয় এবং তার ব্যবহৃত ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া একটি মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। হামলার সময় অন্য সাংবাদিকদেরও হেনস্তা করা হয়েছে বলে জানা যায়।
সাংবাদিক মহলে ক্ষোভ ও উদ্বেগ
ঘটনার পরপরই জামালপুর প্রেসক্লাবসহ স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। তারা বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের হামলা কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত।

সাংবাদিক নেতারা অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন করতে গেলে সাংবাদিকরা নানাভাবে হুমকি ও হামলার শিকার হচ্ছেন। এ ধরনের ঘটনা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, “যদি অনিয়ম না থাকে, তবে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে জবাব দেওয়া যেত। হামলা করে সত্য চাপা দেওয়া যায় না। বরং এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।”
প্রশাসনের প্রতি দাবি
সাংবাদিক মহল এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে শ্যামল চন্দ্র সাহাকে গ্রেফতারসহ জড়িত সকলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে হামলার সুষ্ঠু তদন্ত, ছিনতাইকৃত মোবাইল ও ক্ষতিগ্রস্ত ক্যামেরার ক্ষতিপূরণ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাটি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকরা রাষ্ট্র ও সমাজের ‘ওয়াচডগ’ বা নজরদারির ভূমিকায় থাকেন। উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি-বেসরকারি কাজের স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব।
সাংবাদিক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
এ ঘটনায় জামালপুর জেলায় সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছেন, “সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সাংবাদিকরা কাজ করে যাবে—ভয়ভীতি বা হামলা তাদের থামাতে পারবে না।”
রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগে প্রশ্নের মুখে দুর্গা এন্টারপ্রাইজের মালিক
জামালপুরে সাম্প্রতিক সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত মেসার্স দুর্গা এন্টারপ্রাইজের মালিক শ্যামল চন্দ্র সাহাকে ঘিরে এলাকায় নতুন করে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী ও বাসিন্দা দাবি করেন, তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন কাজ বাগিয়ে নেওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং ভিন্নমত দমনের চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত আদালতের কোনো চূড়ান্ত রায় প্রকাশ হয়নি।
সাংবাদিক মহল বলছে, যদি সত্যিই রাজনৈতিক ছত্রছায়া ব্যবহার করে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করে থাকেন, তবে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি যেন ন্যায্য তদন্তের সুযোগ পান—সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনার তদন্ত ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে জানানো হবে।