সাধন সাহা জয়
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সদর ব্রিজের জায়গা দখল করে অবৈধভাবে দোকানপাট বসানোর অভিযোগ উঠেছে। ব্রিজের দুই পাশসহ সড়কের একটি বড় অংশ দখল করে ফল, সবজি ও বিভিন্ন পণ্যের অস্থায়ী দোকান বসানোয় প্রতিদিনই সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী, শিক্ষার্থী, রোগী, পরিবহনচালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কতিপয় ব্যবসায়ী সড়ক ও ব্রিজের জায়গা দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই আবারও একই স্থানে দোকান বসিয়ে দখল নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেল ব্রিজের ওপর বাজার
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে সরেজমিনে বাঞ্ছারামপুর সদর ব্রিজ ও সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ব্রিজের দুই পাশে এবং সড়কের অংশবিশেষে সারি সারি অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। কোথাও ফলের দোকান, কোথাও সবজি, আবার কোথাও বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে ব্যবসা করছেন বিক্রেতারা।
বিভিন্ন দোকানে রঙিন ছাতা টাঙিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে দেখা যায়। এমনকি ব্রিজের ওপরের অংশেও দোকান বসিয়ে প্রকাশ্যে চলছে কেনাবেচা। ফলে পথচারী ও যানবাহনের জন্য স্বাভাবিক চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
একদিকে ব্রিজের ওপর দোকানপাট, অন্যদিকে দুই দিক থেকে আসা যানবাহন—দুইয়ের চাপে অল্প জায়গার মধ্যেই প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে যানজট। রিকশা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, মালবাহী যানসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনকে ধীরগতিতে চলাচল করতে হচ্ছে।
রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও আটকে যাওয়ার অভিযোগ
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি, ব্রিজের ওপর বাজার বসানোর কারণে শুধু সাধারণ যাত্রী বা পথচারী নয়, জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও যানজটে আটকে পড়ছে।
তাদের ভাষ্য, কোনো রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে সড়কের এমন পরিস্থিতিতে চালকদের নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়। জরুরি মুহূর্তে কয়েক মিনিটের বিলম্বও রোগীর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
একই সঙ্গে সরু ব্রিজের ওপর মানুষ ও যানবাহনের পাশাপাশি দোকান বসানো থাকায় পথচারীদের নিরাপদে চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থী ও পথচারীদের দুর্ভোগ
ব্রিজটি স্থানীয় মানুষের নিয়মিত চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এটি ব্যবহার করেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, রোগী ও সাধারণ পথচারীদেরও এই পথ দিয়ে চলাচল করতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দোকানের সামনে ক্রেতাদের ভিড়, পণ্যসামগ্রী রাখার জায়গা এবং যানবাহনের চাপ—সব মিলিয়ে ব্রিজ ও সড়কের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। অনেক সময় পথচারীদের যানবাহনের মাঝখান দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়।
যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা
স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। ব্রিজের ওপর জায়গা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনগুলো অনেক সময় মুখোমুখি হয়ে পড়ে। একই সময়ে পথচারী ও শিক্ষার্থীরাও সড়ক ব্যবহার করায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, কোনো ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারালে কিংবা হঠাৎ কোনো পথচারী সড়কে পড়ে গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে ব্রিজের ওপর জরুরি মুহূর্তে যান চলাচলের পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
উচ্ছেদের পর আবারও দখলের অভিযোগ
এলাকাবাসী জানায়, সড়ক ও ব্রিজের অবৈধ দখল উচ্ছেদে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানের সময় দোকানপাট সরিয়ে দেওয়া হলেও কিছুদিন পর আবারও একই স্থানে দোকান বসানোর অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি সরকারি জায়গা দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা হয়ে থাকে, তাহলে উচ্ছেদের পর একই জায়গায় কীভাবে পুনরায় দোকান বসছে?
তাদের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। উচ্ছেদের পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিয়মিত নজরদারি এবং পুনরায় দখল ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ের কিছু ব্যক্তির ছত্রছায়ায় এসব দখলদাররা বারবার সড়ক ও ব্রিজের জায়গা দখল করে দোকান বসানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের কোনো দায়িত্বশীল নেতার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগটি স্বাধীনভাবে যাচাই করাও সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি সড়ক, ব্রিজ কিংবা জনসাধারণের চলাচলের জায়গা দখলের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
শুধু যানজট নয়, জননিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে
স্থানীয়দের মতে, বিষয়টি এখন শুধু যানজটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে জননিরাপত্তা, পথচারীদের নিরাপদ চলাচল এবং জরুরি সেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম।
একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ যদি নিয়মিত বাজার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে আগুন, দুর্ঘটনা, অসুস্থ রোগী পরিবহন কিংবা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক ও ব্রিজ মূলত যানবাহন ও মানুষের নিরাপদ চলাচলের জন্য নির্মিত। এসব স্থানে স্থায়ী বা অস্থায়ী দোকান বসিয়ে চলাচলের জায়গা সংকুচিত করা হলে তা জনদুর্ভোগের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
প্রশাসনের বক্তব্য
বিষয়টি নিয়ে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল এমরান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি দেখছি। আইনগতভাবে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পাওয়ার পর স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করে ব্রিজ ও সড়কের অবৈধ দখল চিহ্নিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
স্থায়ী সমাধান চান এলাকাবাসী
এলাকাবাসীর দাবি, বাঞ্ছারামপুর সদর ব্রিজ ও সংলগ্ন সড়ক দ্রুত দখলমুক্ত করে সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে যারা সরকারি জায়গা দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
তাদের আরও দাবি, উচ্ছেদের পর যাতে পুনরায় কেউ ব্রিজ বা সড়ক দখল করতে না পারে, সেজন্য নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ ও সড়ক যদি বারবার দখল হয়ে যায়, তাহলে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পরও কেন স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না? কার প্রভাব বা কার অবহেলায় সরকারি চলাচলের জায়গা বারবার দখলের সুযোগ তৈরি হচ্ছে?
এখন প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, বাঞ্ছারামপুর সদর ব্রিজ ও সংলগ্ন সড়ক দ্রুত দখলমুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচলের উপযোগী হয় কি না।