মুন্সিগঞ্জে প্রশিকা ম্যানেজারের ৬ লক্ষাধিক টাকা আত্মসাৎ: পলায়ন করেও নিস্তার নেই, কঠোর কারাদণ্ড ও সম্পত্তি ক্রোকের মুখে প্রতারক মনিরুজ্জামান!
মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি | মোঃ সুজন বেপারী
তারিখ: ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
[মুন্সিগঞ্জ ডেস্ক]: মানুষের আমানত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে কোটি মানুষের আস্থার প্রতীক এনজিও সেক্টরকে কলঙ্কিত করা এবং এক অসহায় নারীর রক্তজল করা ৬ লক্ষ ৫ হাজার টাকা চুরির অভিযোগে এখন কাঠগড়ায় মুন্সিগঞ্জের সিপাহিপাড়া (কাঠালতলা) প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন সংস্থার পলাতক ম্যানেজার মোঃ মনিরুজ্জামান। পটুয়াখালীর এই ‘সাদা পোশাকে ডাকাত’ এখন প্রশাসনের হুলিয়াভুক্ত আসামি। ভুক্তভোগী নাছিমা আক্তারের চোখের পানি এখন অগ্নিকুণ্ড হয়ে তাড়া করছে এই প্রতারককে।
১. অপরাধের ভয়ংকর চিত্র: যেভাবে পাতা হয়েছিল প্রতারণার জাল
অভিযুক্ত মনিরুজ্জামান (৫৩) দীর্ঘ পরিকল্পিতভাবে নাছিমা আক্তারের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন সংস্থার মতো একটি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে তিনি উচ্চ মুনাফার টোপ দেন। নাছিমা আক্তার জানতেন না যে, তিনি যে টাকাগুলো পরম মমতায় ম্যানেজারের হাতে তুলে দিচ্ছেন, সেগুলো কোনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডে জমা না হয়ে মনিরুজ্জামানের ব্যক্তিগত পকেটে যাচ্ছে।
যখন নাছিমা আক্তার লভ্যাংশের জন্য অফিসে যান, তখন অফিসের কর্মকর্তাদের মুখ থেকে “কোনো টাকা জমা হয়নি”—এই বাক্যটি শোনার পর তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। এটি কেবল একটি চুরি নয়, এটি একটি জীবন্ত মানুষের স্বপ্ন খুনের নামান্তর।
২. আইনের লৌহকপাট: কোন কোন ধারায় পিষ্ট হবে অপরাধী?
মুন্সিগঞ্জ জেলা দায়রা জজ আদালতে দায়েরকৃত সি.আর মামলা (নম্বর ১৭৮/২৫) এবং এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলাটি এখন অগ্নিরূপ ধারণ করেছে। আইনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মনিরুজ্জামান নিচের কঠোরতম সাজার মুখোমুখি:
দণ্ডবিধি ৪০৬ ধারা (Criminal Breach of Trust): বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে তাকে ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
দণ্ডবিধি ৪২০ ধারা (Cheating): এই ধারায় জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের দায়ে সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল এবং বিশাল অংকের জরিমানা অনিবার্য।
এন.আই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারা: চেকে স্বাক্ষর বা আর্থিক অঙ্গীকার ভঙ্গের দায়ে ১ বছরের জেলসহ চেকে উল্লিখিত টাকার তিনগুণ (১৮ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা) পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
সতর্কবার্তা: আদালত যদি মনে করেন, তবে তার নামে থাকা সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি (জমি, বাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স) সরকারিভাবে ক্রোক (Auction) করে ভুক্তভোগীর টাকা পরিশোধের আদেশ দেবেন। পালানোর কোনো পথই খোলা নেই!
৩. প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যোগসূত্র
যদিও এনজিওসমূহ সরাসরি এনজিও বিষয়ক ব্যুরো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু প্রশিকার মতো সংস্থাগুলো সামাজিক শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালায় বিধায় তাদের কর্মকাণ্ডের তদারকি সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিস্তৃত।
মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ: এই ধরনের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা নীতির পরিপন্থী। সরকার ইতোমধ্যে এনজিওগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে।
চাকরিচ্যুতির চূড়ান্ত খড়গ: প্রশিকা কর্তৃপক্ষ তাকে বরখাস্ত করলেও এটিই শেষ নয়। তার সার্ভিস বইতে ‘Disgraceful Dismissal’ (লজ্জাজনক বরখাস্ত) সিল মেরে দেওয়া হবে, যার ফলে বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে সে কোনোদিন ঝাড়ুদারের চাকরিও পাবে না। তার ন্যাশনাল আইডি কার্ড (NID) ব্যবহার করে যে কোনো আর্থিক লেনদেন বন্ধ করার আইনি প্রক্রিয়া চলমান।
৪. অপরাধীর প্রোফাইল: পলাতক থাকা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র
পলাতক আসামি মনিরুজ্জামান (৫৩), পিতা- আব্দুল লতিফ সিকদার, গ্রাম- ভায়লা, থানা ও জেলা পটুয়াখালী। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) নং- ৭৭৪/২৫ জারি করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি থানায় তার ছবি ও তথ্য পৌঁছে গেছে। পটুয়াখালী ও মুন্সিগঞ্জ পুলিশ প্রশাসনের যৌথ টিম তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে।
পুরস্কার ঘোষণা: ভুক্তভোগী পরিবার এই ধূর্ত প্রতারককে ধরিয়ে দিতে পারলে ২০ হাজার টাকা নগদ পুরস্কার ঘোষণা করেছে। অপরাধীর ছায়া এখন তার নিজের পেছনেই শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫. শেষ কথা: মানবতার বিচার হবেই
মুন্সিগঞ্জের সাধারণ মানুষের মাঝে এই ঘটনা তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এডভোকেট এ কে এম আওলাদ হোসেনের বলিষ্ঠ আইনি লড়াই এবং পুলিশের তৎপরতায় অপরাধী মনিরুজ্জামানকে শীঘ্রই লোহার খাঁচায় বন্দি হতে হবে। মানুষের আমানত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা শয়তানি কারবার এই বাংলার মাটিতে সহ্য করা হবে না।
প্রতিবেদকের মন্তব্য: অপরাধ করে পার পাওয়ার দিন শেষ। হয় টাকা ফেরত দিয়ে নাছিমা আক্তারের পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে হবে, নয়তো জেলের ঘানি টেনে বাকি জীবন অন্ধকার কুঠুরিতে পচতে হবে এই নরাধমকে।