বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
মাগুরা/যশোর/ঢাকা: মাগুরার ব্যবসায়ী মোঃ শওকত হায়াত মাহমুদ (শওকত মামুন)-এর পূরবী এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও বিপুল অঙ্কের পাওনা নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি, ২০১৬ সালের ব্যবসায়িক চুক্তি, পণ্য সরবরাহ, বিক্রয়, কমিশন, খাতা-পত্র, ব্যাংক লেনদেন এবং ২০২২ সালের একটি হিসাবসংক্রান্ত নথিতে ৪ কোটি ৭১ লাখ ০৬ হাজার ৫০০ টাকা পাওনার উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারী পক্ষের আরও দাবি, এর বাইরে খুলনা বিভাগ, ময়মনসিংহের ভালুকা, সাতক্ষীরা ও যশোরসহ বিভিন্ন এলাকায় পার্টিভিত্তিক লেনদেনে প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা আটকে রয়েছে।
সবচেয়ে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে বাবুল নামে এক ব্যক্তির কাছে কোম্পানির কথিত ৮৫ লাখ টাকা পাওনা নিয়ে। শওকত মামুনের পক্ষের অভিযোগ, ওই তৃতীয় পক্ষের আর্থিক লেনদেনকে তার পাওনার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে শওকত মামুনের বৈধ পাওনা নিষ্পত্তি আরও জটিল করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ বলছে—চুক্তি, মূল হিসাবখাতা, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চালান, পার্টিভিত্তিক লেনদেন এবং আদালতের নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করলেই প্রকৃত সত্য নির্ধারণ করা সম্ভব।
শূন্য থেকে ব্যবসা দাঁড় করানোর দাবি, শেষপর্যায়ে পাওনা নিয়ে বিরোধ
শওকত মামুনের পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি মেধা, শ্রম, ব্যবসায়িক দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পূরবী এগ্রোর পণ্য বিপণন ও বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাদের দাবি, একপর্যায়ে খুলনা বিভাগ ও ময়মনসিংহের ভালুকা অঞ্চলে কোম্পানির উৎপাদিত ভাসমান মাছের খাদ্য ও পোল্ট্রি ফিডের বিপণন, বিক্রয় এবং ডিলারশিপ পরিচালনার দায়িত্ব তিনি নেন।
চুক্তির আওতায় পণ্য সরবরাহ, বিক্রয়, কমিশন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার হিসাব নির্ধারিত থাকার দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য, ব্যবসা সফল হওয়ার পর একপর্যায়ে পাওনা অর্থ পরিশোধে জটিলতা শুরু হয়। এরপর হিসাব নিষ্পত্তির দাবি জানানো হলে বিরোধ আরও গভীর হয়।
এমনকি তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও করেছেন তারা।
তবে কোন ব্যক্তি কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেছেন—এটি স্বাধীনভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত দায় আরোপ করা যায় না।
২০১৬ সালের ১৫ জুনের চুক্তি—বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা
সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১৫ জুন শওকত মামুন ও পূরবী এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মধ্যে একটি ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদিত হয়।
চুক্তির আওতায়—
খুলনা অঞ্চলে পণ্য বিপণন;
ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা;
মাছের খাদ্য ও পোল্ট্রি ফিড বাজারজাত;
বিভিন্ন ডিলারের কাছে পণ্য সরবরাহ;
বিক্রয় ও কমিশন হিসাব;
পার্টিভিত্তিক লেনদেন;
এবং নির্দিষ্ট আর্থিক সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা
ছিল বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ দাবি করছে।
এই চুক্তির মূল কপি, সংযুক্ত শর্তাবলি এবং পরবর্তী সংশোধনী থাকলে সেগুলোই এখন অনুসন্ধানের অন্যতম প্রধান দলিল।
২০২২ সালের নথিতে ৪ কোটি ৭১ লাখ ০৬ হাজার ৫০০ টাকা—কীসের হিসাব?
এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো ২০২২ সালের একটি হিসাবসংক্রান্ত নথি, যেখানে শওকত মামুনের পক্ষের দাবি অনুযায়ী—
৪ কোটি ৭১ লাখ ০৬ হাজার ৫০০ টাকা
পাওনার অঙ্ক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
এই অঙ্কটি কীভাবে তৈরি হয়েছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কারণ কোটি টাকার পাওনার ক্ষেত্রে শুধু একটি মোট অঙ্ক যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পুরো হিসাবের উৎস।
অর্থাৎ—
কত টাকার পণ্য সরবরাহ হয়েছে?
কত টাকার বিক্রয় হয়েছে?
কত কমিশন নির্ধারিত ছিল?
কত টাকা ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে?
কত টাকা সমন্বয় হয়েছে?
কত টাকা বকেয়া রয়েছে?
কোন পার্টির কাছে কত টাকা আটকে আছে?
কোম্পানির লেজারে শওকত মামুনের নামে কী অঙ্ক রয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে ৪ কোটি ৭১ লাখ ০৬ হাজার ৫০০ টাকার দাবির প্রকৃত ভিত্তি পরিষ্কার হবে।
আরও প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা বিভিন্ন এলাকায় আটকে থাকার দাবি
শওকত মামুনের পক্ষের আরও দাবি, মূল হিসাবের বাইরে খুলনা, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরা ও যশোরসহ বিভিন্ন এলাকায় পণ্য সরবরাহ ও বিক্রয় সংক্রান্ত আরও প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা বিভিন্ন পর্যায়ে আটকে রয়েছে।
তবে এই অঙ্কের প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
যাচাই করতে হবে—
১. সংশ্লিষ্ট পার্টির নাম;
২. চালান নম্বর;
৩. পণ্যের পরিমাণ;
৪. সরবরাহের তারিখ;
৫. বিক্রয়মূল্য;
৬. কমিশন;
৭. আদায়কৃত অর্থ;
৮. বকেয়া অর্থ;
৯. ব্যাংক লেনদেন;
১০. কোম্পানির লেজার।
এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা ছাড়া ১ কোটি ১৩ লাখ টাকাকেও চূড়ান্ত পাওনা হিসেবে সংবাদে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না।
বাবুলের কাছে ৮৫ লাখ টাকা—শওকত মামুনের পাওনার সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়?
এখন অনুসন্ধানের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাবুল নামে এক ব্যক্তির কাছে কথিত ৮৫ লাখ টাকা।
শওকত মামুনের পক্ষের দাবি, পূরবী এগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল হক বাবুলের কাছে কোম্পানির ওই অর্থ পাওনা থাকার বিষয়টি সামনে এনেছেন।
অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, বাবুলের সঙ্গে শওকত মামুনের পৃথক কোনো দায় বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক না থাকলে বাবুলের কাছে কোম্পানির পাওনা অর্থ শওকত মামুনের পাওনা নিষ্পত্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আইনগত ও হিসাবগত ভিত্তি কী—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর অনুসন্ধানী প্রশ্ন—
বাবুলের কাছে কোম্পানির ৮৫ লাখ টাকা পাওনা থাকলে সেই টাকা শওকত মামুনের পাওনা পরিশোধের সঙ্গে কেন যুক্ত হবে?
এর উত্তর দিতে প্রয়োজন—
বাবুলের সঙ্গে কোম্পানির চুক্তি;
লেজার;
চালান;
ব্যাংক স্টেটমেন্ট;
দেনা-পাওনার স্বীকৃতি;
কোনো সমন্বয়পত্র;
এবং প্রয়োজন হলে আদালতের নথি।
এমডি মাহমুদুল হকের বক্তব্য ঘিরে নতুন বিতর্ক
শওকত মামুনের পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে পূরবী এগ্রোর এমডি মাহমুদুল হকের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বাবুলের কাছে কোম্পানির অর্থ পাওনার বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং বাবুল অর্থ পরিশোধ করলে শওকত মামুনের হিসাব করার কথা বলেন—এমন বক্তব্য সংশ্লিষ্ট পক্ষ দাবি করেছে।
এই বক্তব্যের সত্যতা ও সঠিক প্রেক্ষাপট যাচাই করতে রেকর্ড করা বক্তব্য, লিখিত যোগাযোগ বা সরাসরি কোম্পানির লিখিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
তবে বক্তব্যটি যদি হুবহু এমন হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে,
> একজন তৃতীয় ব্যক্তির কাছে কোম্পানির পাওনা কীভাবে শওকত মামুনের পৃথক ব্যবসায়িক পাওনার হিসাব নিষ্পত্তির পূর্বশর্ত হয়ে উঠল?
এ বিষয়ে মাহমুদুল হক ও পূরবী এগ্রোর পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য প্রকাশ করা জরুরি।
‘তৃতীয় পক্ষের দায় আমার ঘাড়ে কেন?’—শওকত মামুনের পক্ষের প্রশ্ন
শওকত মামুনের পক্ষের অভিযোগ—
বাবুলের সঙ্গে কোম্পানির আর্থিক সম্পর্ক যদি পৃথক হয়, তাহলে বাবুলের ৮৫ লাখ টাকার বিষয়টি শওকত মামুনের পাওনার হিসাবের সঙ্গে কেন যুক্ত করা হবে?
তাদের আরও দাবি, এই ধরনের সমন্বয় যদি কোনো লিখিত চুক্তি বা আইনি অনুমোদন ছাড়া করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
তবে কোনো অর্থকে ‘আত্মসাৎ’ বা ‘প্রতারণা’ বলা যাবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নথি, লেনদেন, উদ্দেশ্য ও আইনগত উপাদান প্রমাণের ওপর।
৮৫ লাখ টাকার মামলা থাকলে আদালতের নথিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি, বাবুলের সঙ্গে ৮৫ লাখ টাকার লেনদেন নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে।
তবে এই তথ্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন,
মামলা নম্বর, আদালতের নাম, বাদী-বিবাদীর নাম, মামলার তারিখ, অভিযোগের ধরন এবং বর্তমান অবস্থা।
আদালতের নথিতে যদি ৮৫ লাখ টাকার লেনদেনের বিস্তারিত থাকে, তাহলে আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে দেখা প্রয়োজন—
শওকত মামুন কি ওই মামলার কোনো পক্ষ?
যদি না হন, তাহলে—
বাবুলের আর্থিক দায় কীভাবে শওকত মামুনের পাওনার সঙ্গে যুক্ত হলো?
এই প্রশ্নের উত্তর আদালতের নথি ও হিসাবপত্র থেকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়া সম্ভব।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ—প্রমাণ কোথায়?
শওকত মামুনের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পরিবেশে পাওনা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করতে গিয়ে তারা প্রভাব ও চাপের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে সাধারণ আইনি প্রক্রিয়ায় তারা কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাননি।
তবে এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তাই তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন—
ফোনকলের রেকর্ড;
লিখিত যোগাযোগ;
জিডি বা মামলা;
প্রশাসনিক নথি;
সাক্ষীর বক্তব্য;
ব্যবসায়িক চিঠিপত্র;
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ;
এবং ঘটনাকালের অন্যান্য প্রমাণ।
নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না।
অসুস্থতার ঘটনা: পাওনা বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কও যাচাইযোগ্য
শওকত মামুনের ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক বিরোধ ও আর্থিক চাপের কারণে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ব্রেন স্টক করেন এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত সমস্যায় চিকিৎসাধীন ছিলেন।
তবে একজন ব্যক্তির অসুস্থতার কারণকে কোনো ব্যবসায়িক পক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং চিকিৎসকদের মতামত ছাড়া ব্যবসায়িক বিরোধের কারণে সরাসরি স্ট্রোক হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে দেওয়া সমীচীন নয়।
এটি পৃথকভাবে যাচাইযোগ্য বিষয়।
হিসাবের আসল রহস্য: ৪ কোটি ৭১ লাখ ৬ হাজার ৫০০ টাকা কীভাবে হলো?
অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এখানেই।
শওকত মামুনের পক্ষের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী মোট পাওনা,
৪,৭১,০৬,৫০০ টাকা।
এখন প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ রিকনসিলিয়েশন স্টেটমেন্ট।
অর্থাৎ—
Opening Balance
পণ্য সরবরাহের মূল্য
কমিশন/অন্যান্য পাওনা
− পরিশোধিত অর্থ
− সমন্বয়
− ফেরত/ক্রেডিট নোট
= চূড়ান্ত পাওনা
এই গাণিতিক হিসাব কোম্পানির লেজার ও ব্যাংক স্টেটমেন্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই প্রকৃত অঙ্ক বেরিয়ে আসবে।
ব্যাংক স্টেটমেন্ট বনাম খাতা-পত্র—কার কথা সত্য?
কোটি টাকার ব্যবসায়িক বিরোধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণগুলোর একটি হলো ব্যাংক লেনদেন।
জানতে হবে—
কোম্পানি কখন টাকা দিয়েছে?
কাকে দিয়েছে?
কত দিয়েছে?
কোন অ্যাকাউন্টে দিয়েছে?
শওকত মামুন কত টাকা পেয়েছেন?
কোন লেনদেন কমিশনের?
কোনটি পণ্যের মূল্য?
কোনটি অগ্রিম?
কোনটি সমন্বয়?
একই লেনদেন যদি কোম্পানির লেজার, শওকত মামুনের ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট পার্টির হিসাব—তিন জায়গাতেই মিলে যায়, তাহলে হিসাবের সত্যতা যাচাই অনেক সহজ হবে।
আইনগতভাবে কোন ধরনের ব্যবস্থা হতে পারে?
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—ব্যবসায়িক পাওনা পরিশোধ না করা এবং ফৌজদারি প্রতারণা এক বিষয় নয়।
প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে বিরোধটি—
চুক্তিগত/দেওয়ানি বিরোধ, নাকি
প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ বা জালিয়াতির মতো ফৌজদারি অপরাধের উপাদানও রয়েছে।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪০৬
যদি তদন্তে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের প্রয়োজনীয় উপাদান প্রমাণিত হয়, তাহলে ধারা ৪০৬ প্রাসঙ্গিক হতে পারে। এর শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় হতে পারে।
ধারা ৪২০
যদি শুরু থেকেই প্রতারণামূলক উদ্দেশ্যে কাউকে প্ররোচিত করে সম্পত্তি বা অর্থ গ্রহণের মতো প্রয়োজনীয় উপাদান প্রমাণিত হয়, তাহলে ধারা ৪২০ প্রযোজ্য হতে পারে। এতে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে শুধু পরবর্তীতে টাকা পরিশোধ না করলেই ধারা ৪২০ প্রমাণিত হয় না।
ধারা ৪৬৫, ৪৬৮ ও ৪৭১
হিসাব, চুক্তি, চালান বা অন্যান্য দলিল জাল করার প্রমাণ পাওয়া গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী জালিয়াতি ও জাল দলিল ব্যবহারের ধারাগুলো প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
ধারা ৫০৬
ভয়ভীতি বা অপরাধমূলক হুমকির নির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে ধারা ৫০৬সহ সংশ্লিষ্ট বিধান বিবেচনায় আসতে পারে।
কোন ধারা শেষ পর্যন্ত প্রযোজ্য হবে, তা তদন্তকারী সংস্থা ও আদালত প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করবে।
দেওয়ানি আদালতে পাওনা আদায়ের পথও রয়েছে
যদি তদন্তে দেখা যায় বিষয়টি মূলত ব্যবসায়িক চুক্তি অনুযায়ী পাওনা অর্থ পরিশোধের বিরোধ, তাহলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ দেওয়ানি আইনের আওতায় প্রতিকার চাইতে পারেন।
এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে—
মূল চুক্তি;
চুক্তির শর্ত;
চালান;
বিল;
ডেলিভারি রসিদ;
কমিশন শিট;
ব্যাংক স্টেটমেন্ট;
লেজার;
পাওনা স্বীকারের দলিল;
চিঠিপত্র;
ই-মেইল;
পার্টিভিত্তিক হিসাব।
ফরেনসিক অডিট: বিরোধের সবচেয়ে স্বচ্ছ সমাধান?
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ মনে করে, এত বড় আর্থিক বিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে স্বাধীন ফরেনসিক অডিট।
একজন নিরপেক্ষ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা স্বীকৃত অডিট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে—
১. ২০১৬ সালের চুক্তি;
২. ২০১৬-২০২২ সালের লেজার;
৩. সব চালান;
৪. বিক্রয় রেজিস্টার;
৫. কমিশন শিট;
৬. ডিলারভিত্তিক হিসাব;
৭. ব্যাংক স্টেটমেন্ট;
৮. বাবুলের সঙ্গে ৮৫ লাখ টাকার লেনদেন;
৯. শওকত মামুনের সঙ্গে কোম্পানির লেনদেন;
১০. ১ কোটি ১৩ লাখ টাকার আঞ্চলিক হিসাব;
১১. ক্রেডিট ও ডেবিট নোট;
১২. পরিশোধিত অর্থ;
১৩. বকেয়া অর্থ;
১৪. কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত নথি;
১৫. চূড়ান্ত পাওনা।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর ২০ দফা অনুসন্ধান দাবি
১. ২০১৬ সালের ১৫ জুনের চুক্তির মূল কপি যাচাই।
২. চুক্তির বৈধতা ও স্বাক্ষর যাচাই।
৩. চুক্তির আওতায় সব চালান পরীক্ষা।
৪. খুলনা অঞ্চলের লেনদেন যাচাই।
৫. ভালুকা ও ময়মনসিংহের হিসাব যাচাই।
৬. সাতক্ষীরা ও যশোরের পার্টিভিত্তিক হিসাব যাচাই।
৭. ১ কোটি ১৩ লাখ টাকার দাবির প্রতিটি অংশ যাচাই।
৮. ২০২২ সালের ৪ কোটি ৭১ লাখ ০৬ হাজার ৫০০ টাকার নথির উৎস যাচাই।
৯. কোম্পানির লেজারের সঙ্গে ওই অঙ্ক মিলিয়ে দেখা।
১০. শওকত মামুনের ব্যাংক স্টেটমেন্ট যাচাই।
১১. কোম্পানির ব্যাংক স্টেটমেন্ট যাচাই।
১২. বাবুলের কাছে কথিত ৮৫ লাখ টাকার হিসাব যাচাই।
১৩. ৮৫ লাখ টাকার মামলার আদালতের রেকর্ড যাচাই।
১৪. শওকত মামুন ওই মামলার কোনো পক্ষ কি না যাচাই।
১৫. বাবুলের দায় শওকত মামুনের ওপর স্থানান্তরের লিখিত ভিত্তি খোঁজা।
১৬. ক্রেডিট/ডেবিট নোট পরীক্ষা।
১৭. স্বাধীন ফরেনসিক অডিট করা।
১৮. জাল নথির অভিযোগ থাকলে ফরেনসিক ডকুমেন্ট পরীক্ষা।
১৯. রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের অভিযোগ পৃথকভাবে তদন্ত।
২০. তদন্ত শেষে প্রকৃত পাওনাদার ও দায়ী পক্ষ নির্ধারণ।
পূরবী এগ্রোর এমডি মাহমুদুল হকের কাছে ১৫টি সরাসরি প্রশ্ন
১.
২০১৬ সালের ১৫ জুনের চুক্তি কি পূরবী এগ্রো স্বীকার করে?
২.
শওকত মামুনের নামে কোম্পানির লেজারে কোনো পাওনা রয়েছে কি?
৩.
২০২২ সালের নথিতে ৪ কোটি ৭১ লাখ ০৬ হাজার ৫০০ টাকা উল্লেখ থাকলে কোম্পানির অবস্থান কী?
৪.
এই অঙ্কের হিসাব কীভাবে তৈরি হয়েছে?
৫.
কোম্পানি শওকত মামুনকে মোট কত টাকা পরিশোধ করেছে?
৬.
খুলনা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের হিসাব কোম্পানির রেকর্ডে কীভাবে রয়েছে?
৭.
সাতক্ষীরা ও যশোরের প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ টাকার দাবির বিষয়ে কোম্পানির বক্তব্য কী?
৮.
বাবুলের কাছে কোম্পানির ৮৫ লাখ টাকা পাওনার ভিত্তি কী?
৯.
ওই ৮৫ লাখ টাকার বিপরীতে কোনো লিখিত চুক্তি আছে কি?
১০.
এ বিষয়ে মামলা থাকলে মামলা নম্বর ও আদালতের তথ্য কী?
১১.
শওকত মামুন কি ওই মামলার কোনো পক্ষ?
১২.
বাবুলের অর্থ শওকত মামুনের পাওনা নিষ্পত্তির সঙ্গে কেন যুক্ত হবে?
১৩.
শওকত মামুন কি বাবুলের কোনো দায় লিখিতভাবে গ্রহণ করেছেন?
১৪.
কোম্পানি কি স্বাধীন ফরেনসিক অডিটে সম্মত?
১৫.
কোম্পানির চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী শওকত মামুনের পাওনা বা দেনা কত?
মাহমুদুল হকের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ উন্মুক্ত
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে—পূরবী এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল হক এবং সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো পক্ষের লিখিত বক্তব্য বা প্রামাণ্য নথি পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহ প্রকাশ করা হবে।
বিশেষ করে ৮৫ লাখ টাকার কথিত লেনদেন, ২০২২ সালের ৪ কোটি ৭১ লাখ ০৬ হাজার ৫০০ টাকার হিসাব এবং ১ কোটি ১৩ লাখ টাকার আঞ্চলিক পাওনার বিষয়ে কোম্পানির বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চূড়ান্ত প্রশ্ন: একজনের টাকা দিয়ে আরেকজনের হিসাব মেটানো হচ্ছে কি?
এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন একটাই—
বাবুলের কাছে পূরবী এগ্রোর ৮৫ লাখ টাকা পাওনা থাকলে, শওকত মামুনের পৃথক ব্যবসায়িক পাওনা নিষ্পত্তির সঙ্গে ওই অর্থের সম্পর্ক কী?
আর যদি কোম্পানির দাবি হয়, এই দুই হিসাব পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত—তাহলে সেই সম্পর্কের চুক্তি কোথায়?
সমন্বয়পত্র কোথায়?
ব্যাংক লেনদেন কোথায়?
লেজার কোথায়?
আইনি ভিত্তি কোথায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত কোটি টাকার বিরোধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
শেষ কথা: কোটি টাকার বিরোধে আবেগ নয়—নথিই শেষ কথা
শওকত মামুনের পক্ষের দাবি সত্য হলে তার বৈধ পাওনা ফেরত পাওয়ার আইনগত অধিকার রয়েছে।
পূরবী এগ্রোর বক্তব্য যদি হয়—শওকত মামুনের দাবিকৃত অর্থ কোম্পানির কাছে আইনগতভাবে পাওনা নয়, তাহলে কোম্পানির উচিত সেই অবস্থানের পক্ষে চুক্তি, হিসাবখাতা, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চালান ও অন্যান্য প্রমাণ উপস্থাপন করা।
আর বাবুলের কাছে কোম্পানির ৮৫ লাখ টাকা পাওনা সত্য হলে, সেই পাওনার দায় ও হিসাব বাবুল ও কোম্পানির মধ্যকার নথির ভিত্তিতে নির্ধারণ হওয়া উচিত।
কোনো তৃতীয় পক্ষের দায় শওকত মামুনের ওপর চাপানো হয়েছে কি না—তার উত্তরও নথিতেই থাকতে হবে।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ কোনো পক্ষকে আগাম অপরাধী ঘোষণা করছে না।
আমাদের অবস্থান—
> অভিযোগের তদন্ত হোক।
নথি যাচাই হোক।
ব্যাংক স্টেটমেন্ট মিলিয়ে দেখা হোক।
স্বাধীন ফরেনসিক অডিট হোক।
উভয় পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করা হোক।
অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
আর পাওনা বৈধ প্রমাণিত হলে পাওনাদার তার অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাক।
কারণ—
চুক্তি মিথ্যা না সত্য—নথি বলবে।
৪ কোটি ৭১ লাখ ০৬ হাজার ৫০০ টাকা প্রকৃত পাওনা কি না—হিসাব বলবে।
৮৫ লাখ টাকা কার পাওনা—ব্যাংক ও আদালতের নথি বলবে।
১ কোটি ১৩ লাখ টাকা কোথায় আটকে—পার্টিভিত্তিক হিসাব বলবে।
আর কোনো অপরাধ হয়েছে কি না—তদন্ত ও আদালতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে—পূরবী এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল হক এবং সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো পক্ষের লিখিত বক্তব্য বা প্রামাণ্য নথি পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহ প্রকাশ করা হবে।