সাংবাদিকদের ফাঁসাতে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ
কেশবপুর প্রেসক্লাবে হামলার পর আহতদের চিকিৎসা ও ব্যান্ডেজ নিয়ে প্রশ্ন; স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে ‘ভুয়া’ চিকিৎসা নথি তৈরির অভিযোগ, তদন্ত দাবি
কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
যশোরের কেশবপুর প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। হামলার পর অভিযুক্ত পক্ষের কয়েকজনের শরীরে ব্যান্ডেজ দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে প্রশ্ন ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হামলার ঘটনায় নিজেদের দায় এড়ানো এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে কয়েকজনকে মাথা ও হাতে ব্যান্ডেজ করানো হয়েছে।
এ ঘটনায় কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রেহেনেওয়াজের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি, হামলার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের চিকিৎসার নামে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া ব্যান্ডেজ দেওয়া হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ায় তাদের পক্ষে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি তৈরির চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন সাংবাদিক ও স্থানীয় সুধীজন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিভাগ ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রেসক্লাবে হামলা ও সাংবাদিক আহত
গত ২০ সেপ্টেম্বর কেশবপুর প্রেসক্লাবে হামলা, ভাঙচুর এবং সাংবাদিকদের মারধরের অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর প্রেসক্লাবের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চলাকালে একদল ব্যক্তি প্রেসক্লাবে প্রবেশ করে হামলা চালায়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে আহত সাংবাদিকদের মধ্যে দৈনিক লোকসমাজের কেশবপুর প্রতিনিধি জয়দেব চক্রবর্তী, দৈনিক কল্যাণের আবদুল্লাহ আল ফুয়াদ এবং সময়ের খবরের জাহিদ হাসানের নাম এসেছে। কয়েকজনকে কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর প্রেসক্লাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ৫১ সদস্যবিশিষ্ট একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠনের অভিযোগও উঠেছে। তবে এ কমিটি গঠন ও প্রেসক্লাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে।
মাহাবুবুর রশীদ সবুজ ও সাদেক হোসেনকে খুলনায় পাঠানোর দাবি
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় প্রেসক্লাবের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহাবুবুর রশীদ সবুজ ও সদস্য সাদেক হোসেনসহ কয়েকজন আহত হন। তাদের মধ্যে সবুজের হাতের আঙুলে গুরুতর আঘাত এবং সাদেকের মাথা ও বুকের পাঁজরে আঘাতের কথা বলা হয়েছে।
তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলেও অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে সবুজের হাত ভেঙে যাওয়ার এবং সবুজ ও সাদেকসহ পাঁচজন আহত হওয়ার তথ্যও এসেছে।
‘ভুয়া ব্যান্ডেজ’ দেওয়ার অভিযোগ
হামলার পর অভিযুক্ত পক্ষের কয়েকজনের হাতে ও মাথায় ব্যান্ডেজ দেওয়ার কিছু ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।
তাদের দাবি, হামলার ঘটনায় প্রকৃত আহতদের পাশাপাশি হামলাকারী হিসেবে অভিযুক্ত কয়েকজনের শরীরে এভাবে ব্যান্ডেজ দেওয়ার বিষয়টি সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় নিজেদের আহত হিসেবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি বা ভিডিওর ভিত্তিতে কারও আঘাতের প্রকৃতি, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা কিংবা চিকিৎসা সনদের সত্যতা নিশ্চিত করা যায় না। এজন্য হাসপাতালের চিকিৎসা রেজিস্টার, চিকিৎসকের নথি, এক্স-রে বা অন্যান্য মেডিকেল রিপোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসা নথি তৈরির অভিযোগ
কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রেহেনেওয়াজের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি পক্ষ। তাদের অভিযোগ, হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত কয়েকজনকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে অর্থের বিনিময়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যান্ডেজ করে দেওয়া এবং পরবর্তীতে তাদের পক্ষে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি বা সনদ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো আর্থিক লেনদেনের নথি, লিখিত চিকিৎসা প্রতিবেদন বা স্বাধীন প্রমাণ দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর হাতে আসেনি।
ফলে অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসা সনদ দেওয়ার অভিযোগকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিষয়টি সত্য কি না, তা নির্ধারণে স্বাস্থ্য বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রেহেনেওয়াজের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দাবি করেছেন, ফুয়াদ, জয়দেব চক্রবর্তী ও আশরাফুজ্জামান খানের চাপের মুখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শরীরে ব্যান্ডেজ করতে তারা বাধ্য হয়েছেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি এমনভাবে হওয়া কাম্য ছিল না।
তবে তাঁর এই বক্তব্যের বিস্তারিত প্রেক্ষাপট, কোন ব্যক্তিকে কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল এবং চিকিৎসা নথিতে কী উল্লেখ করা হয়েছে—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
পুলিশের বক্তব্যেও তদন্তের সুযোগ
২০ সেপ্টেম্বরের ঘটনার বিষয়ে কেশবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাফিজুর রহমানের বক্তব্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের মধ্যে বিরোধের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছিল এবং উভয় পক্ষকে থানায় এসে আলোচনার কথা বলা হয়েছিল। অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
এ অবস্থায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা, প্রেসক্লাবের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা—সব বিষয় একসঙ্গে তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
তদন্তের দাবি
কেশবপুর প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক মাহাবুবুর রহমান সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য যশোরের পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি, শুধু হামলার ঘটনাই নয়, হামলার পর কারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন, কার কী ধরনের আঘাত ছিল, কী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, কার নির্দেশে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে এবং কোনো চিকিৎসা সনদ দেওয়া হয়ে থাকলে তার ভিত্তি কী—এসব বিষয়ও তদন্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্টার, রোগীর চিকিৎসা নথি, মেডিকেল রিপোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে।
দুই পক্ষের বক্তব্য যাচাই জরুরি
কেশবপুর প্রেসক্লাবের ঘটনা এখন শুধু সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তি, চিকিৎসক বা সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাই হামলার অভিযোগ, আহতদের চিকিৎসা এবং ‘ভুয়া ব্যান্ডেজ’ বা চিকিৎসা সনদ সংক্রান্ত অভিযোগ—প্রতিটি বিষয় পৃথকভাবে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
তথ্যসূত্র: কেশবপুর থানার বক্তব্য ও ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত আজকের পত্রিকা, রূপালী বাংলাদেশ, বিডি২৪লাইভ, গ্রামার কাগজসহ বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্য।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
জনতার কণ্ঠস্বর
আমরা জনতার কণ্ঠস্বরকে প্রকাশ করি