জামালপুরে নারী পাচার মামলায় একজন গ্রেপ্তার: সৌদি পাঠানোর প্রলোভনে তিন লাখ টাকা আত্মসাৎ, শেষমেশ কুয়েতে বন্দি জীবন
জাকিরুল ইসলাম বাবু | জামালপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০২৫
মানব পাচারের ভয়ংকর বাস্তবতা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠল জামালপুরে। সৌদি আরব পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীকে প্রতারণার মাধ্যমে কুয়েতে পাচার ও নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাজিদুল ইসলাম (৩৫) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
মঙ্গলবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো র্যাবের এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার ষাঁড়মারা এলাকা থেকে র্যাব-১৪-এর একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে। তিনি বকশীগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা।
র্যাব সূত্র জানায়, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার এক নারীকে সৌদি আরবের উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ২০২৫ সালের ২ মে ও ১১ জুন—দু’দফায় তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেন সাজিদুল।
কিন্তু তাকে প্রতিশ্রুত গন্তব্য সৌদিতে না পাঠিয়ে অবৈধভাবে কুয়েতে পাচার করা হয়।
সেখানে চাকরি তো দূরের কথা, ওই নারী আটক ও নির্যাতনের শিকার হন। অবশেষে কুয়েত সেনাবাহিনীর সহায়তায় দেশে ফেরত আসেন।
ভুক্তভোগী দেশে ফিরে এসে প্রতারক সাজিদুলের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইলে, সে তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং অশালীন আচরণ করে। এরপর ভুক্তভোগী নারী মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে এজাহার দাখিল করেন।
আদালতের নির্দেশে ৩ জুলাই টুঙ্গিপাড়া থানায় মামলা রুজু করা হয়।
র্যাব-১৪-এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া অ্যান্ড লিগ্যাল উইং) এএসপি লুৎফা জানান,
> “মানব পাচার মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বকশীগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাজিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করি। তাকে টুঙ্গিপাড়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।”
মানব পাচার ও প্রতারণায় প্রযোজ্য আইন ও ধারা
বাংলাদেশে মানব পাচার ও বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতারণা করলে নিচের আইনসমূহ ও ধারা প্রযোজ্য হয়:
মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২
ধারা ৭: কোনো ব্যক্তিকে প্রতারণা বা জোরপূর্বক বিদেশে পাঠানো বা পাচার করলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে।
ধারা ৮: পাচারের উদ্দেশ্যে অর্থ গ্রহণ, সরবরাহ বা লেনদেন অপরাধ হিসেবে বিবেচিত এবং তার জন্য ১০ থেকে ১৫ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০
ধারা ৪২০: প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায় – সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা।
ধারা 468 ও 471: জাল দলিল ব্যবহার করে প্রতারণা করলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান আইন, ২০১৩
বিদেশে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা করলে লائسেন্স বাতিল ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এই ধরনের প্রতারণা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির সীমায় আবদ্ধ নয়; বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।
সতর্ক না হলে আরও অনেক নিরীহ মানুষ এই পাচারচক্রের শিকার হবে।
সরকার ও প্রশাসনের উচিত দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে পাচারকারী চক্রকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা, যাতে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা আর না ঘটে।