জাতিসংঘে তারেক রহমানের সঙ্গে ভুটান ও মালদ্বীপের শীর্ষ নেতাদের পৃথক বৈঠক
বাংলাদেশ-ভুটান ও বাংলাদেশ-মালদ্বীপের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদারে গুরুত্ব; পারস্পরিক স্বার্থ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে মতবিনিময়
নিউইয়র্ক প্রতিনিধি
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট উজ. হুসেইন মোহামেদ লতিফের সঙ্গে পৃথক সাইডলাইন বৈঠক করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এ পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয় ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের কার্যক্রমের ফাঁকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই বৈঠকেই বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন নেতারা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ, ভুটান ও মালদ্বীপের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণে বিদ্যমান সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসে।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগের সঙ্গে বৈঠক করেন। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভুটানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে জনগণের পারস্পরিক কল্যাণে বিদ্যমান সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন দুই নেতা।
বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে দুই দেশের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতা রয়েছে। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এ বৈঠক সেই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে।
বৈঠকে কোন কোন নির্দিষ্ট প্রকল্প বা খাতে নতুন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে—এমন কোনো তথ্য সরকারি প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিদ্যমান সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরও সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা
এরপর মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট উজ. হুসেইন মোহামেদ লতিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত এ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে। মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট পারস্পরিক স্বার্থের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বৈঠকে মালদ্বীপের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করায় অভিনন্দন জানানো হয়। মালদ্বীপ সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি উষ্ণ শুভেচ্ছাও পৌঁছে দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন মোহামেদ লতিফ।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ শুভেচ্ছার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ফোরামে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের ধারাবাহিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। অভিন্ন স্বার্থে মালদ্বীপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার বাংলাদেশের প্রস্তুতির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
আঞ্চলিক সহযোগিতায় গুরুত্ব
নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত দুই পৃথক বৈঠকের আলোচনায় শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশ, ভুটান ও মালদ্বীপ—তিন দেশই দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর আঞ্চলিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতা, বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সমন্বয় জোরদারের সুযোগ নিয়েও নেতাদের মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে।
সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকগুলোতে বিদ্যমান সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করা এবং দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক সুবিধা ও কল্যাণে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
জাতিসংঘে ব্যস্ত কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী
৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার ছিল জাতিসংঘে তার উচ্চপর্যায়ের ব্যস্ত কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন।
দিনের শুরুতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দেওয়া স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণী ও সহধর্মীদের সঙ্গে তারা অংশ নেন। পরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী ও উচ্চপর্যায়ের কার্যক্রমে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
এরপর দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি একাধিক রাষ্ট্র ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ও মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছাড়াও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ের ফিস-এমের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রথমবার জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার প্রথম ভাষণ হবে। প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, তিনি বাংলায় ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প আয়োজিত বিশ্বনেতাদের সম্মানে দেওয়া নৈশভোজেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান অংশ নেন।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নিউইয়র্কে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ও মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পৃথক বৈঠকও সেই কূটনৈতিক কর্মসূচির অংশ। এসব আলোচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর করার পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র সম্প্রসারণের বিষয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ পেয়েছে।