অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের অফশোর সম্ভাবনা; নতুন পিএসসি, বিনিয়োগবান্ধব শর্ত ও দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে বিএনপি সরকারের উদ্যোগ আলোচনায়
বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং বঙ্গোপসাগরের বিপুল অফশোর সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের আওতায় আনার লক্ষ্যে লন্ডনে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড এনার্জিস সামিট ২০২৬’-এ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মোকাবিলায় দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
বিশ্বের জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি অফশোর ব্লকে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়। এর মধ্যে ১১টি অগভীর সমুদ্র এবং ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক রয়েছে। সরকারি জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬ গত ২৪ মে চালু করা হয়েছে এবং সংশোধিত, বিনিয়োগবান্ধব পিএসসি কাঠামোর আওতায় এসব ব্লক উন্মুক্ত করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সম্ভাবনাময় অথচ তুলনামূলকভাবে অনাবিষ্কৃত বঙ্গোপসাগরীয় জ্বালানি সম্পদকে উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আওতায় আনার একটি নতুন প্রচেষ্টা সামনে এসেছে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নেতৃত্বে জ্বালানি অনুসন্ধানে নতুন গতি
সম্মেলনের মিনিস্টেরিয়াল সেশনে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতি এবং তার সঙ্গে বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারের সঙ্গে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে এবং এই চাহিদা পূরণে দেশীয় গ্যাস ও জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের এই দিকটি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ২৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বাংলাদেশের বার্তা ছিল স্পষ্ট—বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিদেশি প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও মূলধনকে বাংলাদেশের জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশের অফশোর বিডিং রাউন্ডে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এমন আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিএনপি সরকারের বড় নীতিগত পদক্ষেপ: ২৬ ব্লক উন্মুক্ত
বাংলাদেশের অফশোর জ্বালানি খাতে বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ হিসেবে ২৬টি ব্লক নিয়ে নতুন বিডিং রাউন্ডকে সামনে আনা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ডে ১১টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের বিডিং রাউন্ডে ২৪টি ব্লক উন্মুক্ত করা হলেও কোনো কোম্পানি শেষ পর্যন্ত বিড জমা দেয়নি। ২০২৬ সালের নতুন উদ্যোগে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আগের উদ্বেগ ও বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পিএসসি কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে বলে সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বাস্তবতার আলোকে ২০২৬ সালের বিডিং রাউন্ডকে কেবল নতুন দরপত্র নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি অংশীদারত্ব পুনর্গঠনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নতুন পিএসসিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য একাধিক সুবিধা
বাংলাদেশের নতুন ‘অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট-২০২৬’-এ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোতে গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে কস্ট রিকভারির সুবিধা, তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির সুযোগ এবং নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ রাখা হয়েছে।
এছাড়া অগভীর সমুদ্র ব্লকে বাপেক্সের জন্য ১০ শতাংশ ক্যারিড ইন্টারেস্ট রাখার বিষয়টিও নতুন কাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য দিক। অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদন পর্যায়ে আমদানিকৃত যন্ত্রপাতিতে শুল্কসংক্রান্ত সুবিধার কথাও সরকারি কাঠামোয় রাখা হয়েছে।
ফলে নতুন পিএসসির লক্ষ্য একদিকে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, অন্যদিকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণের একটি কাঠামো বজায় রাখা।
ব্যর্থ বিডিং থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন উদ্যোগ
বাংলাদেশের অফশোর জ্বালানি অনুসন্ধানে অতীতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ নিশ্চিত হয়নি।
২০২৪ সালের বিডিং রাউন্ডে সাতটি কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনলেও শেষ পর্যন্ত কোনো কোম্পানি প্রস্তাব জমা দেয়নি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় গ্যাসের মূল্য, পাইপলাইন ট্যারিফ, ডেটার প্রাপ্যতা এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের বিষয়গুলো উঠে এসেছিল। এরপর এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন পিএসসি প্রণয়ন করা হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই জায়গাতেই বর্তমান বিএনপি সরকারের জ্বালানি নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দৃশ্যমান—আগের কাঠামো অপরিবর্তিত রাখার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে চুক্তির বাণিজ্যিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
বঙ্গোপসাগরকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ
২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর বাংলাদেশের সামনে বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধানের বড় সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু সমুদ্রসীমা অর্জনের পর সেই সম্ভাবনাকে দ্রুত জ্বালানি উৎপাদনে রূপান্তর করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান উদ্যোগের মাধ্যমে সেই দীর্ঘদিনের সম্ভাবনাকে আবারও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের আলোচনায় আনা হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড এনার্জিস সামিটের আয়োজকরাও বাংলাদেশের ২৬টি অফশোর ব্লককে দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনাময় অফশোর জ্বালানি ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বিডিং রাউন্ডে ১১টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আপস্ট্রিম কোম্পানিগুলোর সামনে এই সুযোগ তুলে ধরতেই বাংলাদেশ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত: মাঠের রাজনীতি থেকে জ্বালানি নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার দায়িত্বও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি বিভাগের সরকারি ওয়েবসাইটে তাকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সরকারি প্রোফাইলে তার রাজনৈতিক পথচলা, বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখা এবং যশোর-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে তার বর্তমান মন্ত্রণালয়ভিত্তিক দায়িত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—দেশের বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদার বিপরীতে অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর নীতিকে বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।
জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশীয় অনুসন্ধানকে অগ্রাধিকার
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পেট্রোবাংলার বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে অনুসন্ধান ও কূপ খননের বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে অফশোর অনুসন্ধানকে কেবল বিদেশি বিনিয়োগের বিষয় হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিনিয়োগ আহ্বানের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের ভারসাম্য
অফশোর জ্বালানি অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য হলেও চুক্তির শর্তে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৬ সালের বিডিং রাউন্ড নিয়ে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। নতুন পিএসসিতে বাপেক্সের অংশগ্রহণ, গ্যাস বিক্রির ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার ভূমিকা এবং অন্যান্য শর্ত সেই ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টার অংশ।
ফলে লন্ডনের সম্মেলনে বাংলাদেশের বার্তা শুধু ‘বিনিয়োগ করুন’—এমন একমুখী আহ্বান নয়; বরং প্রতিযোগিতামূলক চুক্তি কাঠামোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনা অনুসন্ধানের একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ হিসেবেও তা উপস্থাপিত হয়েছে।
লন্ডন থেকে বাংলাদেশের নতুন জ্বালানি বার্তা
ওয়ার্ল্ড এনার্জিস সামিটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি অঙ্গনে দেশের অফশোর সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২৬টি ব্লক, নতুন পিএসসি, আধুনিক ভূতাত্ত্বিক ও সিসমিক ডেটা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য উৎস হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বক্তব্যে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধির যে অগ্রাধিকার উঠে এসেছে, তার সঙ্গে ২৬টি অফশোর ব্লকের বিডিং রাউন্ডের বাস্তব উদ্যোগের একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে—আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে বাস্তব বিডে রূপ দেওয়া, সফল অনুসন্ধান নিশ্চিত করা এবং আবিষ্কৃত সম্পদকে দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত করা।
লন্ডনের মঞ্চে বাংলাদেশের যে বিনিয়োগ আহ্বান উচ্চারিত হয়েছে, তার সফল বাস্তবায়ন হলে বঙ্গোপসাগরের অফশোর জ্বালানি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে।