নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ‘মেম্বার পার্টি’র তাণ্ডবের অভিযোগ: টিপসই দলিলে ১৮ হিন্দু পরিবার ও মন্দির উচ্ছেদের শঙ্কা
প্রভাবশালী যুবদল নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় সুবর্ণচরে তাণ্ডব: ‘মেম্বার পার্টি’র ভূমি দখল ও সংখ্যালঘু উচ্ছেদের চক্রান্ত
টিপসই দলিলের অজুহাতে ১৮ হিন্দু পরিবার ও মন্দির দখলের চেষ্টা, এসপি-ডিসি-ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ সত্ত্বেও নিরুপায় প্রশাসন
বিশেষ প্রতিনিধি, সুবর্ণচর (নোয়াখালী):
নোয়াখালীর সুবর্ণচরে স্বঘোষিত ‘মেম্বার’ পদবীধারী একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী ও দখলদার চক্রের পরিকল্পিত তাণ্ডবে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে স্থানীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়। স্থানীয়ভাবে ‘মেম্বার পার্টি’ নামে পরিচিত এই চক্রটি ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের অস্পষ্ট ও ভুয়া টিপসই দলিলকে পুঁজি করে—সরকার স্বীকৃত আধুনিক নামজারি, রেজিস্ট্রি করা খতিয়ান ও বৈধ দলিল থাকা সত্ত্বেও—সাধারণ নিরীহ মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার পায়তারা চালাচ্ছে।
উপজেলার ৬নং চর আমানউল্লাহ ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডে বসবাসরত ১৮টি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবার এবং ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এক যুগের পুরোনো ‘রাধামাধব মন্দির’-এর জমি দখলের চক্রান্তে মেতে উঠেছে এই সিন্ডিকেট। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এদের অত্যাচার, নিয়মিত প্রাণনাশের হুমকি ও চাঁদাবাজির মুখে ভুক্তভোগীরা জমিতে চাষাবাদ তো দূরে থাক, প্রাণভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ইতিমধ্যে নোয়াখালী জেলা পুলিশ সুপার (এসপি), জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-র কাছে বাদিনী হয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী নিপু রানী সাহা। এছাড়া এসি ল্যান্ডের (সহকারী কমিশনার-ভূমি) কাছেও মৌখিক অভিযোগ জানানো হয়েছে। তবে পুলিশ ও স্থানীয় থানা প্রশাসন নিজেদের ‘অসহায়ত্ব’ প্রকাশ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ভয়ংকর ভূমিখেকো সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিতর্কিত এই ‘মেম্বার পার্টি’র মূল নেতৃত্বে রয়েছেন চরবাটা ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ ভুট্টু ওরফে ভুট্টু মেম্বার। তার মূল সহযোগী হিসেবে এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন চর আমানউল্যা ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক জুম্মন মেম্বার, সুবর্ণচর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বেলাল হোসেন সুমন ওরফে সুমন মেম্বার এবং আনোয়ার মেম্বার ও মনির মেম্বারসহ একদল সংঘবদ্ধ ক্যাডার বাহিনী।
রাজনৈতিক পদ-পদবী ও ক্ষমতার প্রভাব খাঁটিয়ে তারা দীর্ঘদিনের বসবাসকারীদের জমিকে নিজেদের দাবি করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছে। চাঁদা না দিলে হামলা, ভাঙচুর ও সপরিবারে হত্যার হুমকি দেওয়া নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
৬০ বছরের জ্যোতিবালা নিরুদ্দেশ: ভিটেমাটি দখল করে অন্য পরিবারকে বসাল মেম্বার পার্টি
৬০ বছরের সংসারত্যাগী, নিঃস্ব নারী জ্যোতিবালা বৈষ্ণবীর করুণ পরিণতি এই চক্রের নিষ্ঠুরতার এক জ্বলন্ত দলিল। ১৯৯০-এর দশক থেকে নিজস্ব জমি ও বৈধ দলিল নিয়ে বসবাস করে আসা এই বৃদ্ধা নিজের ভাঙাচোরা ঘর মেরামতের জন্য বাড়ির কয়েকটি গাছ বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু গাছ বিক্রির টাকা হাতে পাওয়ার আগেই উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বেলাল হোসেন সুমন ওরফে সুমন মেম্বার জোরপূর্বক সেই টাকা ছিনিয়ে নেয়। এরপর ঘর মেরামতের জন্য মিস্ত্রি আনলে ক্যাডাররা তাদের তাড়িয়ে দেয় এবং জ্যোতিবালার কাছে ৭ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। (ভুক্তভোগীর ভিডিও বক্তব্যেও এই চাঁদাবাজির প্রমাণের কথা জানা গেছে)।
ধারাবাহিক ভয়ভীতি ও অত্যাচারের মুখে বাধ্য হয়ে জ্যোতিবালা বৈষ্ণবী ভিটেমাটি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। বর্তমানে তার ভিটেবাড়িতে ‘মেম্বার পার্টি’ এক উদ্বাস্তু পরিবারকে বসিয়ে সম্পূর্ণ জমিটি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে।
ছাদ ঢালাইয়ের পর নিপু রানীর বাড়ি দখল ও দফায় দফায় সশস্ত্র হামলা
মেঘনার ভাঙনে চারবার নিঃস্ব হওয়া নিপু রানী সাহা জীবিকার তাগিদে একটি এনজিওতে চাকরি শুরু করেন। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে কষ্টার্জিত অর্থ জমিয়ে ২০০৮ সালে স্বামী স্বপন চন্দ্র সাহার নামে সুবর্ণচর উপজেলার চর বজলুল করিম মৌজায় ৩৭৩৫ নং দলিল মূলে ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন (যার বি.এস. খতিয়ান নং ১৬৮০ ও দাগ নং ২২৯)। ২০২৩ সাল থেকে নির্মাণকাজ শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আগে কঠোর পরিশ্রমে ছাদ ঢালাই পর্যন্ত সম্পন্ন করেন।
কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই ভুট্টু মেম্বার ও তার ক্যাডাররা দাবি করে—ওই জমির মালিক তারা নিজেই! হয় তাদের কাছ থেকে পুনরায় জমি কিনতে হবে, নয়তো বিক্রি করে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। পরবর্তীতে সুমন মেম্বারের কাছে বিচার চাইলে তিনি উল্টো ভুট্টুর সাথে চুক্তি করার পরামর্শ দেন। এতে অসম্মতি জানালে ভুট্টু মেম্বারের ভাই মনির মেম্বার ও যুবদল নেতা জুম্মন মেম্বারের নেতৃত্বে অতর্কিত সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
৩০ জুন সকালে প্রথম হামলার সময় জুম্মন মেম্বার, নিপু রানী ও তার ছেলে রুদ্র সাহাকে প্রকাশ্যে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। নিপু রানী চর জব্বর থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল হাসান অভিযুক্ত ভুট্টু মেম্বারকে থানায় হাজির করেন। পরবর্তীতে সুবর্ণচর উপজেলা প্রেসক্লাবের সমন্বয়ে একাধিক সালিশি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও ভুট্টু মেম্বার একটি মনগড়া মামলার কপি ছাড়া মালিকানার কোনো বৈধ কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি। সর্বসম্মতিক্রমে ওসির উপস্থিতিতে লিখিত অঙ্গীকারনামা দিয়ে নিপু রানীকে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
তবে সেই অঙ্গীকারনামা অমান্য করে ২২ আগস্ট শনিবার সকালে পুনরায় কাজ শুরু করলে ভুট্টু মেম্বারের নেতৃত্বে যুবদল কর্মী মনির, জুম্মন, সুমন, কামাল ও নূর মাওলাসহ ১৫-২০ জনের একদল ক্যাডার দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালায়। নিপু রানীকে হত্যার চেষ্টা করা হয়, মিস্ত্রিদের নির্মমভাবে মারধর করে নির্মাণ সামগ্রী ও সিমেন্টের বস্তা পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনা চলাকালীন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ বারবার কল করা হলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে আসেনি বলে ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করেছে।
জীবনঝুঁকিতে পলি রানী মজুমদার ও রাধামাধব মন্দির কমিটি
একই দাগে সবচেয়ে বেশি জমির মালিক পলি রানী মজুমদার। সম্প্রতি সরকারি তহসিল অফিসের কর্মকর্তারা যখন তদন্তে আসেন, তখন সরকারি কর্মকর্তাদের সামনেই বিদেশফেরত স্বামীসহ পলি রানীকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করলেও নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। বর্তমানে উল্টো পলি রানীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। আদালতের বারান্দায় ঘুরতে থাকা পলি রানী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রয়োজনে গহনা বিক্রি করে আইনি লড়াই চালাবো, তবুও এই সন্ত্রাসী ও ভূমিখেকোদের কাছে মাথা নত করবো না।”
এদিকে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত স্থানীয় রাধামাধব মন্দির কমিটির সভাপতি অনিমেষ দাস জানান, যে জমিতে গত এক যুগ ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিয়মিত পূজা-অর্চনা করে আসছেন, ২০২৪ সালের পর থেকে নুর মোহাম্মদ ভুট্টু ও তার সশস্ত্র দলবল সেই মন্দিরটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে এবং মন্দিরের চলমান নির্মাণকাজ জোরপূর্বক বন্ধ করে দিয়েছে।
প্রতিরোধের এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত: কাস্তে হাতে রেখা রানী
সব অন্যায় ও নির্যাতনের মাঝেও এক সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রেখা রানী। নিরক্ষর এই নারী জমিতে মূল মালিকের ওয়ারিশ হিসেবে নিজের অবস্থান থেকে সরেননি। হাতে কাস্তে ও কোদাল নিয়ে মেম্বার পার্টির সশস্ত্র হুমকির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। স্থানীয়দের মতে, এই অদম্য নারীর শক্ত অবস্থানের কাছেই আপাতত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে চক্রটি।
আইনের লঙ্ঘন ও অপরাধের বিবরণ (ফৌজদারি ও ভূমিসংক্রান্ত আইন)
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী গুরুতর ও জামিনঅযোগ্য অপরাধ:
চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন (দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৮৪ ও ৫০৬ ধারা): ঘর মেরামত ও জমিতে বসবাসের জন্য ৭ লাখ টাকা দাবি এবং নিয়মিত ভয়ভীতি দেখানোর দায়ে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
জোরপূর্বক জমি দখল ও অনুপ্রবেশ (দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪৪৭ ও ৪ ৪৮ ধারা): অন্যের বৈধ স্বত্বাধিকারযুক্ত জমিতে অনধিকার প্রবেশ ও ভিটেমাটি দখলের অপরাধে জেল ও জরিমানা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
বেআইনি সমাবেশ ও দাঙ্গা (দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১৪৩, ১৪৭ ও ১৪৮ ধারা): সশস্ত্র দলবদ্ধ হয়ে মারধর ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোয় দাঙ্গা ও বেআইনি সমাবেশের অপরাধ পূর্ণাঙ্গভাবে প্রমাণিত হয়।
খুনের চেষ্টা ও মারধর (দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩২৪, ৩২৫ ও ৩০৭ ধারা): নিপু রানী সাহাকে হত্যাচেষ্টা ও মিস্ত্রিদের মারধরের দায়ে ৩০৭ ধারায় ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তির বিধান রয়েছে।
সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি (দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪২৭ ধারা): নির্মাণ সামগ্রী নষ্ট ও সিমেন্ট পানিতে ফেলে ক্ষতির অপরাধে বিচারযোগ্য।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩: ২০২৩ সালে প্রণীত নতুন আইন অনুযায়ী ভুয়া নথিপত্র দেখিয়ে জমি দাবি করা, বলপ্রয়োগ করে জমি দখল ও জোরপূর্বক উচ্ছেদ সরাসরি একটি গুরুতর অপরাধ, যার শাস্তি ২ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।
প্রশাসনের ভূমিকা ও স্থানীয়দের দাবি
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানান, প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং ভুক্তভোগীদের নামজারি ও রেজিস্ট্রি করা কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আইনি সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
তবে থানা পুলিশের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ‘অসহায়ত্ব’ প্রকাশ করায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জোরালো দাবি—জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে অনতিবিলম্বে অভিযুক্ত নুর মোহাম্মদ ভুট্টু, জুম্মন, সুমন ও মনিরের মতো সন্ত্রাসী ভূমিখেকোদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় সাধারণ পরিবারগুলো নিজ জন্মভূমিতে উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে, যা স্বাধীন দেশে আইনের শাসনের জন্য এক চরম কলঙ্কজনক অধ্যায়।