• বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে শুরু হয়েছে ১৪তম Athens Democracy Forum (ADF) 2026। ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ আন্তর্জাতিক ফোরামে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, নাগরিক অংশগ্রহণ, প্রযুক্তি, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা চ্যালেঞ্জ অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশ বিশ্বের জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সম্মেলন রাজশাহী ওয়াসার মেগা প্রকল্পে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ: কার অনুমোদনে সাব-কন্ট্রাক্ট, কোথায় গেল কোটি কোটি টাকা? সাতবাড়ীয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ: চক্রান্তের দাবির বিপরীতে সত্য, সম্মান ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বার্থী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে বাঘমারা-বার্থী খাল পরিষ্কার অভিযান অষ্টগ্রামে বিএনপির অন্তর্কোন্দল ও অস্থিতিশীলতা: তৃণমূলের বিশৃঙ্খলা, মাদক বাণিজ্য ও আওয়ামী আঁতাতের অভিযোগ ঘিরে তৈরি রাজনৈতিক সংকট নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ‘মেম্বার পার্টি’র তাণ্ডবের অভিযোগ: টিপসই দলিলে ১৮ হিন্দু পরিবার ও মন্দির উচ্ছেদের শঙ্কা ১৯ জুলাই রাজপথে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সেই দেশপ্রেমিক প্রকৌশলী জুয়েলকে ‘আওয়ামী লীগ’ ট্যাগ দেওয়ার অভিযোগ, নথিতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার তথ্য আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেধাস্বত্বের আন্তর্জাতিক কাঠামো, কৃষকের বীজ অধিকার ও জেনেটিক প্রযুক্তি নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন—তবে বিতর্কিত দাবির সঙ্গে প্রমাণিত তথ্য আলাদা করার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

রাজশাহী ওয়াসার মেগা প্রকল্পে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ: কার অনুমোদনে সাব-কন্ট্রাক্ট, কোথায় গেল কোটি কোটি টাকা?

বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ ডেস্ক রিপোর্ট / ৩৮ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

 

রাজশাহী ওয়াসার ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে সাব-কন্ট্রাক্টের নামে কোটি কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ

চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে ওয়ার্ক অর্ডার, বালু সরবরাহ ও লাভের প্রলোভন—পাওনা ফেরত না পাওয়ার দাবি; মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ, তদন্তের দাবি জোরালো

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদক | রাজশাহী

রাজশাহী ওয়াসার বহুল আলোচিত ‘সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ প্রকল্প ঘিরে সাব-কন্ট্রাক্ট, বালু সরবরাহ ও বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার নামে ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে প্রকল্পের মূল বাস্তবায়নকারী চীনা প্রতিষ্ঠান হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড (HCEG)-এর কয়েকজন প্রতিনিধির নাম।

তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালত বা কোনো তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা, অর্থের প্রকৃত উৎস ও ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ক অর্ডারের বৈধতা এবং প্রকল্পের সঙ্গে এসব ব্যক্তিগত লেনদেনের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক—সবই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

রাজশাহী ওয়াসার নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রকল্পের লক্ষ্য হলো পদ্মার পানি পরিশোধনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২০০ মিলিয়ন লিটার পানি উৎপাদন এবং রাজশাহী শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো।

প্রকল্পটির ব্যয় বিভিন্ন সরকারি ও সংবাদসূত্রে প্রায় ৪ হাজার ৬২ কোটি টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২১ সালের ২১ মার্চ রাজশাহী ওয়াসা ও চীনের হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নসংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদনের তথ্যও সরকারি সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে।

অভিযোগের সূত্রপাত যেভাবে

অভিযোগকারী ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে বালু সরবরাহসহ বিভিন্ন কাজের সাব-কন্ট্রাক্ট পাওয়ার সুযোগ দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়। কোথাও সরাসরি ওয়ার্ক অর্ডার, কোথাও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে চুক্তি এবং কোথাও নির্দিষ্ট মেয়াদে লাভ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে একজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, তিনি চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় ১ কোটি ঘনফুট বালু সরবরাহের জন্য একাধিক ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছিলেন। পরে তিনি অন্যান্য ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাব-কন্ট্রাক্ট বা সরবরাহ-সংক্রান্ত চুক্তিতে যান।

অভিযোগ অনুযায়ী, একটি পক্ষ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রায় ৬২ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন সময়ে নগদে আরও প্রায় ২০ লাখ টাকা প্রদান করে। বিনিময়ে মাসিক ৬ লাখ টাকা লাভ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলে অভিযোগকারী পক্ষের দাবি। প্রথম চার মাস নিয়মিত অর্থ পাওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে যায় এবং বর্তমানে মূল অর্থ ও কথিত লাভসহ পাওনা ১ কোটি ১৮ লাখ টাকার বেশি বলে তাদের দাবি।

পাঁচ-ছয় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ

এসকে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক সারোয়ার কবির জনি-র বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার মাধ্যমে পাঁচ-ছয়জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোট প্রায় ৫ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তার দাবি, চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প পরিচালক ঝু শিংগুও (Zhu Xingguo)-এর কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার পর ব্যবসায়ীদের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি নিজেই অর্থ না পাওয়ায় পাওনাদারদের অর্থ ফেরত দিতে পারছেন না।

অন্যদিকে অভিযোগে কাজী নাহিদ ইসলাম, যিনি হুনান কনস্ট্রাকশনের QHSE Document Controller হিসেবে পরিচিত, তার মাধ্যমেও অর্থ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে নাহিদ ইসলাম অর্থ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই অর্থ কি প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঠিকাদারি লেনদেন, নাকি ব্যক্তিগত/বেসরকারি সাব-কন্ট্রাক্টিং ব্যবস্থার অংশ?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ক অর্ডার, চুক্তিপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রসিদ, হিসাবপত্র এবং প্রকল্পের অনুমোদিত সাব-কন্ট্রাক্ট তালিকা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ওয়ার্ক অর্ডারের বৈধতা নিয়ে বড় প্রশ্ন

অভিযোগকারীদের সরবরাহ করা নথির মধ্যে হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের লেটারহেডে তৈরি ওয়ার্ক অর্ডার ও চুক্তিপত্র রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের নথি সত্য হলে স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে—

কোন কর্তৃপক্ষ এসব ওয়ার্ক অর্ডার অনুমোদন করেছে?

ওয়ার্ক অর্ডার ইস্যু করার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছিল কি না?

রাজশাহী ওয়াসা এসব সাব-কন্ট্রাক্ট সম্পর্কে অবগত ছিল কি না?

চীনা মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে এসব চুক্তি করেছিল, নাকি কোনো ব্যক্তি বা মধ্যস্থতাকারী নিজস্বভাবে তা করেছে?

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সরকারি প্রকল্পের নামে সাধারণ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের সঙ্গে প্রকল্পের সরকারি অর্থের কোনো সম্পর্ক আছে কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়।

এসকে ট্রেড ওয়াসার তালিকাভুক্ত ঠিকাদার নয়

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঠিকাদার তালিকা।

রাজশাহী ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. পারভেজ মাহমুদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসকে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল রাজশাহী ওয়াসার তালিকাভুক্ত ঠিকাদার নয়।

এই বক্তব্য সত্য হলে বিষয়টি আরও তদন্তযোগ্য হয়ে ওঠে।

কারণ একটি সরকারি প্রকল্পে মূল ঠিকাদার কোনো তৃতীয় পক্ষকে সাব-কন্ট্রাক্ট দিলে সেই সাব-কন্ট্রাক্টের অনুমোদন, চুক্তির শর্ত, কাজের পরিধি এবং অর্থপ্রদানের পদ্ধতি কী ছিল—তা প্রকল্পের চুক্তি ও সরকারি ক্রয়বিধির আলোকে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অবশ্য কোনো প্রতিষ্ঠান ওয়াসার তালিকাভুক্ত ঠিকাদার নয়—এ তথ্য একাই প্রতারণা বা আত্মসাতের প্রমাণ নয়। মূল প্রশ্ন হলো, প্রকল্পের মূল চুক্তি ও অনুমোদিত সাব-কন্ট্রাক্টিং কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা আদৌ বৈধ ছিল কি না।

স্থানীয় প্রশাসনের বৈঠকেও অর্থ ফেরতের প্রতিশ্রুতির অভিযোগ

অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, পাওনা অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও ওয়াসা কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে প্রকল্প পরিচালক ঝু শিংগুও অর্থ গ্রহণের বিষয় স্বীকার করেন এবং অর্থ ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেন। পরে কয়েক দফা সময় দেওয়া হলেও পাওনা পরিশোধ হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

তবে এই বৈঠকের কার্যবিবরণী, উপস্থিত ব্যক্তিদের তালিকা এবং সেখানে কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল—এসব নথি প্রকাশ্যে যাচাই করা না গেলে বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

ব্যাংক লেনদেন ও নগদ অর্থের নথি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান

অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে এবং কিছু অর্থ নগদে প্রদান করা হয়েছে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের পর চীনা প্রতিষ্ঠানের লেটারহেডে স্বাক্ষরযুক্ত রসিদও দেওয়া হয়েছে।

এখানে তদন্তকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে—

১. ব্যাংক স্টেটমেন্ট
২. টাকা জমা দেওয়ার স্লিপ
৩. চেক বা ব্যাংক ট্রান্সফারের তথ্য
৪. নগদ গ্রহণের রসিদ
৫. ওয়ার্ক অর্ডার
৬. সাব-কন্ট্রাক্ট চুক্তি
৭. হুনান কনস্ট্রাকশনের লেটারহেড ও সিল
৮. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বাক্ষর
৯. মোবাইল ফোনের যোগাযোগের রেকর্ড ও বার্তা
১০. প্রকল্পের অনুমোদিত সাব-কন্ট্রাক্ট তালিকা
১১. প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বিল-ভাউচার
১২. সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের অর্থপ্রবাহ।

এসব নথি পাশাপাশি পরীক্ষা করলে অর্থের প্রকৃত গন্তব্য এবং কার নির্দেশে অর্থ নেওয়া হয়েছিল—তা নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রকল্পটির গুরুত্ব

রাজশাহী ওয়াসার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোনো সাধারণ বেসরকারি প্রকল্প নয়। এটি নগরবাসীর দীর্ঘমেয়াদি পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প।

রাজশাহী ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হলো ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পৃষ্ঠস্থ পানি ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ২০৩৫ সালের পানি চাহিদা বিবেচনায় সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানো।

২০২৫ সালের সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রতিবেদনে প্রকল্পটি হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্পের অধীনে সাব-কন্ট্রাক্টিং বাস্তবে হয়েছে—এমন উদাহরণও পাওয়া যায়। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প-তথ্যে হুনান কনস্ট্রাকশনের অধীনে রাজশাহী ওয়াসা প্রকল্পে Concrete Batching Plant Specialized Subcontracting-এর চুক্তির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ প্রকল্পে সাব-কন্ট্রাক্টিং ব্যবস্থা থাকার বিষয়টি নিজেই অস্বাভাবিক নয়। প্রশ্ন হচ্ছে—অভিযোগে উল্লিখিত নির্দিষ্ট সাব-কন্ট্রাক্টগুলো প্রকল্পের অনুমোদিত ও বৈধ কাঠামোর অংশ ছিল কি না।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্য কী?

প্রকাশিত প্রতিবেদনে রাজশাহী ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ বলেছেন, তিনি বিষয়টি দেখবেন এবং চীনা কোম্পানির প্রকল্প পরিচালককে পাওনা অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করতে বলবেন। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে অভিযোগ দেওয়া হলে প্রয়োজন অনুযায়ী তদন্ত হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বিষয়টি জেনে প্রকল্প পরিচালককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলার কথা জানিয়েছেন।

এ বক্তব্যগুলো অভিযোগের নিষ্পত্তি নয়; বরং বিষয়টি প্রশাসনিক পর্যায়ে নজরে আসার ইঙ্গিত দেয়।

মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ

অভিযোগকারী পক্ষের একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগে ওয়ার্ক অর্ডার, চুক্তিপত্র, ব্যাংক লেনদেন ও অর্থ গ্রহণের রসিদ যাচাই এবং অভিযোগ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের সরকারি অর্থ ছাড় স্থগিত রাখার দাবি জানানো হয়েছে।

এখন মন্ত্রণালয়ের জন্য মূল বিষয় হবে অভিযোগটি কেবল পাওনা টাকা সংক্রান্ত বেসরকারি বিরোধ হিসেবে দেখা হবে, নাকি সরকারি প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ, অনুমোদনহীন সাব-কন্ট্রাক্ট, নথির সত্যতা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য অনিয়ম—সবগুলো দিক একসঙ্গে পরীক্ষা করা হবে।

স্থানীয় ওয়াসা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ

অভিযোগকারী কয়েকজন ব্যবসায়ী রাজশাহী ওয়াসার কিছু কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগসাজশের অভিযোগও তুলেছেন।

তবে এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগের পক্ষে চূড়ান্ত সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তিকে দুর্নীতি, আত্মসাৎ বা যোগসাজশে জড়িত বলে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।

বরং তদন্তের মাধ্যমে দেখা দরকার—

কোনো ওয়াসা কর্মকর্তা এসব চুক্তির বিষয়ে অবগত ছিলেন কি না;

কোনো সরকারি কর্মকর্তা ওয়ার্ক অর্ডার অনুমোদন বা সুপারিশ করেছেন কি না;

প্রকল্পের অফিসিয়াল নথিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম রয়েছে কি না;

প্রকল্পের অর্থ কোনো ব্যক্তিগত হিসাবে গেছে কি না;

প্রকল্পের নামে সংগৃহীত অর্থের সঙ্গে সরকারি অর্থের কোনো সংযোগ আছে কি না;

এবং অভিযোগকারীদের দেওয়া নথি প্রকৃতপক্ষে হুনান কনস্ট্রাকশনের অনুমোদিত নথি কি না।

তদন্ত হলে যে বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত

এই ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে তদন্তের আওতায় অন্তত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো রাখা প্রয়োজন—

প্রথমত: হুনান কনস্ট্রাকশনের প্রকল্প-সংক্রান্ত মূল চুক্তি পরীক্ষা।

দ্বিতীয়ত: প্রকল্পে অনুমোদিত সব সাব-কন্ট্রাক্টরের তালিকা সংগ্রহ।

তৃতীয়ত: অভিযোগকারীদের কাছে থাকা ওয়ার্ক অর্ডারের সত্যতা যাচাই।

চতুর্থত: ওয়ার্ক অর্ডারে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তির ক্ষমতা ও দায়িত্ব যাচাই।

পঞ্চমত: সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের অর্থপ্রবাহ পরীক্ষা।

ষষ্ঠত: নগদ অর্থ গ্রহণের রসিদ ও হিসাবপত্র পরীক্ষা।

সপ্তমত: প্রকল্প পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের লিখিত বক্তব্য গ্রহণ।

অষ্টমত: রাজশাহী ওয়াসার কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও যোগাযোগের রেকর্ড পরীক্ষা।

নবমত: অভিযোগকারীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কার্যবিবরণী সংগ্রহ।

দশমত: প্রয়োজন হলে আইনগত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নথি জব্দ/সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া।

প্রশ্ন এখন একটাই—কারা দায়ী, আর কারা প্রতারিত?

এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগে উল্লিখিত কোটি কোটি টাকা কারা গ্রহণ করেছে, কোন ক্ষমতাবলে গ্রহণ করেছে, কোন হিসাবে জমা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে।

যদি নথিপত্রে প্রমাণিত হয় যে কোনো ব্যক্তি প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে অনুমোদন ছাড়া অর্থ সংগ্রহ করেছেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে।

আবার যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত প্রতিনিধিরাই চুক্তি ও অর্থ গ্রহণ করেছেন, তাহলে সেই অর্থের হিসাব এবং পাওনা পরিশোধের দায় নির্ধারণের প্রশ্ন সামনে আসবে।

আর যদি তদন্তে কোনো ওয়াসা কর্মকর্তা বা অন্য কোনো সরকারি/বেসরকারি ব্যক্তি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার ভূমিকা ও দায়ও আইন অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।

প্রকল্পের অর্থ ছাড় নিয়ে সতর্কতার দাবি

অভিযোগকারীরা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সরকারি অর্থ ছাড় স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছেন।

এ ধরনের দাবি বাস্তবায়নের আগে অবশ্য প্রকল্পের মূল চুক্তি, অর্থায়ন কাঠামো এবং সরকারি-বেসরকারি চুক্তিগত দায় পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ একটি প্রকল্পের সব অর্থ আটকে দিলে জনস্বার্থে প্রকল্প বাস্তবায়নও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই অভিযোগের ধরন অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ বা বিতর্কিত লেনদেন আলাদাভাবে পরীক্ষা, অর্থপ্রবাহের অডিট এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট অর্থপ্রদান সম্পর্কে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে।

বড় প্রকল্পে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি

রাজশাহী ওয়াসার এই প্রকল্পের সঙ্গে নগরবাসীর সুপেয় পানির ভবিষ্যৎ সরবরাহ ব্যবস্থা জড়িত। ফলে প্রকল্পের কাজ যেমন সময়মতো ও মানসম্মতভাবে সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন, তেমনি প্রকল্পের প্রতিটি আর্থিক ও ঠিকাদারি কার্যক্রমেও স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।

চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাব-কন্ট্রাক্টর এবং সরকারি কর্তৃপক্ষ—প্রত্যেক পক্ষের দায়িত্ব ও লেনদেনের সীমা নথির মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী বলা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি বড় সরকারি প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা উপেক্ষা করাও উচিত নয়।

শেষ কথা

রাজশাহী ওয়াসার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রকল্পকে ঘিরে সাব-কন্ট্রাক্ট ও বালু সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা নেওয়া এবং তা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ এখন প্রশাসনিক নজরে এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের হাতে ওয়ার্ক অর্ডার, চুক্তিপত্র, ব্যাংক লেনদেন ও অর্থ গ্রহণের রসিদ থাকার দাবি রয়েছে; একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন অর্থ গ্রহণের কথা স্বীকার করেছেন বলেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

অন্যদিকে, প্রকল্পের মূল বাস্তবায়নকারী হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের সঙ্গে রাজশাহী ওয়াসার আনুষ্ঠানিক চুক্তি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি সরকারি সূত্রে নিশ্চিত।

এখন প্রয়োজন অভিযোগ বনাম পাল্টা অভিযোগ নয়—নথি, ব্যাংক হিসাব, চুক্তি, ওয়ার্ক অর্ডার এবং প্রকল্পের অনুমোদিত কাঠামোর ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।

প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে—কারা বৈধভাবে কাজ পেয়েছিল, কারা অর্থ নিয়েছিল, কারা সেই অর্থের সুবিধাভোগী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন কি না, এবং অভিযোগকারীদের দাবিকৃত অর্থ আদৌ প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বৈধ লেনদেনের অংশ ছিল কি না।

দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, ঝু শিংগুও, কাজী নাহিদ ইসলাম, সারোয়ার কবির জনি, রাজশাহী ওয়াসা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের বক্তব্য প্রকাশের জন্য উন্মুক্ত রাখা হলো। সংশ্লিষ্ট পক্ষ কোনো নথি, বক্তব্য বা ব্যাখ্যা দিলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

প্রতিবেদনটি অভিযোগ ও প্রকাশ্য সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত; অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের।


More News Of This Category
bdit.com.bd