আন্তর্জাতিক ডেস্ক | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
ঢাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ শেষে দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়র্কে পাঁচ দিনের সফরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য, টেকসই উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একাধিক বৈঠক ও উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে নিউইয়র্কের জন এফ. কেনেডি (JFK) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি দুবাই হয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীরা রয়েছেন।
সফরসূচি অনুযায়ী, ফ্লাইটটি ২৬ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় রাত ৮টার দিকে দুবাই পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখানে যাত্রাবিরতি শেষে রাত ২টার দিকে ঢাকার উদ্দেশে পুনরায় যাত্রা করে ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ
গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এটিই ছিল তাঁর প্রথম ভাষণ।
ভাষণে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং সংলাপ ও কূটনীতির গুরুত্বের ওপরও তিনি জোর দেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রত্যাশা উঠে আসে।
পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠনের ‘৩-আর’ কৌশল
জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন ও উন্নয়নের প্রসঙ্গে ‘৩-আর’—Recovery, Restoration and Reconstruction—কৌশলের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নকে আরও শক্তিশালী করা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করার বিষয়গুলো তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পায়।
কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডাগুলোর মধ্যে ছিল রোহিঙ্গা সংকট।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন আলোচনা ও অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য একটি টেকসই, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। সংকটটির স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থানও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু ঝুঁকি এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ন্যায্য অধিকারসহ জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য অভিযোজন, অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি এ সময় গুরুত্ব পায়।
মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক একটি উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো, দক্ষ ধাত্রীসেবা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সেবার সমন্বয়ের বিষয়গুলো সেখানে আলোচিত হয়।
জনস্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনার বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিভিন্ন আলোচনায় উঠে আসে।
বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক
UNGA-৮১-এর বিভিন্ন কর্মসূচির ফাঁকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন অংশীদারিত্ব, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরির বিষয়ও সফরের আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে তারেক রহমান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ তাঁর পরিবারের সঙ্গে এই আন্তর্জাতিক মঞ্চের পূর্ববর্তী সম্পর্কেরও নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।
তাঁর পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেন। তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন।
এর ফলে তারেক রহমান একই পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেলেন।
তবে এবারের ভাষণের বিশেষ দিক ছিল—প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারগুলো সরাসরি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন এবং বাংলায় বক্তব্য দেন।
২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে, ২৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার পথে
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে গত ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পাঁচ দিনের সফরে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, সাইড ইভেন্ট এবং দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনায় অংশ নেন।
শুক্রবার নিউইয়র্ক ত্যাগের সময় প্রধানমন্ত্রী ও ডা. জুবাইদা রহমানকে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বিদায় জানান। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সফর শেষে এখন বাস্তবায়নের পালা
জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও অগ্রাধিকার তুলে ধরে দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনস্বাস্থ্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদারের মতো বিষয়গুলো সফরের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
এখন নিউইয়র্ক সফরে আলোচিত বিষয়গুলো দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবে কতটা অগ্রসর হয়—সেদিকেই থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের নজর।
দুবাই হয়ে ঢাকায় ফেরার মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের UNGA-৮১ কেন্দ্রিক নিউইয়র্ক সফর। ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে তাঁর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।