TRIPS ও GMO: বীজ, কৃষকের অধিকার ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক
মেধাস্বত্বের আন্তর্জাতিক কাঠামো, কৃষকের বীজ অধিকার ও জেনেটিক প্রযুক্তি নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন—তবে বিতর্কিত দাবির সঙ্গে প্রমাণিত তথ্য আলাদা করার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
বিশেষ প্রতিবেদন | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
ঢাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬:
বীজের মালিকানা, কৃষকের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণ ও ব্যবহার, কৃষিজীববৈচিত্র্য, জেনেটিক প্রযুক্তি এবং খাদ্যনিরাপত্তা—এসব বিষয়কে ঘিরে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সেই বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কাঠামো হলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) TRIPS Agreement—Trade-Related Aspects of Intellectual Property Rights।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে TRIPS ও GMO নিয়ে যেসব দাবি ছড়িয়ে পড়ছে, তার সবগুলোকে একইভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। TRIPS মূলত মেধাস্বত্ব সুরক্ষার আন্তর্জাতিক কাঠামো; এটি কোনো দেশকে বাধ্যতামূলকভাবে GMO বীজ ব্যবহার করতে নির্দেশ দেয়—এমন সরাসরি বিধান চুক্তিটিতে নেই। বরং উদ্ভিদজাত বৈচিত্র্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে সদস্যদেশগুলোকে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিজস্ব ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
TRIPS-এর সঙ্গে কৃষি ও বীজের সম্পর্ক কোথায়?
TRIPS Agreement-এর Article 27.3(b)-তে উদ্ভিদ ও প্রাণী, উদ্ভিদ বা প্রাণীর উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জৈবিক প্রক্রিয়ার পেটেন্টযোগ্যতা এবং উদ্ভিদজাত বৈচিত্র্য সুরক্ষার বিষয়টি রয়েছে। WTO-র নথিতে এ বিষয়টি নিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে কৃষকের বীজ পুনঃব্যবহার, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জ্ঞান রক্ষাসহ বিভিন্ন উদ্বেগের কথাও নথিভুক্ত হয়েছে।
ফলে বীজের ওপর মেধাস্বত্ব এবং কৃষকের প্রচলিত বীজ ব্যবহারের অধিকার—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে, তা অনেক দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন।
FAO-র International Treaty on Plant Genetic Resources for Food and Agriculture কৃষকদের দীর্ঘদিনের অবদান এবং কৃষিজীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তাদের ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় আইনের অধীন ও উপযুক্ত ক্ষেত্রে কৃষকদের খামারে উৎপাদিত বীজ সংরক্ষণ, ব্যবহার, বিনিময় ও বিক্রির অধিকারের কথাও সেখানে উল্লেখ রয়েছে।
GMO কি মানেই স্বাস্থ্যঝুঁকি?
জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম বা GMO হলো এমন জীব, যার জেনেটিক উপাদান আধুনিক জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়েছে। GMO নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নীতিগত বিতর্ক রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, প্রতিটি GM খাদ্যকে তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সম্ভাব্য অ্যালার্জি, জিন স্থানান্তর, অনাকাঙ্ক্ষিত জৈবিক প্রভাব এবং পরিবেশে জিনের বিস্তার—এসব বিষয় নিরাপত্তা মূল্যায়নের অংশ। তবে WHO-র তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অনুমোদিত GM খাদ্যগুলো নিরাপত্তা মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে এসেছে এবং অনুমোদিত GM খাদ্য খাওয়ার কারণে সাধারণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য নেই।
অর্থাৎ, GMO প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা প্রয়োজন হলেও “সব GMO খাদ্য ক্যান্সার সৃষ্টি করে”—এমন সাধারণ সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের প্রশ্ন
GMO ফসলের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ। WHO সম্ভাব্য জিন প্রবাহ, বন্য প্রজাতিতে জিন ছড়িয়ে পড়া, অপ্রত্যাশিত পরিবেশগত প্রভাব, জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন এবং কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহারের মতো বিষয়কে ঝুঁকি মূল্যায়নের আওতায় রাখার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে এসব ঝুঁকি ফসলের ধরন ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।
FAO-ও বীজ ও ফসলের বৈচিত্র্যকে খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কৃষকদের হাতে স্থানীয় ও বৈচিত্র্যময় বীজব্যবস্থা থাকা জলবায়ু পরিবর্তন, রোগবালাই ও পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কৃষকের বীজ অধিকার বনাম মেধাস্বত্ব
বাণিজ্যিকভাবে উন্নত জাতের বীজের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব বা উদ্ভিদজাত অধিকার কার্যকর হতে পারে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট জাতের বীজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃষকের অধিকার জাতীয় আইন, লাইসেন্সের শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট মেধাস্বত্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে।
এ কারণে সব বাণিজ্যিক বা GMO বীজের ক্ষেত্রে “কৃষক কোনোভাবেই বীজ সংরক্ষণ করতে পারবেন না”—এমন সার্বজনীন বক্তব্য সঠিক নয়। বিভিন্ন দেশের আইন ও সংশ্লিষ্ট বীজের মেধাস্বত্বের ধরন অনুযায়ী নিয়ম ভিন্ন হতে পারে। WTO-র নথিতেও উদ্ভিদজাত বৈচিত্র্যের সুরক্ষায় বিভিন্ন ধরনের ব্যতিক্রম ও কৃষক-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার অস্তিত্বের বিষয়টি দেখা যায়।
বহুজাতিক বীজ কোম্পানি নিয়ে বিতর্ক
Syngenta, Corteva, BASF, Limagrain এবং Bayer-এর মতো বড় কৃষি ও বীজ কোম্পানিগুলো বিশ্ব কৃষি ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ভূমিকা পালন করে। Monsanto বর্তমানে Bayer-এর অংশ।
বড় কোম্পানির বীজ, কৃষি-ইনপুট, পেটেন্ট এবং বাজারকেন্দ্রিকতার কারণে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, বীজের ওপর নির্ভরশীলতা, স্থানীয় জাতের সংরক্ষণ এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন দেশে নীতি ও নাগরিক সমাজের বিতর্ক রয়েছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে কৃষকদের অসুস্থ করা, ক্যান্সার সৃষ্টি করা কিংবা চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমে একই জনগোষ্ঠী থেকে পরিকল্পিতভাবে অর্থ আদায় করছে—এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে নির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
ভারত, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা
ভারতে Bt cotton, কৃষিঋণ ও কৃষক আত্মহত্যা নিয়ে বহু বছর ধরে বিতর্ক রয়েছে। তবে কৃষক আত্মহত্যার পুরো ঘটনাকে শুধুমাত্র কোনো একটি বীজ কোম্পানি বা GMO প্রযুক্তির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা জটিল; কৃষিঋণ, বাজারদর, ফসলের ক্ষতি, আবহাওয়া, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিসহ একাধিক কারণ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একইভাবে আর্জেন্টিনায় GMO সয়াবিন ও কৃষিতে কীটনাশক ব্যবহারের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা ও বিতর্ক রয়েছে। মেক্সিকোতে স্থানীয় ভুট্টার জেনেটিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং GM ভুট্টার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও দীর্ঘদিনের নীতিগত বিতর্ক রয়েছে।
এসব বিষয়কে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গবেষণা, সময়কাল, কৃষি ব্যবস্থার ধরন এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন বিবেচনা করা জরুরি।
শ্রীলঙ্কার সারনীতি: GMO নয়, আলাদা একটি নীতিগত সংকট
২০২১ সালে শ্রীলঙ্কায় রাসায়নিক সার ও কৃষি-ইনপুট ব্যবস্থায় আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তন দেশটির কৃষি উৎপাদন ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু সেই ঘটনাকে সরাসরি GMO নীতির ফল হিসেবে চিহ্নিত করা তথ্যগতভাবে যথাযথ নয়।
বরং ঘটনাটি কৃষি নীতিতে আকস্মিক পরিবর্তন, উৎপাদনব্যবস্থা, আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পৃথক উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষণ করা অধিক যুক্তিসঙ্গত।
ওষুধ ও ক্যান্সার নিয়ে গুরুতর দাবির বিষয়ে সতর্কতা
GMO ও কৃষি নিয়ে আলোচনার সঙ্গে ক্যান্সার চিকিৎসা ও ওষুধ কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থকে সরাসরি যুক্ত করে কোনো গোষ্ঠীর পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করতে শক্তিশালী প্রমাণ প্রয়োজন।
“ক্যান্সারের কার্যকর প্রতিষেধক গোপন রাখা হয়েছে, কারণ রোগীরা আজীবন ওষুধের ক্রেতা থাকবে”—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণ ছাড়া সংবাদে তা প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
বাংলাদেশের জন্য যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে বীজের ওপর কৃষকের অধিকার, দেশীয় জাত সংরক্ষণ, কৃষিজীববৈচিত্র্য, উন্নত জাতের গবেষণা, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় এবং কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা—এসব বিষয়ে নীতিগত আলোচনা জরুরি।
বিশেষ করে প্রয়োজন—
১. কৃষকের নিজস্ব ও স্থানীয় বীজ সংরক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করা;
২. দেশীয় ফসলের জেনেটিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা;
৩. নতুন GMO বা জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে বৈজ্ঞানিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন করা;
৪. কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও বীজের মূল্য নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা;
৫. মেধাস্বত্বের সঙ্গে কৃষকের অধিকার ও খাদ্যনিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষা করা;
৬. কৃষকদের কাছে বীজের চুক্তি, লাইসেন্স ও ব্যবহারের শর্ত সহজ ভাষায় তুলে ধরা;
৭. কৃষি গবেষণা, স্থানীয় জাত সংরক্ষণ ও কমিউনিটি সিড ব্যাংককে শক্তিশালী করা।
FAO বলছে, বীজ শুধু কৃষির একটি উপকরণ নয়; এটি খাদ্যব্যবস্থার জেনেটিক ভিত্তি। কৃষকের বীজ অধিকার ও কৃষিজীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ তাই খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
TRIPS, GMO, বীজের মেধাস্বত্ব ও কৃষকের অধিকার—সবকিছু একসঙ্গে একটি জটিল বৈশ্বিক নীতির অংশ। এখানে একদিকে গবেষণা ও প্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে, অন্যদিকে কৃষকের অধিকার, জীববৈচিত্র্য, বাজারের ঘনত্ব এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে বাস্তব উদ্বেগও রয়েছে।
তাই ভয় বা ষড়যন্ত্রের বয়ানের পরিবর্তে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক জনআলোচনা, স্বচ্ছ নীতি, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং কৃষকের অধিকার সুরক্ষা।
বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন—কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তরও হতে হবে যাচাইযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
জনতার কণ্ঠস্বর
আমরা জনতার কণ্ঠস্বরকে প্রকাশ করি।