শার্শার ত্রাস ‘গ্যাংস্টার’ আকুল আটক, কিন্তু নেপথ্যের গডফাদার মেয়র লিটন কি তবে ‘অস্পৃশ্য’?
নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর | ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
যশোরের সীমান্তবর্তী শার্শা ও বেনাপোল অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম আকুল হোসাইন ওরফে ‘গ্যাংস্টার’ আকুল। বুধবার রাতে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে যশোর শহরের রায়পাড়া এলাকা থেকে এই বিতর্কিত ছাত্রলীগ নেতা আটক হলেও, জনমনে স্বস্তির চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে একটি বিশাল প্রশ্ন—যার হাত ধরে আকুলের এই অপরাধ জগতে প্রবেশ, সেই নেপথ্য কারিগর সাবেক পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন কেন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে?
ক্যাডার আকুলের উত্থান ও ডিবির জালে পতন
শার্শা উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আকুল হোসেনকে বুধবার রাত ১১টার পর তার শ্বশুরবাড়ি থেকে আটক করে ডিবি পুলিশ। ডিবি পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, তাকে বর্তমানে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে আকুল ছিল বেনাপোল ও শার্শা এলাকার অঘোষিত সম্রাট। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং অস্ত্র চোরাচালানের বিস্তর অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য।
মূল হোতা যখন ধরাছোঁয়ার বাইরে: অর্থের জোরে কি সব নিয়ন্ত্রণ করছেন লিটন?
আকুল আটক হলেও এই সন্ত্রাসী সাম্রাজ্যের প্রধান হর্তাকর্তা হিসেবে পরিচিত বেনাপোল পৌরসভার সাবেক মেয়র আশরাফুল আলম লিটন এখনো আইন-শৃঙ্খলার রক্ষাকারী বাহিনীর জালের বাইরে। এলাকায় জোরালো গুঞ্জন রয়েছে, লিটন তার অগাধ অবৈধ সম্পদ ও টাকার জোরে প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলের সবকিছুই ‘ম্যানেজ’ করে রেখেছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, লিটনকে গ্রেপ্তার করা কেবল কঠিনই নয়, বরং ‘অসম্ভব’। অভিযোগ রয়েছে, এই অদৃশ্য শক্তির প্রভাবেই তিনি একের পর এক অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন।
পলাতক থেকেও অপরাধের রিমোট কন্ট্রোল
আশরাফুল আলম লিটনের কোনো হদিস বা অবস্থান বর্তমানে প্রকাশ্য না থাকলেও, তার গড়ে তোলা সন্ত্রাসী বাহিনী এখনো এলাকায় সক্রিয়। আকুলের মতো দুর্ধর্ষ ক্যাডারদের মাধ্যমে তিনি আত্মগোপনে থেকেই বেনাপোলের সীমান্ত বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আকুল গ্রেপ্তার হলেও লিটন বাইরে থাকলে এই সন্ত্রাসী সিন্ডিকেট নির্মূল করা অসম্ভব, কারণ তিনিই এই পুরো চক্রের মাস্টারমাইন্ড এবং অর্থের যোগানদাতা।
পুরনো সেই ভয়ঙ্কর রেকর্ড: অস্ত্রের বিশাল ভান্ডার
আকুল ও তার সহযোগীদের অপরাধী প্রোফাইল অত্যন্ত ভয়ানক। ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশের অভিযানে মিরপুর ও গাবতলী থেকে ৮টি বিদেশি পিস্তল, ১৬টি ম্যাগজিন এবং ৮ রাউন্ড গুলিসহ আকুল ও তার চার সহযোগী গ্রেপ্তার হয়েছিল। সে সময় জানা গিয়েছিল, এই বিশাল অস্ত্রের চালানটি শার্শা-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ঢাকায় পাচার করা হচ্ছিল। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকার কারণে সে যাত্রায় পার পেয়ে এসে পুনরায় তিনি অপরাধের সাম্রাজ্য বড় করতে থাকেন।
চাঁদাবাজির আতুরঘর ও জনরোষ
যশোরের শার্শা ও বেনাপোল এলাকায় ছাত্রলীগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আকুল যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, তাতে অতিষ্ঠ ছিল সাধারণ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। বেনাপোল বন্দর কেন্দ্রিক চাঁদাবাজি ছিল তার আয়ের মূল উৎস। মেয়র লিটনের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় কোনো আইনই তাকে দমাতে পারেনি।
প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের দাবি
এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি, শুধু ক্যাডার বা হাতের পুতুল আকুলকে ধরলে এই অঞ্চলের অপরাধ বন্ধ হবে না। যদি সত্যিই শান্তিশৃঙ্খলা ফেরাতে হয়, তবে সন্ত্রাসী জগতের মূল পৃষ্ঠপোষক এবং অর্থের দাপটে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা আশরাফুল আলম লিটনকে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় এই গ্রেপ্তার কেবল একটি ‘আইওয়াশ’ হিসেবেই থেকে যাবে।