রক্তমাখা হাতে রাবিতে রাজকীয় দাপট: ৫ আগস্টের ‘হামলাকারী’ শামিম চৌধুরী এখনো বহাল তবিয়তে!
বিলাসবহুল ‘প্রাসাদ’ ও ক্ষমতার দাপটে প্রশাসন কি অন্ধ? টিকাপাড়ার সেই অন্ধকার সাম্রাজ্য নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
পাভেল ইসলাম মিমুল, নিজস্ব প্রতিবেদক | রাজশাহী | ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫
৫ আগস্টের সেই রক্তঝরা দুপুর। যখন রাজশাহীর রাজপথ ছাত্র-জনতার মিছিলে প্রকম্পিত, ঠিক তখন একদল হায়নার আক্রমণে রক্তাক্ত হয়েছিল সবুজ চত্বর। সেই বর্বরোচিত হামলার সামনের সারিতে থাকা অন্যতম অভিযুক্ত মো: শামিম হোসাইন চৌধুরী এখনো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সহকারী রেজিস্ট্রার পদে বহাল। ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্রে স্পষ্ট উপস্থিতির পরও তার এই সদম্ভ বিচরণ নিয়ে খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। প্রশ্ন উঠেছে—আইন কি তবে সাধারণ মানুষের জন্য এক, আর রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা ‘প্রাসাদ’ মালিকদের জন্য অন্য?
ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট উপস্থিতি, তবুও ‘নির্দোষ’ দাবি!
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, ৫ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনের ওপর হামলার সময় শামিম চৌধুরী সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, তিনি কেবল উপস্থিতই ছিলেন না, বরং হামলাকারীদের উস্কানি ও সরাসরি সহিংসতায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। একজন উচ্চপদস্থ বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা হয়ে কীভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হলেন, সেই প্রশ্ন এখন রাজশাহীবাসীর মুখে মুখে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত বড় অভিযোগের পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে সাময়িক বরখাস্ত তো দূর থাক, একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ পর্যন্ত দেয়নি। তিনি নিয়মিত অফিস করছেন এবং দাপ্তরিক ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করছেন।
টিকাপাড়ার ‘প্রাসাদ’: দুর্নীতির চাক্ষুষ দলিল?
শামিম চৌধুরীর এই বেপরোয়া আচরণের শক্তির উৎস খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। রাজশাহী নগরীর টিকাপাড়া এলাকায় তিনি নির্মাণ করেছেন এক চোখধাঁধানো বিলাসবহুল ভবন, যা স্থানীয়দের কাছে ‘প্রাসাদ’ নামে পরিচিত।
বিলাসবহুল স্থাপত্য: আধুনিক নকশা ও ব্যয়বহুল আসবাবপত্রে সাজানো এই বাড়ির আনুমানিক মূল্য একজন সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তার সারা জীবনের বৈধ আয়ের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি।
আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন: স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন দিয়ে এমন রাজকীয় জীবনযাপন অসম্ভব। এটি কি শুধুই দুর্নীতির ফসল নাকি ভাই মাহতাব হোসেন চৌধুরীর (নগর আওয়ামী লীগের সাবেক শ্রম বিষয়ক সম্পাদক ও কাউন্সিলর) রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার—তা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।
শাস্তিযোগ্য অপরাধ ও প্রশাসনিক পক্ষাঘাত
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শামিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় কঠোর আইনি ব্যবস্থার সুযোগ রয়েছে: ১. ফৌজদারি অপরাধ (সহিংসতা): পেনাল কোড অনুযায়ী দাঙ্গা, সহিংসতা এবং নরহত্যার চেষ্টার অভিযোগ। ২. চাকরিবিধি লঙ্ঘন: সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হয়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় লিপ্ত হওয়া সরাসরি চাকরিচ্যুতির যোগ্য অপরাধ। ৩. জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ: দুদকের তফশিলভুক্ত অপরাধ অনুযায়ী তার বিশাল সম্পদের উৎস অনুসন্ধান জরুরি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন এবং ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দের রহস্যজনক নীরবতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ভাইয়ের রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া: রক্ষাকবচ যখন ক্ষমতা
অনুসন্ধানে জানা যায়, শামিম চৌধুরীর এই খুঁটির জোর মূলত তার বড় ভাই মাহতাব হোসেন চৌধুরী। যিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর ছিলেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরও সেই সিন্ডিকেটের অদৃশ্য সুতা এখনো শামিম চৌধুরীকে রক্ষা করে চলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থী ক্ষোভের সাথে বলেন, “আমরা রক্ত দিলাম স্বাধীনতা আনলাম, আর আমাদের ওপর হামলাকারীরাই যদি এখনো চেয়ারে বসে হুকুম দেয়, তবে এই পরিবর্তনের মানে কী?”
প্রশাসনের দায়সারা বক্তব্য
বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং মহানগর পুলিশের মুখপাত্র গাজিউর রহমান তদন্তের গৎবাঁধা বুলি আওড়ালেও এখন পর্যন্ত শামিম চৌধুরীকে কোনো জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়নি। এজাহারভুক্ত আসামিদের তালিকায় তার নাম থাকা সত্ত্বেও কেন তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না, তার কোনো সদুত্তর মেলেনি।
উপসংহার: বিচারের অপেক্ষায় রাজশাহী
রাজশাহীর ছাত্র-জনতা এখন আর আশ্বাস শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায় অভিযুক্তের বিচার। একজন হামলাকারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পবিত্র স্থানে বহাল রাখা মানেই হলো জুলাই বিপ্লবের শহীদের রক্তের সাথে বেঈমানি করা। প্রশাসন যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পুনরায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
শামিম চৌধুরীদের মতো ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে প্রমাণ করতে হবে যে—৫ আগস্টের বাংলাদেশে কোনো অপরাধীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।