প্রকাশিত: ৫ জুলাই ২০২৫
✍️ অনলাইন ডেস্ক : যশোরের আন্ডারওয়ার্ল্ড গডফাদার: শাহীন চাকলাদারের উত্থান, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও পতনের পূর্ণচিত্র
যশোরের রাজনীতিতে তিনি একসময় ছিলেন “জননেতা” নামে পরিচিত। আজ সেই নামের পাশে ঘুরপাক খায় ‘দুদকের সাজাপ্রাপ্ত আসামি’, ‘গোপন সম্পদের মালিক’, ‘চাঁদাবাজির কাণ্ডারি’, এমনকি ‘গডফাদার’-এর মতো শব্দ। তিনি আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদার।
নিচে তথ্যনির্ভর, বিশ্লেষণধর্মী ও পূর্ণাঙ্গ এক প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের এক জ্বলন্ত দলিল।
পরিচয় ও রাজনৈতিক উত্থান
দলীয় পরিচয়: যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক (২০০৪–বর্তমান পর্যন্ত)।
জনপ্রতিনিধি পরিচয়: ২০০৯-২০২০ পর্যন্ত যশোর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান; ২০২০ সালে কেশবপুর আসন থেকে উপনির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন।
ব্যবসা ও প্রভাব: পরিবহন, ঠিকাদারি, জমি দখল, কোটার রাজনীতি—সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হন। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে গড়ে তোলেন একক আধিপত্য।
স্থানীয় ভাষ্যে পরিচিতি: “এক সময় শহরের রাস্তায় রাস্তায় তার লোক ছাড়া নড়াচড়া করাও কঠিন ছিল।” – এমন দাবি করেছেন একাধিক স্থানীয় নাগরিক।
অপরাধ ও সন্ত্রাসের অভিযোগ
সন্ত্রাসী গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ: যশোর শহরের ‘হাসান গ্যাং’, ‘রকি গ্রুপ’ ও ‘আকবর বাহিনী’র সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সমর্থন ছিল।
চাঁদাবাজি ও জমি দখল: শতাধিক জমি দখল ও বিশাল অঙ্কের চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠে আসে ২০১৮–২০২৩ সময়কালে।
পুলিশকে নির্দেশ: একটি অডিও ফুটেজে কেশবপুর থানার ওসিকে নির্দেশ দিতে শোনা যায়—”বোমা মেরে ওদের মামলায় ঢুকিয়ে দে!” বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
দুদকের মামলা ও সম্পদ বাজেয়াপ্তি
২০০৮ সালে মামলা: দুদকের উপ-পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদ শাহীন চাকলাদারের বিরুদ্ধে ৩৮ লাখ টাকার গোপন সম্পদ গোপনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
চার্জশিট ও শুনানি: ২০০৯ সালে চার্জশিট জমা হয়। তদন্তে দেখা যায়— প্রকৃত আয় বিবরণীর বাইরেও ৩৮ লাখ ৩ হাজার টাকা গোপন সম্পদ ছিল।
২০২৫ সালের রায়: যশোর স্পেশাল জজ আদালত ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
অপরাধী অনুপস্থিত: রায়ে শাহীন চাকলাদার আদালতে অনুপস্থিত থাকায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।
অসাধু লেনদেন ও ব্যাংক পরিসংখ্যান
অসঙ্গত সম্পদের পাহাড়: দুদকের হিসেব অনুযায়ী, তিনি ও তার স্ত্রীর নামে ৪২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ এবং ৩৪১ কোটি ৬১ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্ত্রী ফারহানা জাহান মালা: পৃথক অভিযোগে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও ১১ কোটি টাকার সম্পদ গোপনের মামলা হয়েছে।
স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব জব্দ
২৬টি স্থাবর সম্পত্তি: হোটেল, বাড়ি, দোকান, গাড়ি—সব মিলিয়ে ২৬টি সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন।
ব্যাংক হিসাব: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকে থাকা সব অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়। স্টক এক্সচেঞ্জে বিনিয়োগ করা শেয়ারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা: ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর শাহীন চাকলাদার, তার স্ত্রী ও সন্তানের বিদেশ যাত্রা নিষিদ্ধ হয়।
সারাংশ
> শাহীন চাকলাদার একটি প্রতীকের নাম—দখলদারির, দুর্নীতির এবং দম্ভের।
ক্ষমতার অপব্যবহার, সন্ত্রাসীদের ব্যবহার, ভুয়া টেন্ডার ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগে জর্জরিত এই নেতা কখনো ছিলেন আওয়ামী লীগের মুখপাত্র, আবার কখনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাজনীতির নায়ক।
তার বিরুদ্ধে জারি হওয়া কারাদণ্ড, সম্পদ বাজেয়াপ্তি ও দুদকের কঠোর পদক্ষেপ দেশের জনগণকে আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছে—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়।
—
উপসংহার
একজন ‘জননেতা’ কীভাবে ‘গডফাদার’ হয়ে ওঠেন—শাহীন চাকলাদারের কাহিনি তারই বাস্তব প্রমাণ। প্রশাসনের মদদ, দলের ছত্রছায়া ও ক্ষমতার গদিতে থেকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন অপরাধের এক সাম্রাজ্য। আজ সেই সাম্রাজ্যের ভিত্তি ভেঙে পড়েছে।
প্রশ্ন রয়ে গেল:
“এই অপরাধী রাজনৈতিক সংস্কৃতি কবে শেষ হবে? পরবর্তী গডফাদার কে?”
—
এই প্রতিবেদনটি নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। আপনার এলাকায় এ ধরনের কারো অপকর্ম সম্পর্কে তথ্য থাকলে জানান: report@dailyprothombd.com
—
শেয়ার করুন, প্রচার করুন—সত্য জানুন, প্রতিবাদ করুন।