বিশেষ প্রতিবেদন: মিরকাদিমের ‘ত্রাস’ সাবেক মেয়র শাহিনের উত্থান-পতন ও দুর্নীতির শ্বেতপত্র
মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি: মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভা যেন ছিল এক অঘোষিত রাজত্ব। যেখানে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র শহিদুল ইসলাম শাহিন। ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে ছাত্র আন্দোলনে সশস্ত্র হামলার মাধ্যমে রক্তপাতের অভিযোগ এখন তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে তিনি পলাতক থাকলেও তার আমলের দুর্নীতির একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে।
১. দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য ও অবৈধ সম্পদের পাহাড়
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেয়র থাকাকালীন শাহিন মিরকাদিম পৌরসভাকে দুর্নীতির কারখানায় পরিণত করেছিলেন।
জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ: গোয়ালঘুন্নী এলাকায় সরকারি জমি ও খালের একাংশ ভরাট করে তিনি নির্মাণ করেছেন একটি বিশাল পাঁচতলা আলিশান ভবন। এছাড়াও রাজধানী ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে তার কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
রাজস্ব ও ট্যাক্স আত্মসাৎ: পৌরসভার কর আদায়ের একটি বড় অংশ সরাসরি তার পকেটে যেত বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লোপাট এবং ভুয়া মাস্টাররোলে বিল উত্তোলনের মাধ্যমে তিনি সরকারি কোষাগার শূন্য করেছেন।
সরকারি চাল ও ত্রাণ চুরি: দুস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি চাল ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে নয়ছয় করে তিনি নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের তুষ্ট রাখতেন এবং বড় অংশ কালোবাজারে বিক্রি করতেন।
২. ৪ঠা আগস্টের গণহত্যা ও কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব
বিগত ৪ঠা আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে মুন্সিগঞ্জ শহরের সুপারমার্কেট এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর নারকীয় হামলার মূল কারিগর ছিলেন এই শাহিন।
সশস্ত্র আক্রমণ: প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শাহিনের নির্দেশে কয়েক হাজার অস্ত্রধারী ক্যাডার ও তার পালিত ‘কিশোর গ্যাং’ আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল এবং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
তিন প্রাণ অকালে ঝরে পড়া: এই বর্বরোচিত হামলায় উত্তর ইসলামপুরের রিয়াজুল ফরাজী, সজল মোল্লা ও নুর মোহাম্মদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত একাধিক মামলায় শাহিনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
৩. টর্চার সেল ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক
মিরকাদিম পৌর এলাকায় শাহিনের ছিল নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। বিএনপি ও বিরোধী মতের নেতাদের দমনে তিনি গড়ে তুলেছিলেন বিভীষিকাময় এক পরিবেশ।
জুলুম ও গুম: ভুক্তভোগী বিএনপি নেতা শামসু রহমান জানান, শাহিনের বাড়িতে নিয়মিত টর্চার সেল চলত। এলাকায় চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে দিয়েছিলেন।
পুরনো হত্যাকাণ্ড: মিরাপাড়ার ফিরোজ এবং নৈদীঘির পাথর ঝলক ও জিল্লু হত্যাকাণ্ডে শাহিনের সরাসরি সম্পৃক্ততা ও নির্দেশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তৎকালীন প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল।
৪. শাস্তির বিধান ও আইনের কঠোরতা
বর্তমানে পলাতক শাহিনের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি এবং আইনি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী তার অপরাধের সম্ভাব্য শাস্তি:
হত্যাকাণ্ড (ধারা ৩০২): দোষী সাব্যস্ত হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
দুর্নীতি (দুদক আইন): অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণসহ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড।
বিস্ফোরক ও অস্ত্র আইন: ককটেল বিস্ফোরণ ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
প্রশাসনের মন্তব্য
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা থাকুক বা না থাকুক, তাদের দেখা মাত্রই আইনের আওতায় আনতে হবে।” মিরকাদিমবাসী এখন শাহিন ও তার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছে যাতে প্রাচ্যের ড্যান্ডি খ্যাত এই এলাকায় পুনরায় শান্তি ফিরে আসে।