৭ আগস্ট ২০২৫ | সময়: ১০:৩২ AM জনতার কণ্ঠস্বর ডেস্ক দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ | স্লোগান: জনতার কণ্ঠস্বর www.bangladeshprothomsangbad.com
টেকনাফে একরামুল হকের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড: একটি ফোন কলেই উন্মোচিত রাষ্ট্রীয় ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নাটকের মুখোশ
কক্সবাজার, ২৬ মে ২০১৮ — বাংলাদেশের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত, নৃশংস ও পৈশাচিক একটি উদাহরণ টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হকের মৃত্যু। আজ সাত বছর পরও সেই ভয়ঙ্কর রাতের স্মৃতি কাঁদায় পরিবার, প্রশ্নবিদ্ধ করে রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনের ধরণ, আর চ্যালেঞ্জ জানায় ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নামক রাষ্ট্রীয় কল্পগাথাকে।
একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, যিনি ইয়াবা বিরোধী অবস্থান ও মাদক নির্মূলে ভূমিকা রাখার কারণে বিভিন্ন মহলের রোষানলে পড়েছিলেন—তার মৃত্যু ছিল রাষ্ট্রীয় নির্দেশনায় পরিচালিত এক ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড। এবং এই হত্যার প্রতিটি শব্দ রেকর্ড হয়ে গেছে তার নিজের মোবাইল ফোনে।
মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে মেয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথন
২০১৮ সালের ২৬ মে, সন্ধ্যায় একরামুল হক টেকনাফের ইউএনও অফিসের উদ্দেশ্যে বের হন। সেই সময় তার মেয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথোপকথনের একটি রেকর্ড পরবর্তীতে জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়।
“আমি এই যে, ইউএনও অফিসে যাচ্ছি তো, চলে আসবো আম্মু।” “আব্বু তুমি কান্না করছো?” “আমি নীলা যাচ্ছি, নীলা। জরুরি কাজে যাচ্ছি…”
এই কথাগুলোর মধ্যেই ধরা পড়ে একজন পিতার ভয়, একজন নিরপরাধ মানুষের আতঙ্ক। তারপর—অভিযোগের ভাষা থেমে যায় বুলেটের শব্দে। ফোনের ওপাশে স্ত্রী ও সন্তানের কান্না, এপাশে গুলির শব্দ, চিৎকার, ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠা। এবং তারপর—ভয়াল নীরবতা।
অডিও রেকর্ডে ধরা পড়ে বন্দুকযুদ্ধের ভুয়া দৃশ্যপট
রেকর্ডিংয়ে শোনা যায় কয়েকজন ব্যক্তির কণ্ঠ, জিজ্ঞাসাবাদ, অপমানজনক ভাষায় ধমক, এবং শেষতক গুলি চালানোর শব্দ। পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সম্পন্ন হয়, যেন এটি ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যা। গুলির আগে একরামের ওপর মানসিক নির্যাতন, ‘তুমি জড়িত?’ প্রশ্নের পর ‘জ্বি’ এবং ‘না’ বলা, সবকিছুই প্রমাণ করে যে এটি কোনো সংঘর্ষ ছিল না—ছিল একতরফা ‘ক্রসফায়ার’ অপারেশন।
সরকারি ভাষ্যে “বন্দুকযুদ্ধ”, বাস্তবে ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড
পুলিশের ভাষ্যমতে, একরাম ইয়াবা পাচারকারী, তার বিরুদ্ধে “গোপন তথ্য” ছিল, তাই তাকে থামাতে গিয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়। অথচ তার বিরুদ্ধে কোনো ওয়ারেন্ট ছিল না, কোনো মামলা চলছিল না। পরিবারের সদস্যদের মতে, একরাম ইয়াবা বিরোধী কমিটিতে ছিলেন, এবং সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা তাকে টার্গেট করেছিল প্রভাবশালী চক্র। পরে জানা যায়, গোয়েন্দা তালিকায় একরামের নাম ছিল না, বরং একাধিক মাদক ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তারাই থেকে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশব্যাপী তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ‘একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় হত্যা’ আখ্যা দেয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একে বিচার বহির্ভূত হত্যার দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরে বলেছিল—
“একরামুল হকের মৃত্যুর দায় সরকার এড়াতে পারে না। এটি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জোরদার করেছে।”
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের দায়
আজ সাত বছর পরেও একরামের পরিবার ন্যায়বিচারের মুখ দেখেনি। তদন্ত কোনোদিন আলোর মুখ দেখেনি। দায়ীদের কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। বরং সময়ের স্রোতে ঘটনা চাপা পড়েছে, সাক্ষ্য গায়েব, এবং পরিবার নিঃস্ব।
একরামের স্ত্রীর সেই করুণ আহাজারি—“নাহ আম্মু, তোমার আব্বু ফিরে আসবে”—বাংলাদেশের বিচারহীনতার এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সাত বছর পর দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন
আমরা কি ভুলে যাবো একজন পিতার কান্না, একজন মেয়ের ভয়, একজন স্ত্রীর চিৎকার? আমরা কি মানতে শিখবো যে একটি ফোন রেকর্ডই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়, যদি রাষ্ট্র চায় না?
উপসংহার: ন্যায়বিচারের জন্য রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন জনতার সোচ্চার হওয়া
বন্দুকযুদ্ধের নামে যে হত্যাকাণ্ডগুলো আজও চলছে, একরামের ঘটনা সেই পথের সূচনা হিসেবে গণ্য হবে। এটি আর কেবল একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, এটি একটি জাতির জন্য সতর্কবার্তা—রাষ্ট্র যদি উত্তরদায়ী না হয়, তবে জনগণকেই হতে হবে সাহসী।
আসুন, আমরা একরামের নাম ভুলে না যাই। কারণ তার কণ্ঠ আজো বলে ওঠে— “আমি তো যাচ্ছি…জরুরি কাজে যাচ্ছি…” …আর ফিরে আসে শুধু নিস্তব্ধতা।
একজন জনপ্রতিনিধির রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড: কেন হত্যা করা হলো একরামুল হককে?
২৬ মে ২০১৮ সালের রাতের সেই ভয়াল ফোন রেকর্ডিং থেকে প্রশ্নটা উঠে আসে স্বাভাবিকভাবেই—একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, যিনি মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন, তাকে কেন গুলি করে হত্যা করা হলো? আর যদি তিনি সত্যিই দোষী হতেন, তবে কেন তাকে আদালতে না নিয়ে বিচার করা হলো না?
নিচে তুলে ধরা হলো একরামুল হক হত্যার পেছনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অপরাধমূলক প্রেক্ষাপট:
১. মাদকবিরোধী অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা এবং স্থানীয় সিন্ডিকেটের বিরোধিতা
একরামুল হক টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর হিসেবে এলাকায় ইয়াবা ব্যবসার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তার এই অবস্থান টেকনাফে দীর্ঘদিন ধরে চলমান মাদক সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের স্বার্থে আঘাত হানে।
তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এলাকার অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে কখনোই অভিযান পরিচালনা হয়নি। বরং, যারা এই সিন্ডিকেট ভাঙতে চেয়েছেন, তাদেরকেই চিহ্নিত করে হত্যা করা হয়েছে।
২. ‘বন্দি’ না, ‘বলি’ বানানোর তালিকায় উঠে আসা — প্রশাসনিক অপারেশনকে ব্যবহারের অভিযোগ
একরামের নাম সরকার ঘোষিত “মাদকবিরোধী অভিযান”-এর লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ওঠে আসে, যদিও তার বিরুদ্ধে কোনো ওয়ারেন্ট, মামলা বা চার্জশিট ছিল না। এই অবস্থায় তাকে ‘ক্রসফায়ারে’ মারা হয়।
তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে জানা যায়, তাকে বন্দি করা হয়েছিল জীবিত অবস্থায়, এবং পরে পরিকল্পিতভাবে স্থানান্তর করে গুলি করা হয়, যেন সেটি ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বলে প্রচার করা যায়।
৩. আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির সঙ্গে দ্বন্দ্ব
একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের মূল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম—আবদুর রহমান বদি, যিনি তখন কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
বদি পরিবার ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে বহু মাদক মামলার অভিযোগ ছিল, কিন্তু তারাই প্রশাসনের সুরক্ষায় থেকে যেত।
একরাম প্রকাশ্যে ও স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে বদির মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।
এই কারণে তিনি হয়ে ওঠেন ‘হুমকি’ এবং তাকে সরিয়ে দেওয়া রাজনৈতিকভাবে ‘উপকারী’ বলে বিবেচিত হয়।
বদির নাম পরবর্তীতে বিভিন্ন তালিকায় এলেও কখনো তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং, একরামের মতো যিনি প্রকৃতপক্ষে মাদকবিরোধী ভূমিকা রেখেছিলেন, তাকেই হত্যা করা হয়।
৪. মাদকবিরোধী অভিযানের নামে শেখ হাসিনার ‘ক্র্যাকডাউন’—কৌশলগত ‘শো অফ’
২০১৮ সালের এই সময়কালটি ছিল জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির সময়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার “মাদক নির্মূল অভিযান” নামক এক নৈতিক প্রচারণা চালাতে চেয়েছিল যা মূলত জনমনে ভয়, নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এই অভিযানে:
বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সরকার ‘কঠোর’ ভাবমূর্তি নির্মাণ করেছিল
এই ভয় দেখানোর সুযোগে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের শত্রুদের তালিকা দিয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে
একরাম ছিলেন এমনই একজন ‘টার্গেট’, যিনি এই নির্মম অভিযানের শিকার হন — কারণ তার ‘ক্রসফায়ার’ সরকারের ‘কড়া পদক্ষেপ’ প্রচারণার জন্য একটি লোক দেখানো উৎসর্গ ছিল।
৫. স্থানীয় প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত অংশের সঙ্গে সংঘাত
স্থানীয়ভাবে টেকনাফে র্যাব, পুলিশ ও কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের মধ্যে এক ধরনের ‘মাদক রাজনীতি’ গড়ে উঠেছিল। একরাম সেই চক্রের বাইরের একজন সাহসী কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
বিশেষ করে:
তিনি কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তার দুর্নীতির বিরোধিতা করতেন
রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন মাদক চোরাচালান বিষয়ে সরব ছিলেন
সে কারণে তার নাম “হটিয়ে দাও” তালিকায় চলে আসে
৬. গোপন তালিকা ও হিটলিস্টের অপব্যবহার
সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একটি গোপন তালিকা তৈরি করেছিল “মাদক ব্যবসায়ীদের” নিয়ে। কিন্তু অভিযোগ আছে—এই তালিকায় স্বচ্ছতা ছিল না, এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা তালিকায় নাম ঢোকাতে ও বাদ দিতে ঘুষ, প্রভাব এবং স্বার্থ ব্যবহার করেছে।
একরামের নাম কিভাবে উঠলো, কে দিলো — আজও তার তদন্ত হয়নি।
আমরা রিপোর্ট তৈরি করিনা বাস্তবতা তুলে ধরি।