আশপাশ এলাকায় কিশোর গ্যাং ও অপরাধীচক্র নিয়ন্ত্রণের দাবিও স্থানীয়দের; মামলা ও অভিযোগের নথি যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
কেরানীগঞ্জ (ঢাকা): রাজধানী ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন আরশিনগর ও এর আশপাশের এলাকায় ফরহাদ নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং কিশোরদের ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও কয়েকজন ভুক্তভোগীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিরোধ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ফরহাদের নাম প্রকাশ্যে আলোচনায় রয়েছে।
তবে উত্থাপিত এসব অভিযোগের সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আইনি দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা অভিযোগ থাকলেই তিনি অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হন না। ফলে সংশ্লিষ্ট থানার মামলার নথি, আদালতের রেকর্ড, তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আরশিনগর-বসিলা এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, আরশিনগর টাওয়ার এলাকা, আম্বিয়া স্কুলের গলি, বসিলা ব্রিজের আশপাশ এবং চরসপুরসহ কয়েকটি এলাকায় ফরহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সশস্ত্র দল সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ওই দলের সঙ্গে এলাকার উঠতি বয়সী কিছু যুবক ও কিশোরের সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে পথচারীদের ভয়ভীতি দেখানো, রাতের বেলায় ছিনতাই, ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং মাদক কেনাবেচার সঙ্গে সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের এসব বক্তব্যের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্ত ও মামলার প্রাতিষ্ঠানিক নথি দিয়ে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জমি নিয়ে বিরোধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
ফরহাদের বিরুদ্ধে জমি-সংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিরোধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী।
তাদের অভিযোগ, যেসব জমির উত্তরাধিকার নিয়ে তীব্র বিরোধ, মালিকানা নিয়ে মামলা কিংবা দীর্ঘদিনের বিবাদ রয়েছে—এমন জমি তুলনামূলক কম দামে কেনার চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে সেসব জমির দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা নেওয়া হয় বলেও দাবি উঠেছে।
কয়েকজন ডেভেলপার ও জমি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি, কোনো কোনো বিরোধপূর্ণ জমিতে বহিরাগত লোকজন নিয়ে উপস্থিত হয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের নির্দিষ্ট ঘটনা, দলিল, মামলা নম্বর ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের অভিযোগ
স্থানীয়দের একটি বড় অংশের অভিযোগ, দেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে ফরহাদও নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও যোগাযোগের ধরন বদল করেছেন।
তাদের ভাষ্য, ৫ আগস্টের আগে তিনি স্থানীয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ছিল। পরবর্তীতে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে তিনি বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের নাম ব্যবহার করে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা পরিচয় থাকা নিজেই কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য এবং সাংগঠনিকভাবে ফরহাদের কোনো পদ বা অনুমোদিত সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সহযোগী হিসেবে কয়েকজনের নাম
স্থানীয়দের অভিযোগে ‘রানা’ নামে এক ব্যক্তির নামও বেশ জোরালোভাবে উঠে এসেছে। তার বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন অপকর্মের একাধিক মামলা রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। একইভাবে ‘টাকলা মিজান’ ওরফে মিজানের সঙ্গে ফরহাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন।
তবে কারও বিরুদ্ধে মামলা থাকা আর আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার নম্বর, আইনি ধারাসমূহ, বর্তমান বিচারিক অবস্থা এবং আদালতের আদেশ যাচাই না করে এসব অভিযোগকে চূড়ান্ত বিচারিক সত্য হিসেবে প্রকাশ করা সমীচীন নয়।
হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ছিনতাইয়ের মামলার দাবি
স্থানীয়দের কেউ কেউ জোর দাবি করেছেন, ফরহাদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মারাত্মক অস্ত্র প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত বিভিন্ন ধারায় একাধিক মামলা রয়েছে।
তবে এসব মামলার প্রকৃত সংখ্যা, নির্দিষ্ট মামলা নম্বর, সংশ্লিষ্ট আদালত, মামলাগুলোর বর্তমান বিচারিক অবস্থা এবং ফরহাদ জামিনে আছেন কি না—এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরকারি নথি ও আদালতের রেকর্ড থেকে সরাসরি যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা), ৩০৭ (হত্যাচেষ্টা), ৩৮৪ (চাঁদাবাজি), ৩৮৫ ও ৩৯২ (ছিনতাই) ধারার উল্লেখ করা হলেও কোনো নির্দিষ্ট মামলায় কোন ধারা প্রযোজ্য এবং সেই মামলায় আসামির বিরুদ্ধে আদালতের অভিযোগ গঠন হয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলাকায় মাদক, ছিনতাই, জমি নিয়ে সংঘাত ও উঠতি কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা সার্বিক জননিরাপত্তার জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের দাবি, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত পরিচিতি কিংবা অর্থনৈতিক সক্ষমতা যেন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধাজনক সুযোগ সৃষ্টি না করে। একই সঙ্গে শুধু মাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিও প্রশাসনিক হয়রানির শিকার না হন—এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযুক্ত ফরহাদের বক্তব্য
উত্থাপিত নানা অভিযোগ ও মামলা-সংক্রান্ত বিষয়ে বিস্তারিত জানতে অভিযুক্ত ফরহাদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবেদকের কাছে তিনি এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
অভিযুক্তের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে কোনো লিখিত বক্তব্য, মামলা-সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক নথি, আদালতের খালাস বা জামিনের আদেশ কিংবা অভিযোগ খণ্ডনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশের সুযোগ থাকবে।
প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
স্থানীয়দের উত্থাপিত অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা, ঢাকা জেলা পুলিশ, সংশ্লিষ্ট আদালত এবং প্রয়োজন হলে মোহাম্মদপুর থানার প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনার জোরালো দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে, ফরহাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার প্রকৃত সংখ্যা ও মামলা নম্বর, কোন মামলায় কী ধরণের নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, মামলাগুলোর বর্তমান তদন্ত ও বিচারিক অবস্থা, তিনি কোনো মামলায় জামিনে রয়েছেন কি না, জমি-সংক্রান্ত অভিযোগের পেছনে দলিল ও আদালতের নথিপত্র কী বলছে, এবং মাদক, ছিনতাই বা কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো গোয়েন্দা তথ্য আছে কি না—এসব বিষয় নথির ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আহ্বান
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, পুলিশের তদন্তে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অহেতুক হয়রানি থেকেও রক্ষা করা হবে।
অপরাধ দমনে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং যথাযথ তথ্য-প্রমাণ, সঠিক তদন্ত ও আইনের শাসনই যেন প্রধান ভিত্তি হয়—এমনটাই আকুল দাবি কেরানীগঞ্জের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর অবস্থান: কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে আদালতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে উপস্থাপন করা এই সংবাদপত্রের উদ্দেশ্য নয়; বরং প্রাপ্ত অভিযোগ, প্রশাসনিক নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে জনস্বার্থে তথ্য তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব। এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর যেসব অংশ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, সেগুলোকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ হিসেবেই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।