বিশেষ প্রতিনিধি:
উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ফের নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ‘হালিম গ্রুপ’ নামের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। ক্যাম্প-২, ক্যাম্প-৭ এবং বালুখালী ক্যাম্প-৮ ইস্ট—এই তিনটি অঞ্চলে একাধিক অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক বাণিজ্য এবং নারীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনার পর সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এপিবিএনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ক্যাম্পগুলোতে এই গ্রুপের লাগাতার তৎপরতা ও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার পরও এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে বাহিনী প্রধান আব্দুল হালিম ও তার সহযোগীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন ‘আরসা’ থেকে বের হয়ে আব্দুল হালিম নিজের নামে ‘হালিম গ্রুপ’ গঠন করেন। মূলত তিনি আরসার সাবেক ক্যাম্প কমান্ডার ছিলেন। তার প্রকৃত নাম কেফাউত উল্লাহ, পিতা বাদশা মিয়া, মিয়ানমারের মংডুর নাফ্ফুরা পাড়ার বাসিন্দা। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আরসা প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০২১ সালে রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে আব্দুল হালিমের বিরুদ্ধে। এরপরই আরসার অভ্যন্তরীণ ভাঙনের মধ্য দিয়ে হালিম নিজের অনুসারীদের নিয়ে গঠন করেন স্বাধীন ‘হালিম গ্রুপ’।
ক্যাম্পজুড়ে এই বাহিনীর দাপট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্থানীয় রোহিঙ্গারা অভিযোগ করেছেন—দিবালোকেও এখন নিরাপদ মনে হয় না। গ্রুপটির সদস্যরা প্রকাশ্যে বাড়িঘরে ঢুকে লুটপাট, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ এবং পুরুষদের অপহরণ করে মুক্তিপণের দাবিতে নির্যাতন করছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে হত্যা করে লাশ গুমের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
এমনকি হালিম গ্রুপের ভয়ে কেউ সিআইসি বা এপিবিএনের কাছে অভিযোগ করতেও সাহস পাচ্ছেন না। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, “মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর অত্যাচার দেখেছি, কিন্তু হালিম বাহিনীর নির্মমতা যেন সেটাকেও হার মানায়।”
হালিম গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করছে আইয়ুব নুর ওরফে টুপি নুর। তার নেতৃত্বেই চলছে ইয়াবা ও অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ। ক্যাম্পজুড়ে মাদক পরিবহন ও বিক্রয়ের জন্য রয়েছে পৃথক বাহিনী ও নেটওয়ার্ক।
বর্তমানে ক্যাম্পে হালিম বাহিনীর শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন—
১৪ এপিবিএন সূত্র জানায়, হালিম গ্রুপের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে রয়েছে মাস্টার মুহিব উল্লাহ, মুফতি আব্দুল্লাহ, হাফেজ শফিক, মুফতি হাসিমসহ অন্তত ১০ জন রোহিঙ্গা নেতার হত্যাকাণ্ড।
এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোঃ সিরাজ আমিন সাংবাদিকদের জানান, “কোনো গ্রুপ ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করলে কঠোর হস্তে দমন করা হবে।”
রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি রবিউল হোসাইন বলেন, “কয়েক মাস শান্ত থাকার পর আবার নতুন করে ক্যাম্পগুলোতে সন্ত্রাসীদের সক্রিয়তা বেড়ে গেছে। এতে শুধু রোহিঙ্গাই নয়, স্থানীয়রাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।”
একদিকে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা আর অন্যদিকে ক্যাম্পজুড়ে চলা সন্ত্রাস, মাদক, নারী নির্যাতন—এই দ্বৈত বাস্তবতায় উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প যেন ক্রমেই এক ঘূর্ণিঝড়পীড়িত মানবিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন—এই দমনহীন ‘হালিম গ্রুপ’কে রুখতে রাষ্ট্র কতটা সক্রিয় হবে?