তারিখ ও সময়: ৭ আগস্ট ২০২৫, রাত ৯:৪৫
প্রতিবেদক: জনতার কণ্ঠস্বর ডেস্ক:
অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও ধারণ করায় গলা কেটে হত্যা: গাজীপুরে সাংবাদিক হত্যায় গর্জে উঠেছে বিবেক
প্রকাশ্যে গলা কেটে হত্যা: এক সাংবাদিকের জীবনের বিনিময়ে রাষ্ট্রের নীরবতা
গাজীপুর, ৭ আগস্ট:
বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ ফের রক্তাক্ত।
চান্দনা চৌরাস্তার ব্যস্ত জনপদে, মসজিদ মার্কেটের সামনে, স্থানীয় সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে (৩৮) নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এ যেন প্রকাশ্যেই রাষ্ট্রব্যবস্থার চূড়ান্ত ব্যর্থতা।
সূত্র জানায়, নিহত তুহিন সম্প্রতি গাজীপুর মহানগরের একটি এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মহড়া এবং অপরাধচক্রের ভিডিও ধারণ করেছিলেন। তার এই তথ্য সংগ্রহ এবং সম্ভবত প্রকাশের আশঙ্কাতেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা পুলিশের।
পুলিশ বলছে, এটি সাধারণ ছিনতাই নয়; এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হামলাকারীরা পেছন থেকে গলায় আঘাত করে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তুহিন মারা যান।
তুহিন কে ছিলেন?
তিনি ছিলেন অপরাধ-অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য পরিচিত এক সাহসী মুখ।
ভূমিদস্যু, মাদক কারবারি, দখলবাজদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করে আগেও তিনি হুমকির মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু মাথা নত করেননি। তাঁর মৃত্যু তাই কেবল একটি প্রাণহানি নয়—এটি একটি সত্যান্বেষী কণ্ঠকে নিঃশব্দ করে দেওয়ার অপচেষ্টা।
বিশ্লেষণ | সত্য বলার ‘অপরাধে’ মৃত্যু: সাংবাদিকতা কি এখন তেলবাজদের খেলাঘর?
“সত্য বলার অপরাধে মরতে হয়, আর তেল মাখিয়ে বেঁচে থাকতে হয়”—এটাই কি আজকের সাংবাদিকতা?
একজন প্রতিবাদী সাংবাদিক খুন হলেন।
আর আমরা? দাঁড়িয়ে থাকি নীরব, মাথা নিচু করে, যেন কিছুই হয়নি। যেন এটা স্বাভাবিক। যেন সত্য বলার কারণে জীবন দেওয়াটা সাংবাদিকতার রুটিন অংশ।
আজকের বাস্তবতা হলো—
তেলবাজ বাঁচে, প্রতিবাদী মরে।
যেখানে সাংবাদিকতার সংজ্ঞা হয়ে গেছে:
নেতার প্রোগ্রামে ছবি তোলা,
প্রেসবিজ্ঞপ্তি কপি-পেস্ট করা,
“বড় ভাই”কে “স্যার” বলে রিপোর্ট লেখা,
আবার রাতে সেই নেতার চায়ের আড্ডায় উপস্থিতি।
তাদের কেউ প্রশ্ন তোলে না। অনুসন্ধান তো দূরের কথা—ভয় পায় নিজেদের ছায়াকেও।
অপরদিকে, যে সাংবাদিক মাদক সিন্ডিকেটের খবর করেন, গডফাদারদের মুখোশ উন্মোচন করেন, তাঁর ওপর চলে চরিত্রহননের চক্রান্ত, চাকরি হারানোর চাপ, এমনকি খুনের পরিকল্পনা।
সাংবাদিকতা কী হওয়া উচিত?
সাংবাদিকতা কোনো দলের মুখপাত্র হওয়া নয়।
এটি হলো জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা।
একজন সাংবাদিকের ন্যূনতম চারটি নৈতিক দায়িত্ব থাকা উচিত:
1. সত্য ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা,
2. ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা,
3. নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ানো,
4. ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়—সামাজিক দায়বদ্ধতায় কাজ করা।
কিন্তু বাস্তবে কী ঘটে?
সাংবাদিক নামধারী চাটুকাররা দলবাজির হাতিয়ার।
পোর্টাল খুলে ফেসবুকে নিউজ শেয়ার করে, নেতার গায়ে হাত বুলিয়ে মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করে।
“আপা বললে হবে না, ম্যাডাম বলুন” — এই মনোবৃত্তির ফলেই আজ একজন সত্যবাদী গাজীপুরের রাস্তায় গলাকাটা লাশ হয়ে পড়ে থাকেন।
এই মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো—রাষ্ট্র এখন নীরব দর্শক
এই মৃত্যু আমাদের জাগিয়ে তুলুক।
এই মৃত্যু আমাদেরকে আরেকবার মনে করিয়ে দিলো, স্বাধীনতা কেবল ১৯৭১-এ অর্জিত হয়নি—সত্য বলার স্বাধীনতা প্রতিদিন লড়াই করে টিকিয়ে রাখতে হয়।
আমরা বলছি—যদি প্রশাসন শক্তিশালী হয়, তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতার হোক।
না হলে প্রমাণ হবে—রাষ্ট্র আজ সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি।
সাংবাদিকতা যদি চাটুকারদের হাতে চলে যায়, তবে রাষ্ট্র অন্ধ হয়ে যায়।
আর সত্যবাদীদের রক্ত যদি কেবল ফেসবুক পোস্টেই শোক সীমাবদ্ধ রাখে, তবে আমাদের বিবেকই মরে গেছে।
তোমার জন্য আমরা চুপ থাকবো না।
তোমার রক্ত, তোমার কলম—এখন আমাদের হাতেই।