অটোরিকশা থেকে আকাশপথে: যুবদল নেতা সাদেকের ‘আলাদিনের চেরাগ’ নিয়ে তোলপাড়
নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ | ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬
৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রূপকথার গল্পের মতো পাল্টে গেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের আহ্বায়ক সাদেকুর রহমান সাদেকের জীবনযাত্রা। কয়েক মাস আগেও যিনি অটোরিকশায় বা পায়ে হেঁটে চলতেন, আজ তার সঙ্গী বিলাসবহুল গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টাকার পাহাড়ের প্রদর্শনী। সাদেকের এমন ‘আলাদিনের চেরাগ’ পাওয়ার রহস্য নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে বইছে সমালোচনার ঝড়।
ফেসবুক স্টোরিতে টাকার পাহাড় ও বারের আড্ডা
সম্প্রতি সাদেকের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল ও স্টোরিতে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবি রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। একটি ছবিতে দেখা যায়, টেবিলজুড়ে থরে থরে সাজানো বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশি টাকা। অন্য কিছু ছবিতে তাকে অভিজাত বারে মদের গ্লাস হাতে দেখা যায়। এসব ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল— “এ তো শুধু শুরু, পার্টি তো এখনো বাকি।”
যদিও ছবিগুলো প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেগুলোর স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তিনি ছবিগুলো পোস্ট করেছিলেন।
মেসেঞ্জার চ্যাট ফাঁস
সাদেকের একটি মেসেঞ্জার চ্যাটের স্ক্রিনশটও জনসমক্ষে এসেছে। সেখানে এক যুবকের সাথে কথোপকথনে সরাসরি টাকা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ‘পার্টি’ করার ইঙ্গিত দিতে দেখা যায় তাকে। অর্থের উৎস নিয়ে তার রহস্যময় ও গর্বিত ভঙ্গি স্থানীয়দের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পরস্পরবিরোধী বক্তব্য
বিলাসবহুল জীবনযাত্রা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়ে অসংলগ্ন ও পরস্পরবিরোধী উত্তর দিয়েছেন সাদেক। দামী গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “কারও কাছ থেকে গাড়ি নিয়ে চলতেই পারি, তার মানে এই নয় যে কিনেছি।” তবে অটোরিকশা থেকে সরাসরি অন্যের বিলাসবহুল গাড়িতে ওঠার নেপথ্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেননি তিনি। ফ্ল্যাট কেনার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করলেও তার যাপিত জীবনের পরিবর্তন স্থানীয়দের কাছে দৃশ্যমান।
নেতাকর্মীদের ক্ষোভ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের ফেলে যাওয়া ব্যবসা, ঝুট ও ড্রেজিং সেক্টরে প্রভাব বিস্তার করেই এই বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন সাদেক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবদল কর্মী বলেন:
“শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আজ তিনি বিলাসে ডুবে আছেন। টাকার ছবি আর বারের স্ট্যাটাস আমাদের দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। কিছু একটা তো অবশ্যই লুকানো হচ্ছে।”
দলীয় ভাবমূর্তি ও তদন্তের দাবি
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যখন দখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে, তখন নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় যুবদল নেতার এমন কর্মকাণ্ডে বিব্রত স্থানীয় বিএনপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নিলে দলীয় ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সাধারণ মানুষের দাবি, মাত্র কয়েক মাসে একজন মানুষের জীবনযাত্রায় এমন অবিশ্বাস্য পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব, তার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এই অর্থের উৎস কী—তা এখন নারায়ণগঞ্জের টক অব দ্য টাউন।