শার্শায় রাতারাতি ‘বিএনপি’ পরিচয়ে সরকারি ডিলারশিপ পাওয়ার অভিযোগ
শফিকুলের সারের ডিলারশিপ ঘিরে ১০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ; রাজনৈতিক পরিচয়, টিসিবি ডিলারশিপ ও প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষ অনুসন্ধান | পাতা: ৩
তারিখ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যশোর প্রতিনিধি:
যশোরের শার্শা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নে সরকারি ডিলারশিপ বণ্টনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব খাটানো এবং অর্থ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে পরিচিত মো. শফিকুল ইসলাম রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করে সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ডুবপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে মো. শফিকুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আরাফাত গ্রীন ফার্ম’ ইতোমধ্যে টিসিবির ডিলারশিপ পেয়েছে। এবার একই প্রতিষ্ঠানের নামে বিএডিসি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ইউনিয়নভিত্তিক সরকারি সারের ডিলারশিপের তালিকায় তার নাম আসায় স্থানীয় রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে—সারের ডিলারশিপ নিশ্চিত করতে স্থানীয় এক প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ টাকা লেনদেনের চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও এ অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো ব্যাংক লেনদেনের নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও বিএনপির প্রবীণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শফিকুল ইসলাম ও তার পরিবারের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিনের আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে শফিকুল ও তার পরিবারের সদস্যরা ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শফিকুলের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন প্রবীণ নেতাকর্মীর দাবি, বিগত বছরগুলোতে বিএনপি কিংবা এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নিয়মিত কর্মসূচিতে শফিকুলকে সক্রিয়ভাবে দেখা যায়নি।
তাদের প্রশ্ন—দীর্ঘদিন দলীয় রাজনীতিতে দৃশ্যমান না থাকা একজন ব্যক্তি কীভাবে হঠাৎ করে বিএনপির কর্মী বা নির্যাতিত কর্মী হিসেবে পরিচিতি পেলেন এবং সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে সরকারি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো?
তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি; রাজনৈতিক পরিচয় সংক্রান্ত বিষয়টি দলীয় নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত মামলা রাজনৈতিক মামলা হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে সাংবাদিক আবুল হোসেনের দায়ের করা একটি মামলায় শফিকুল ইসলাম আসামি হন।
অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে ওই মামলাটিকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
তবে মামলাটির প্রকৃতি, এজাহারের বিষয়বস্তু এবং এর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও আইনগত রেকর্ড পর্যালোচনা প্রয়োজন।
টিসিবির পর এবার সরকারি সারের ডিলারশিপ
শফিকুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান মেসার্স আরাফাত গ্রীন ফার্ম-এর নামে টিসিবির ডিলারশিপ থাকার বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, টিসিবির ডিলারশিপ পাওয়ার পর এবার বিএডিসি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের ইউনিয়নভিত্তিক সরকারি সারের ডিলারশিপের তালিকাতেও একই প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে—একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, পূর্ববর্তী ব্যবসায়িক রেকর্ড এবং সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ডিলারশিপের আবেদন, যাচাই-বাছাই প্রতিবেদন, স্থানীয় প্রশাসনের সুপারিশ এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
১০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ কতটা সত্য?
এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হচ্ছে সারের ডিলারশিপকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০ লাখ টাকা লেনদেনের সম্ভাব্য চেষ্টা।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, শফিকুল ইসলামকে ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার জন্য স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে অর্থনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য আর্থিক নথি, অডিও-ভিডিও প্রমাণ বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এই প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।
ফলে ১০ লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়টিকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। বিষয়টি সত্য হলে অর্থের উৎস, গ্রহীতা, মধ্যস্থতাকারী এবং সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক কর্মকর্তার বক্তব্য ঘিরে প্রশ্ন
শফিকুলের নাম সারের ডিলারশিপের তালিকায় কীভাবে এসেছে—এ বিষয়ে বাহাদুরপুর ইউনিয়নের প্রশাসক ও বিআরডিবি কর্মকর্তা সাকের উদ্দিনের ভূমিকা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শফিকুলের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন—
«“কে আওয়ামী লীগ আর কে বিএনপি, তা কি কারও শরীরে লেখা আছে?”»
পরবর্তীতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কর্মকর্তা সাকের উদ্দিন বলেন—
«“নিয়ম না থাকলেও বিষয়টি নিয়ে আমি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রবি ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি আমাকে সব ঠিক আছে বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। শফিকুল যে ইতোমধ্যেই টিসিবির ডিলার কিংবা সে আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ছিল—এ তথ্যগুলো আমার জানা ছিল না।”»
তার এই বক্তব্যের পরও প্রশ্ন থেকে যায়—সরকারি কোনো ডিলারশিপের জন্য প্রার্থী বা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করা যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের অংশ না হয়, তাহলে কোন কোন যোগ্যতা ও নথির ভিত্তিতে আবেদন যাচাই করা হয়েছে?
এ প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কাছ থেকেই পাওয়া প্রয়োজন।
শফিকুলের বক্তব্য: ‘আমি কোনোদিন আওয়ামী লীগ করিনি’
অভিযোগের বিষয়ে মো. শফিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন—
«“আমি কোনোদিন আওয়ামী লীগ করিনি। এত হিসাব-নিকাশ আমি বুঝি না। সরকারি নিয়ম মেনে ইউনিয়ন থেকে আমার প্রতিষ্ঠানের নাম পাঠানো হয়েছে।”»
অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন, টিসিবির ডিলারশিপ এবং সারের ডিলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম বা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি নিয়ম মেনেই তার প্রতিষ্ঠানের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।
আইনগত প্রশ্ন: রাজনৈতিক পরিচয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো সরকারি নথি ও প্রক্রিয়া
কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অভিযোগ থাকা মাত্রই তাকে অপরাধী বলা যায় না। একইভাবে কোনো সরকারি ডিলারশিপ পাওয়াও নিজে অপরাধের প্রমাণ নয়।
তবে আবেদনপত্রে মিথ্যা তথ্য প্রদান, জাল নথি ব্যবহার, প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি সুবিধা গ্রহণ কিংবা সরকারি কর্মকর্তাকে অবৈধভাবে প্রভাবিত করার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তাই বিষয়টি নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত—
১. ডিলারশিপের আবেদনপত্র ও সংযুক্ত নথি যাচাই করা;
২. আবেদনকারীর প্রতিষ্ঠানের বৈধ কাগজপত্র পরীক্ষা করা;
৩. টিসিবির ডিলারশিপ কীভাবে পেয়েছেন তা যাচাই করা;
৪. বিএডিসি/কৃষি বিভাগের যাচাই-বাছাই নথি পর্যালোচনা করা;
৫. স্থানীয় সুপারিশের ভিত্তি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা পরীক্ষা করা;
৬. অর্থ লেনদেনের অভিযোগ থাকলে প্রয়োজনীয় আর্থিক তদন্ত করা এবং
৭. অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়; প্রমাণ ও সরকারি নথিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ত্যাগী নেতাকর্মীদের ক্ষোভ
এদিকে বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বিএনপির কয়েকজন প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তাদের দাবি, দীর্ঘদিন যারা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন, মামলা-মোকদ্দমা ও নানা হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের বাদ দিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করা ব্যক্তিদের সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হলে মাঠপর্যায়ে অসন্তোষ আরও বাড়বে।
তারা সরকারি ডিলারশিপের তালিকা পুনঃপর্যালোচনা, আবেদনকারীদের যোগ্যতা যাচাই এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
শার্শার মতো সীমান্তবর্তী কৃষিপ্রধান এলাকায় সরকারি সার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ডিলারশিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো অনিয়ম হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে কৃষক ও সাধারণ ভোক্তার ওপর।
তাই শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য কি না, তিনি নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছেন কি না, তার প্রতিষ্ঠানের নামে ডিলারশিপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং কথিত ১০ লাখ টাকা লেনদেনের কোনো বাস্তবতা আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
প্রয়োজনীয় নথি যাচাই, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র বের করা সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ-এর অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।
সম্পাদনা নোট: এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক পরিচয় ও অনিয়মের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ এবং অন্য যেকোনো অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে সংযোজন/সংশোধন করা হবে।