বগুড়া প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেস্ক | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: ধানের শীষের অস্তিত্ব বনাম পারিবারিক আঁতাত
বগুড়া: উত্তরবঙ্গের রাজনীতির রাজধানীখ্যাত বগুড়ায় এখন উৎসবের বদলে আতঙ্কের ছায়া। দীর্ঘদিন ‘ফ্যাসিস্ট’ শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়ার পর যখন সাধারণ মানুষ নতুন ভোরের অপেক্ষায় ছিল, ঠিক তখনই বগুড়া-৬ (সদর) আসনের উপনির্বাচন ঘিরে জন্ম নিয়েছে এক নজিরবিহীন বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে—বগুড়া কি সত্যিই আওয়ামী মুক্ত হয়েছে, নাকি পর্দার আড়ালে এক শক্তিশালী ‘ভাই-ভাই’ সমঝোতার কাছে জিম্মি হতে চলেছে এই পুণ্যভূমি?
১. একই ছাদের নিচে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি: রাজনৈতিক সুবিধাবাদ নাকি গভীর ষড়যন্ত্র?
বগুড়ার রাজনীতিতে বর্তমান সময়ের সবচাইতে বড় টক অব দ্য টাউন হলো দুই সহোদরের অবস্থান। একদিকে মো: রেজাউল করিম বাদশা, যিনি জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি ও সাবেক মেয়র। অন্যদিকে তাঁরই আপন ভাই মঞ্জুরুল আলম মোহন, যিনি জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এই ‘দুই ভাইয়ের রাজনীতি’ আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল, তখন এই পারিবারিক সম্পর্কের সুবাদে বাদশা পরিবার বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছে, অথচ সাধারণ বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ছাড়া হতে হয়েছে। এখন বিএনপির সুসময়ে আবারও সেই একই পরিবারের কাউকে মনোনয়ন দেওয়াকে ‘সুবিধাবাদী রাজনীতির পুনর্বাসন’ হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ।
২. আওয়ামী প্রেতাত্মার আস্ফালন ও নেতাকর্মীদের রক্তক্ষরণ
তৃণমূলের ক্ষোভের আগুন আরও ঘি ঢেলেছে মঞ্জুরুল আলম মোহনের অতীত কর্মকাণ্ড। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন মোহন প্রকাশ্য জনসভায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে অত্যন্ত ধৃষ্টতাপূর্ণ ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন।

বগুড়ার সচেতন ভোটারদের প্রশ্ন:
“যে পরিবারের একজন সদস্য আমাদের অভিভাবক তারেক রহমানকে অপমান করেছে, সেই পরিবারের আরেকজন সদস্যকে আমরা কোন মুখে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে মেনে নেব? এটি কি শহীদ জিয়ার আদর্শের সাথে চরম বেইমানি নয়?”
৩. বগুড়া-৬ উপনির্বাচন: জনমতের প্রতিফলন বনাম বিতর্কিত মনোনয়ন
বগুড়া-৬ আসনটি বিএনপির জন্য কেবল একটি নির্বাচনী এলাকা নয়, এটি দলটির অস্তিত্ব ও সম্মানের প্রতীক। এখান থেকে স্বয়ং তারেক রহমান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই পুণ্যভূমিতে রেজাউল করিম বাদশাকে প্রার্থী করার বিরোধিতায় উত্তাল রাজপথ থেকে সোশ্যাল মিডিয়া।
তৃণমূলের মূল অভিযোগ ও দাবি:

আঞ্চলিক পরিচয় সংকট: জনগণের একাংশের দাবি, বাদশা মূলত বগুড়ার মাটির সন্তান নন। এই আসনে একজন ভূমিপুত্র ও রাজপথের পরীক্ষিত নেতাকে প্রার্থী করা হোক।
ছায়া শাসনের ভয়: সাধারণ ভোটারদের আশঙ্কা, বাদশা নির্বাচিত হলে আড়াল থেকে তাঁর আওয়ামী লীগপন্থী ভাই-ই জেলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করবেন। এতে বগুড়ায় আবারও ‘আওয়ামী সিন্ডিকেট’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।
অপারেশন সভাপতি বনাম সাধারণ সম্পাদক: একই ঘরে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পদের অবস্থান জনগণের ভোটের অধিকারকে প্রহসনে পরিণত করতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
৪. “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী” ও জননেতা তারেক রহমানের প্রতি সরাসরি আহ্বান
বগুড়া জেলার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের এখন শেষ ভরসা তাদের প্রিয় নেতা, নতুন বাংলাদেশের আগামীর কান্ডারি তারেক রহমান।
বগুড়াবাসীর স্পষ্ট বার্তা:
“হে আমাদের নেতা, আপনি এই আবেগকে অবজ্ঞা করবেন না। বগুড়ার মানুষ আওয়ামী লীগের কবল থেকে মুক্তি চেয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের পকেট বন্দি হতে চায়নি। রেজাউল করিম বাদশার মতো বিতর্কিত কাউকে হাত দিয়ে দয়া করে একজন যোগ্য, ত্যাগী এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিন।”
তারা আরও দাবি করেন, যে ব্যক্তি দলের দুঃসময়ে ভাইয়ের আওয়ামী পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তাকে সরিয়ে রাজপথের লড়াকু সৈনিকদের মূল্যায়ন করা হোক।
৫. উপসংহার: ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে বগুড়া
বগুড়া-৬ আসনের আসন্ন উপনির্বাচন কেবল একটি জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়; এটি আদর্শ রক্ষার লড়াই। যদি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৃণমূলের এই যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে, তবে সাধারণ ভোটাররা নিজেদের বঞ্চিত মনে করবেন, যার প্রভাব আগামী জাতীয় নির্বাচনেও পড়তে পারে।
বগুড়ার আকাশ থেকে এই ‘পরিবারতন্ত্রের কালো মেঘ’ সরানোর দায়িত্ব এখন সরাসরি কেন্দ্রের। লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর চোখ এখন লন্ডনের দিকে—তারা বিশ্বাস করেন, তাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমান বগুড়াবাসীর এই রক্তের ঋণ ও আবেগ বুঝতে পারবেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বগুড়াকে কলঙ্কমুক্ত করবেন।
কে এই মঞ্জুরুল আলম মোহন?
বগুড়ার ত্রাস এবং দেড় দশকের ‘ফ্যাসিস্ট’ রাজত্বের নেপথ্য কারিগর

মঞ্জুরুল আলম মোহন
পদবী: ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বগুড়া জেলা শাখা।
পরিচয়: জেলা বিএনপির সভাপতি মো: রেজাউল করিম বাদশার আপন ছোট ভাই।
বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনকে সামনে রেখে যখন রেজাউল করিম বাদশাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন জনমনে সবচাইতে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর ছোট ভাই মোহনের রাজনৈতিক পরিচয় ও তাঁর আমলের অন্ধকার ইতিহাস। নিচে তাঁর রাজনৈতিক পদবী ও কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো:
১. ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মঞ্জুরুল আলম মোহন গত ১৫ বছর বগুড়া জেলাকে নিজের ব্যক্তিগত জমিদারি হিসেবে পরিচালনা করেছেন। পুলিশ ও সিভিল প্রশাসন তাঁর ইশারা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারতো না। সাধারণ মানুষের জমি দখল থেকে শুরু করে সরকারি অফিসের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ—সবই ছিল মোহনের ‘অপারেশন’ এর অংশ।
২. শত মায়ের আর্তনাদ ও খুনের রাজত্ব
মোহরের বিরুদ্ধে সবচাইতে বড় অভিযোগ হলো বিরোধী দল দমনে চরম বর্বরতা। তাঁর শাসনামলে:
গুম ও খুন: অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মীকে গুম এবং চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়।
মায়ের কান্না: বগুড়ার শত শত মা মোহনের বাড়ির সামনে ধর্ণা দিয়েছেন তাদের সন্তানের জীবনের বিনিময়ে, কিন্তু মোহনের কঠোর মনে বিন্দুমাত্র দয়া জাগেনি। অনেক মায়ের কোল খালি করার পেছনের নায়ক ছিলেন এই মোহন।
৩. পারিবারিক মর্যাদা হরণ ও নোংরা আচরণ
মঞ্জুরুল আলম মোহন কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করেননি, বরং তাদের পরিবারের মা-বোনদের নিয়ে অত্যন্ত নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ আচরণ করেছেন।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে সম্মানিত পরিবারের নারীদের সম্মানহানি এবং মুরুব্বিদের জনসম্মুখে অপমান করা ছিল তাঁর নিত্যদিনের স্বভাব।
পারিবারিক গোপনীয়তা ভঙ্গ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুৎসা রটানোর মাধ্যমে তিনি অনেক পরিবারকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন।
৪. শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য
আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন তিনি প্রতিটি জনসভায় অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আক্রমণ করতেন।
“তারেক রহমান সম্পর্কে মোহনের সেই কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যগুলো আজও বগুড়ার মানুষের কানে বাজে। এখন তাঁরই ভাই রেজাউল করিম বাদশা যখন ধানের শীষ নিয়ে ভোট চাইতে আসবেন, তখন সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করবে—যাদের পরিবার আমাদের নেতাকে গালি দেয়, তাদের আমরা কেন ভোট দেব?”
৫. ভাই-ভাই আঁতাত ও পরিবারতন্ত্র
বগুড়ার সচেতন মহল মনে করে, বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি (রেজাউল করিম বাদশা) এবং বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক (মঞ্জুরুল আলম মোহন)—এই দুই ভাইয়ের সমীকরণ আসলে এক বিশাল প্রতারণা। এই ‘ভাই-ভাই’ সম্পর্কের কারণে আওয়ামী লীগ আমলে বাদশা সুরক্ষিত ছিলেন, আর এখন বাদশার ছায়ায় মোহন আবারও ফিরে আসার ষড়যন্ত্র করছেন।
তৃণমূলের চূড়ান্ত দাবি:
বগুড়ার সাধারণ মানুষ মনে করে, মঞ্জুরুল আলম মোহন কেবল একটি দলের নেতা নন, তিনি এক পৈশাচিক অধ্যায়ের প্রতীক। তাঁর অপরাধের ফিরিস্তি এতোটাই দীর্ঘ যে, তাঁর পরিবারের কাউকে (রেজাউল করিম বাদশা) বগুড়ার অভিভাবক হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
জনগণ সরাসরি তারেক রহমানের কাছে প্রার্থনা করছে: > “মাননীয় নেতা, খুনি ও দুর্নীতিবাজ মোহনের পরিবারের হাত থেকে বগুড়াকে রক্ষা করুন। রেজাউল করিম বাদশাকে সরিয়ে কোনো সৎ ও ত্যাগী নেতৃত্বকে এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে মনোনয়ন দিন।”