জনগণের অর্থে দুর্নীতির রাজত্ব!
নৌ অধিদপ্তরের শিপ সার্ভেয়ার মাহবুবুর রশিদ মুন্নার বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদের পাহাড় — দুদক ও নৌ মন্ত্রণালয়ের জরুরি তদন্ত দাবি
বিশেষ প্রতিবেদক | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
ঢাকা | রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের নৌ খাত দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির বিষবাষ্পে আক্রান্ত। কিন্তু সম্প্রতি নৌ অধিদপ্তরের একজন মধ্যম স্তরের কর্মকর্তা—শিপ সার্ভেয়ার মো. মাহবুবুর রশিদ মুন্না—এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সাধারণ ঘুষ-দুর্নীতির সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। দুর্নীতির এমন এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, যা শুধু সরকারি নৈতিকতার লঙ্ঘন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহারের এক নগ্ন উদাহরণ।
সূত্র জানায়, মাহবুবুর রশিদ মুন্না দীর্ঘদিন ধরে নৌ অধিদপ্তরের শিপ সার্ভেয়ার পদে থেকে অভ্যন্তরীণ নৌযান সার্ভে, ফিটনেস নবায়ন, ও রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমে অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে আসছেন। প্রত্যেক নৌযান মালিকের কাছ থেকে ‘ফিটনেস’ বা ‘পরিদর্শন সনদ’ দেওয়ার নামে প্রতি নৌযানে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এভাবে বছরের পর বছর শত শত নৌযান থেকে গড়ে তোলা হয়েছে কোটি টাকার কালো সাম্রাজ্য। দুর্নীতির এই চক্রে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা, কিছু দালাল এবং নৌযান মালিক সমিতির কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যও জড়িত বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই কর্মকর্তা রাজধানীর আফতাবনগরের ব্লক-এম, রোড-৫, প্লট-১৮ নম্বরে একাধিকতলা বিশিষ্ট একটি বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেছেন। নিবন্ধন নথিতে ভবনের মালিকানা স্ত্রী ও আত্মীয়ের নামে দেখানো হলেও প্রকৃত মালিক তিনি নিজেই বলে স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। বাড়িটিতে রয়েছে আধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, আমদানিকৃত আসবাব, এবং ব্যয়বহুল ইন্টেরিয়র ডিজাইন। পাশাপাশি তার নামে ও স্ত্রীর নামে দুটি প্রাইভেটকার, গ্রামের বাড়িতে জমি ক্রয়, এবং একাধিক ব্যাংক একাউন্টে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো— সরকারি পদে থেকে মাহবুবুর রশিদ মুন্না নিজের প্রচার ও আত্মমুগ্ধতার জন্য প্রায় ১.৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যেখানে তিনি নিজেই ‘নায়ক’ ও ‘প্রযোজক’ দুই ভূমিকায় ছিলেন। চলচ্চিত্রটির নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে সেটি নিয়ে নৌ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সরকারি দায়িত্বে থেকে ব্যক্তিগত ইমেজ নির্মাণে সরকারি পদমর্যাদার অপব্যবহার—এটি সরাসরি কর্মকর্তা আচরণবিধির ১৩(১) ধারার লঙ্ঘন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি তিনি নৌ অধিদপ্তরের চীফ ইঞ্জিনিয়ার পদে পদোন্নতির আশায় জামায়াত ঘনিষ্ঠ একটি প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে অর্থিক যোগসাজশে লিপ্ত হয়েছেন। বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, কোটি টাকার বিনিময়ে পদোন্নতির আশ্বাস পেয়েছেন— এমন খবর ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন মহল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে— কিছু নৌযান কোম্পানিকে অবৈধভাবে সার্ভে ছাড়পত্র দেওয়া, যান্ত্রিকভাবে অযোগ্য নৌযানকেও “ফিট” সার্টিফিকেট প্রদান, এবং কর্মকর্তাদের ভয় দেখিয়ে ফাইল অনুমোদনে বাধ্য করা।
দুর্নীতির এমন অভিযোগের পরও এখন পর্যন্ত দুদক বা নৌ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে অনেকেই বিষয়টি জানলেও, “প্রভাবশালী মহলের ছায়া” থাকার কারণে অনেকে নীরব রয়েছেন। সচেতন নাগরিক ও নৌযান মালিক সমিতির একাংশ ইতিমধ্যেই দুদক, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ও এনএসআই প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।
অর্থনীতি ও প্রশাসন বিশ্লেষক ড. ফজলুল হক মজুমদার বলেন, “যদি একজন মাঝারি পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা কোটি টাকার সম্পদের মালিক হন, অথচ তার সরকারি আয় বছরে কয়েক লাখ টাকার বেশি না হয়, তাহলে সেটি দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিশনের সরাসরি তদন্তের বিষয়। এটি শুধু ঘুষ নয়, প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতার বিপর্যয়।”
জনগণের দাবি:
১. মাহবুবুর রশিদ মুন্নার অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান
২. তার দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি ও প্রশাসনিক তদন্ত
৩. দুদক ও এনএসআই’র যৌথ অনুসন্ধান কমিটি গঠন
৪. নৌ অধিদপ্তরের সার্ভে বিভাগে ডিজিটাল মনিটরিং চালু করা
দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ এর অনুসন্ধানী টিম বলছে, “এটি এক ব্যক্তির দুর্নীতি নয়, বরং পুরো নৌ প্রশাসনের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। যতদিন পর্যন্ত জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা না হবে, ততদিন জনগণের অর্থে দুর্নীতির এ রাজত্ব চলবে।”
শেষকথা:
বাংলাদেশের নৌযান সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নির্ভর করছে যারা সার্ভে ও অনুমোদন দেন, তাদের সততার ওপর। যদি সেই কর্মকর্তারাই দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেন, তাহলে দুর্ঘটনা রোধ তো দূরের কথা, নৌপথই হবে দুর্নীতির নতুন স্রোতপথ।