স্টাফ রিপোর্ট : বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ
সীমান্তের রাজনীতিতে সাহসের নতুন সংজ্ঞা
বেনাপোল, যশোর: দেশের প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র বেনাপোল পৌরসভা। এই সীমান্ত জনপদের রাজনীতিতে গত কয়েক দশকে অনেক নেতার উত্থান-পতন দেখলেও, একজনের নাম এখন মুখে মুখে—মো: মফিজুর রহমান সজন। আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে নিজের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার পর থেকেই বেনাপোলের রাজনৈতিক সমীকরণে এক বিশাল ঢেউ উঠেছে। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন প্রার্থী নন, বরং দীর্ঘদিনের শোষণ ও ভয়ের রাজত্বের বিরুদ্ধে এক সাহসী ধ্রুবতারা।
অতীতের অগ্নিপরীক্ষা: যখন কেউ কথা বলার সাহস পায়নি
২০২৩ সালের ১৭ই জুলাই অনুষ্ঠিত বেনাপোল পৌরসভা নির্বাচন ছিল সজনের রাজনৈতিক জীবনের এক টার্নিং পয়েন্ট। সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত জটিল ও ভীতিসঞ্চারকারী। তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের কঠোর নজরদারি আর স্থানীয় প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ‘মোবাইল ফোন’ প্রতীক নিয়ে তিনি একাই লড়াইয়ে নেমেছিলেন।
তদন্তে উঠে আসা তথ্যানুযায়ী:
স্বতন্ত্র অবস্থান: সেই কঠিন সময়ে কোনো বড় রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় না গিয়েও সাধারণ মানুষের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তিনি নির্বাচনী মাঠে টিকে ছিলেন।
জনমানুষের ইশতেহার: তার প্রতিটি জনসভা ছিল মূলত শোষিত মানুষের হৃদয়ের কথা। তিনি সাধারণ মানুষকে সাহস জুগিয়েছিলেন যে, রাজপথের চেয়েও ব্যালট বড় শক্তি।
অকুতোভয় নেতৃত্ব: স্থানীয়রা আজও স্মরণ করেন, সজনই ছিলেন একমাত্র নেতা যিনি বন্দরকেন্দ্রিক অনিয়ম এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে তৎকালীন ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন।
যশোর জেলার বেনাপোল সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ জনপদ বেনাপোল দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। ভারত-বাংলাদেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর হিসেবে বেনাপোলের গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বন্দরনগরীর উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারে যেসব মানুষের নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন মফিজুর রহমান স্বজন।
দীর্ঘদিন ধরে বেনাপোলের উন্নয়ন, অবকাঠামোগত পরিবর্তন, বন্দর আধুনিকীকরণ এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি বিভিন্ন আন্দোলন ও উদ্যোগের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বেনাপোল পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
স্থানীয়দের মতে, বেনাপোলের বহু উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও সাহসী নেতৃত্ব।
অতীতের উন্নয়ন ও ঐতিহাসিক অবদান
বেনাপোলকে জিয়া স্থলবন্দর ঘোষণার দাবি
বেনাপোল উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি থাকাকালীন সময়েই মফিজুর রহমান স্বজন একটি ঐতিহাসিক দাবি উত্থাপন করেছিলেন— বেনাপোল বন্দরকে “জিয়া স্থলবন্দর” হিসেবে ঘোষণা করা।
এই দাবির মাধ্যমে তিনি বন্দরটির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব ও জাতীয় মর্যাদা বৃদ্ধি করার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। অনেকেই মনে করেন, এই দাবির মাধ্যমে বেনাপোল বন্দরের মর্যাদা ও পরিচিতি নতুন মাত্রা পেয়েছিল।
বেনাপোল পৌরসভা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন
একসময় বেনাপোলকে অনেকেই একটি প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী গ্রাম হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়তে থাকায় বেনাপোলকে একটি আধুনিক নগরীতে রূপান্তরের দাবি ওঠে।
এই দাবির পক্ষে সবচেয়ে শক্তভাবে আন্দোলন করেছিলেন মফিজুর রহমান স্বজন। তার আন্দোলন ও প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে বেনাপোলকে পৌরসভায় রূপান্তরের পথ সুগম হয়।
স্থানীয়রা মনে করেন, বেনাপোল পৌরসভা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার অবদান ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের আধুনিকীকরণ
একসময় বেনাপোল কাস্টম হাউসের অবকাঠামো ছিল অত্যন্ত দুর্বল এবং বাণিজ্য পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছিল না।
পরবর্তীতে উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে কাস্টম হাউসের আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপযোগী অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে স্বজনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্থানীয়রা উল্লেখ করেন।
সিএন্ডএফ এজেন্ট সমিতির নেতৃত্ব
ওয়ান-ইলেভেন সময়কালে তিনি বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রায় নয় বছর ধরে সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তার নেতৃত্বে বন্দরের বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কার এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে গতি আসে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করেন।
বেনাপোল সড়ক উন্নয়ন আন্দোলন
বেনাপোলের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো— তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের গাড়ি আটকে দিয়ে সড়ক উন্নয়নের দাবি তোলা।
মফিজুর রহমান স্বজনের নেতৃত্বে বেনাপোল বলফিল্ড থেকে চেকপোস্ট পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নের দাবিতে সেই আন্দোলন গড়ে ওঠে।
পরবর্তীতে এই সড়ক নির্মাণ করা হয়, যা আজ বেনাপোলের উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
বিজিবি গেট নির্মাণের পরিকল্পনা
বর্তমানে যে দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বারটি বিজিবি গেট নামে পরিচিত, তার পরিকল্পনাতেও স্বজনের অবদান রয়েছে বলে স্থানীয়রা উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা উন্নয়ন
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে যাত্রীসেবার মান উন্নত করতে বেনাপোলে প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এই প্রকল্পের ধারণা ও রূপরেখা তৈরির ক্ষেত্রেও স্বজনের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা
১০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল
বেনাপোলবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি একটি আধুনিক হাসপাতাল।
মফিজুর রহমান স্বজনের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ১০০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ, যেখানে দরিদ্র ও অসহায় মানুষ স্বল্প খরচে চিকিৎসা সেবা পাবে।
শ্রমিকদের আবাসন ও কল্যাণ সুবিধা
বেনাপোল বন্দরের শ্রমিকদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা, চিকিৎসা সুবিধা, নতুন গুদামঘর এবং অবসর ভাতার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাইপাস সড়ক ডাবল লেন
ছোট আঁচড়া থেকে বেনাপোল ফায়ার সার্ভিস পর্যন্ত যে বাইপাস সড়ক রয়েছে, সেটিকে ডাবল লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এতে বেনাপোল শহরের যানজট অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভাঙ্গা–নড়াইল–যশোর–বেনাপোল মহাসড়ক ছয় লেন
পদ্মা সেতু চালুর পর ভাঙ্গা থেকে নড়াইল, যশোর হয়ে বেনাপোল পর্যন্ত মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে রাস্তার পাশে পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে কিছু আপত্তির কারণে কাজ বিলম্বিত হচ্ছে বলে জানা যায়।
এই বিষয়ে স্বজনের নেতৃত্বে বিভিন্ন আন্দোলন, সমাবেশ এবং প্রেস কনফারেন্সও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তিন হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প
বেনাপোলের ছোট আঁচড়া ভবের সংলগ্ন হাইওয়ের দক্ষিণ পাশে বেনাপোল বন্দরের উন্নয়নের জন্য প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এই প্রকল্পে প্রায় ১০০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে—
হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে
বন্দরের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে
বেনাপোলের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে
এছাড়াও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেনাপোল স্থলবন্দরে দশতলা আধুনিক অফিস ভবন নির্মাণের কাজও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
জনগণের প্রত্যাশা
বেনাপোল বন্দর, কাস্টম হাউস, সড়ক যোগাযোগ, হাসপাতাল এবং শ্রমিক কল্যাণ—সব ক্ষেত্রেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম নেতৃত্ব প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
অনেকেই মনে করেন, উন্নয়ন এবং সাহসী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে মফিজুর রহমান স্বজনের বিকল্প নেই।
তাদের বিশ্বাস, তিনি যদি বেনাপোল পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পান, তাহলে বেনাপোলকে একটি আধুনিক বন্দরনগরীতে রূপান্তরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।