শ্রীপুরে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যু
মাওনা চৌরাস্তার ‘লাইফ কেয়ার হাসপাতাল’ সিলগালার নির্দেশ, পলাতক চিকিৎসক ও কর্তৃপক্ষ
ক্ষুব্ধ স্বজনদের ভাঙচুর, তদন্তে নেমেছে প্রশাসন — এলাকায় শোকের ছায়া
মোঃ সুলতান মাহমুদ, গাজীপুর প্রতিনিধি
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে কথিত ভুল চিকিৎসার কারণে এক প্রসূতি নারীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাটি ঘটেছে মাওনা চৌরাস্তার ‘লাইফ কেয়ার হাসপাতাল’-এ। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রসূতির মৃত্যুর পর হাসপাতালের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মৃতদেহ রেখে গা ঢাকা দিয়েছেন।
নিহত প্রসূতি রুমা (২৫) শ্রীপুর উপজেলার উজিলাব গ্রামের বাসিন্দা মোঃ মানিক মিয়ার স্ত্রী। তিনি হেরা পটকা গ্রামের আব্দুর রশিদ ও সালেহা বেগমের কন্যা। তার অকাল মৃত্যুর খবরে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
প্রসব বেদনা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৮ তারিখ সকালে প্রসব বেদনা শুরু হলে রুমাকে দ্রুত মাওনা চৌরাস্তার লাইফ কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে সিজারিয়ান অপারেশনের পরামর্শ দেন।
দুপুর প্রায় ১২টার দিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রুমা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। অপারেশনের পর প্রথম দিকে তিনি সুস্থ ছিলেন এবং স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিলেন বলে দাবি করেন তার স্বজনরা।
রাতের মধ্যেই অবস্থার অবনতি
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, অপারেশনের কিছু সময় পর থেকেই রুমার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে শুরু করে। তবে হাসপাতালের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
পরদিন ভোর প্রায় ৫টার দিকে স্বজনরা রুমাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। তবে মৃত্যুর বিষয়টি গোপন রেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর কথা বলে তড়িঘড়ি করে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে থাকে।
ঢাকা নেওয়ার পথে ধরা পড়ে সত্য
নিহতের স্বজনরা জানান, ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতির সময় তারা রুমার অবস্থার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। পরে তারা বুঝতে পারেন যে, রুমা আসলে আগেই মারা গেছেন।
এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক, নার্স এবং সংশ্লিষ্টরা দ্রুত হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ ওঠে।
ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্বজনরা
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন রুমার স্বজন ও স্থানীয়রা। তারা হাসপাতালের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে হাসপাতাল ভবনে ভাঙচুর চালান।
খবর পেয়ে শ্রীপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে।
তদন্তে নেমেছে স্বাস্থ্য বিভাগ
ঘটনার পরপরই শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ শফিকুল ইসলাম এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইদুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন শেষে ডা. শফিকুল ইসলাম জানান,
“প্রাথমিক তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, সিজারিয়ান অপারেশনের পর প্রসূতিকে যখন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল, তখন হাসপাতালে কোনো অভিজ্ঞ চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। যথাযথ চিকিৎসকের অনুপস্থিতি এবং দায়িত্বে অবহেলার কারণেই এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।”
ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ
সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইদুল ইসলাম বলেন,
“হাসপাতালটি পরিদর্শন করে আমরা বেশ কিছু অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পেয়েছি। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, এর আগেও এখানে চিকিৎসা সংক্রান্ত নানা অভিযোগ ছিল। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালটি সিলগালা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্বামীর কান্নাজড়িত দাবি
নিহতের স্বামী মোঃ মানিক মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিতভাবে আমার স্ত্রীকে মেরে ফেলেছে। আমি আমার স্ত্রীর মৃত্যুর সঠিক বিচার চাই। আমার ছোট বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে হলেও দোষীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে।”
এলাকায় চাঞ্চল্য
এ ঘটনায় পুরো শ্রীপুর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাবের কারণেই প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটছে।
তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযুক্তদের খুঁজছে প্রশাসন
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে খুঁজে বের করতে প্রশাসন কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্ত শেষে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য কঠোর নজরদারি চালানো হবে।