এলজিইডির ‘লৌহমানব’ বেলাল হোসেন; ঘুষের পাহাড়ে চড়ে প্রধান প্রকৌশলীর মসনদে
অনুসন্ধানী ডেস্ক | অপরাধ বিভাগ
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রশাসনিক কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিকড় গেড়ে বসা এক দুর্নীতির মহীরুহের নাম মো. বেলাল হোসেন। গত বুধবার প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) হিসেবে তার আসীন হওয়া যেন সংস্থাটির সৎ কর্মকর্তাদের জন্য এক অশনিসংকেত। ১৯৯২ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তার শূন্য থেকে শিখরে ওঠার গল্পটি যতটা না সাফল্যের, তার চেয়ে বেশি অনিয়ম, জালিয়াতি আর অর্থ পাচারের কালিমায় লিপ্ত।
ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি নিতে ব্যর্থতা: এক ভয়ের সাম্রাজ্য
এই প্রতিবেদনের জন্য মাঠ পর্যায়ের অন্তত ১২ জন ভুক্তভোগী ঠিকাদার এবং ৮ জন নিম্নপদস্থ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রত্যেকেই নাম শোনার পর আতঙ্কে ফোন কেটে দিয়েছেন অথবা কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বলেন, “বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে নিজের ক্যারিয়ার চিরতরে শেষ করে দেওয়া। তার হাত অনেক লম্বা, সদরদপ্তর থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত তার ক্যাডার বাহিনী বিস্তৃত।” ভুক্তভোগীদের এই চরম আতঙ্কই প্রমাণ করে যে, তিনি এলজিইডিকে একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের বদলে নিজের ব্যক্তিগত ‘টর্চার সেলে’ রূপান্তর করেছেন।
নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের ‘নিখুঁত’ নকশা
বেলাল হোসেন যখন প্রশাসন শাখার দায়িত্বে ছিলেন, তখন এলজিইডিতে বদলি ও নিয়োগ মানেই ছিল কোটি কোটি টাকার লেনদেন। সূত্র বলছে, জেলা পর্যায়ের কোনো প্রকৌশলীকে সুবিধাজনক স্থানে বদলি করতে হলে ৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হতো। আর মানবসম্পদ উন্নয়ন শাখার দায়িত্বে থাকাকালীন প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ সফরের তালিকা তৈরিতেও তিনি স্বজনপ্রীতি ও অর্থের বিনিময়কে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ফলে মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তারা বারবার বঞ্চিত হয়েছেন, আর অর্থের জোরে অযোগ্যরা গুরুত্বপূর্ণ চেয়ার দখল করেছে।
প্রকল্প লুটপাট: মাননিয়ন্ত্রণ এখন নামমাত্র
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (মাননিয়ন্ত্রণ) থাকাকালীন বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়ংকর অভিযোগগুলো উঠতে শুরু করে। নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো বড় রাস্তার বা ব্রিজের কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল তার ওপর। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, যেসব ঠিকাদার তাকে মোটা অংকের কমিশন দিয়েছেন, তাদের নিম্নমানের কাজকেও তিনি ‘সেরা’ হিসেবে ছাড়পত্র দিয়েছেন। ফলে উদ্বোধনের ছয় মাসের মাথায় ভেঙে পড়ছে কোটি কোটি টাকার রাস্তা, যার দায়ভার পরোক্ষভাবে এই কর্মকর্তার কাঁধেই বর্তায়।
বেনামে সম্পদের পাহাড়: কোথায় নেই বেলাল?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেলাল হোসেনের সম্পদের বিস্তার শুধু ঢাকাতেই নয়, বরং দেশের বাইরেও ছড়িয়ে আছে। তার আয়ের সাথে জীবনযাত্রার আকাশ-পাতাল পার্থক্য যে কারো চোখ কপালে তুলবে।
রাজধানীতে রাজত্ব: রাজধানীর ধানমন্ডি ও উত্তরায় তার এবং তার স্ত্রীর নামে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে।
বেনামে ব্যবসা: এলজিইডির তালিকাভুক্ত বেশ কয়েকটি বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নেপথ্য মালিক তিনি নিজেই বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নিজের সংস্থাকেই কাজ পাইয়ে দিতেন।
বিদেশে অর্থ পাচার: নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, হুন্ডির মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন এবং সেখানেও স্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।
কাজী গোলাম মোস্তফার উত্তরসূরি: দুর্নীতির ধারা অব্যাহত?
সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফার স্থলাভিষিক্ত হওয়া বেলাল হোসেনকে নিয়ে সংস্থার ভেতরেই কানাঘুষা চলছে যে, তিনি পূর্বসূরীর দুর্নীতির ধারাকে আরও বেগবান করবেন। রুটিন দায়িত্ব পেলেও তিনি যেভাবে প্রশাসনিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করছেন, তাতে এলজিইডির চেইন অফ কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
তদন্তের অপেক্ষায় সংক্ষুব্ধ মহল
সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় এলজিইডির যে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়, তার একটি বড় অংশ বেলাল হোসেনের মতো কর্মকর্তাদের পকেটে চলে যাচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে সাধারণ জনগণের দাবি—অবিলম্বে তার আয়কর নথি এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক।
শেষ কথা: বেলাল হোসেনের এই অবৈধ সাম্রাজ্যের ভিত এতটাই শক্ত যে, সাধারণ কোনো তদন্তে তাকে ধরা কঠিন। তবে রাষ্ট্র যদি কঠোর হয়, তবেই এলজিইডির এই ‘ঘুষ সম্রাট’ এর মুখোশ উন্মোচিত হবে।