প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, তবে আগামী দুই বছর আইন প্রণয়ন, অর্থ বরাদ্দ, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও প্রশাসনিক তদন্তে বাড়বে বিরোধী দলের প্রভাব
নিজস্ব প্রতিবেদক | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পরাজিত করে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এই জয়কে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে নির্বাচনে পরাজয়ের অর্থ এই নয় যে ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়তে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেস আলাদাভাবে নির্বাচিত হন। ফলে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও প্রেসিডেন্টের মেয়াদ কিংবা সাংবিধানিক ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয় না। বরং আগামী দুই বছর তাঁকে বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করতে হবে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন আসলে কী?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বুঝতে হলে প্রথমে মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিষয়টি জানা প্রয়োজন। দেশটির প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর। প্রেসিডেন্টের মেয়াদের দুই বছর অতিক্রান্ত হওয়ার সময় যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেটিই মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন।
এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতে এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গভর্নর, রাজ্য আইনসভা ও স্থানীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে মার্কিন ভোটাররা ঠিক করেন, আগামী দুই বছর কারা আইন প্রণয়ন করবেন, সরকারি অর্থ বরাদ্দ অনুমোদন করবেন এবং প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি চালাবেন।
দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চাপে ট্রাম্প
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন বলে এপি জানিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এসেছে।
এর আগে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসের দুই কক্ষ এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক ও আইনগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে নির্বাচনের রাতেই নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, নতুন কংগ্রেসের মেয়াদ শুরু হবে ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি। অর্থাৎ, এর পর থেকেই কংগ্রেসের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা কার্যকর হবে।
ট্রাম্পের পছন্দের আইন আটকে দিতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা
নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত কোনো ফেডারেল আইন পাস করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এরপর বিলটি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হয়।
ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের পছন্দের করনীতি, অভিবাসন আইন কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রস্তাব আটকে দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের প্রস্তাবিত কোনো বিল দুই কক্ষে পাস করাতে সক্ষম হলেও ট্রাম্প চাইলে তাতে ভেটো দিতে পারবেন। সেই ভেটো অতিক্রম করতে উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে।
অর্থাৎ, আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সমঝোতা ও রাজনৈতিক দর-কষাকষির গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে।
সরকারি অর্থ বরাদ্দেও বাড়বে বিরোধী দলের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যয় ও বাজেট অনুমোদনের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট বা তাঁর প্রশাসন চাইলেই নিজেদের ইচ্ছামতো সব সরকারি কর্মসূচির জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে পারে না।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় প্রশাসনের বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ কমানো, শর্ত আরোপ কিংবা ব্যয়ের অগ্রাধিকার পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারবেন।
এ নিয়ে দুই দলের মধ্যে সমঝোতা না হলে সরকারি অর্থায়ন নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে সরকারের কিছু কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে এমন পরিস্থিতি অবশ্যম্ভাবী নয়; এটি দুই দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আলোচনার ওপর নির্ভর করবে।
গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগেও বাধার মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্পের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল বিচারক, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এবং মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যসহ বিভিন্ন পদে প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন কার্যকর করতে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
ডেমোক্র্যাটরা চাইলে এসব মনোনয়ন যাচাই-বাছাই করতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে অনুমোদন আটকে দিতে পারবেন।
ফলে ট্রাম্প প্রশাসনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হতে পারে, যাঁরা বিরোধী দলের অন্তত কিছু সদস্যের কাছেও গ্রহণযোগ্য।
তবে নির্বাচনের ফলাফলের কারণে আগে থেকে নিয়োগ পাওয়া বিচারক, কর্মকর্তা কিংবা মন্ত্রিসভার সদস্যরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁদের পদ হারাবেন না।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের সুযোগ বাড়ছে
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব দেবেন। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, সরকারি অর্থ ব্যয়, নীতিগত কর্মকাণ্ড এবং সম্ভাব্য অনিয়ম নিয়ে কংগ্রেসীয় তদন্ত ও শুনানির পরিধি বাড়তে পারে।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বিষয়ে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হতে পারে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কংগ্রেসের শুনানিতে হাজির হওয়ার জন্য তলব করা এবং নথিপত্র চাওয়ার ক্ষমতাও ব্যবহার করতে পারবেন আইনপ্রণেতারা।
তবে কোনো বিষয়ে তদন্ত শুরু হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্তের ফলাফল নির্ভর করবে প্রমাণ, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
কংগ্রেসে হারলেই কি প্রেসিডেন্টকে সরানো যায়?
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজিত হলেই কোনো প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা ছাড়তে হয় না।
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদ প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগ আনতে পারে। কিন্তু সিনেটে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে অপসারণ করতে হলে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।
অর্থাৎ, কংগ্রেসের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এবং প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরানোর মতো সাংবিধানিক সমর্থন অর্জন সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
তাই ডেমোক্র্যাটদের জয় ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও তাঁকে সরাসরি প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেনি।
সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের কী লাভ বা ক্ষতি হতে পারে?
এই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতার এই পরিবর্তনে সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়বে?
বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস থাকলে প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়তে পারে। সরকারি সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত বাড়লে গুরুত্বপূর্ণ আইন, সরকারি অর্থায়ন ও প্রশাসনিক নিয়োগ আটকে যেতে পারে। এর প্রভাব সরকারি সেবা, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়তে পারে।
বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে এপির ভোটার জরিপে উঠে এসেছে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের এই জয়কে তাঁদের সব নীতির প্রতি জনগণের নিঃশর্ত সমর্থন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নির্বাচনের পর তাঁদেরও প্রমাণ করতে হবে, তাঁরা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াল?
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের পদ হারাননি, কিন্তু তাঁর দল হারিয়েছে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে নিজের পছন্দের আইন পাস, সরকারি অর্থ বরাদ্দ এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে তাঁকে এখন অনেক বেশি রাজনৈতিক বাধার মুখোমুখি হতে হবে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা পেয়েছেন প্রশাসনের ওপর নজরদারি, তদন্ত এবং আইন প্রণয়নে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর বড় সুযোগ।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আগামী দুই বছর চলবে হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। এই পালাবদল শেষ পর্যন্ত মার্কিন জনগণের জন্য কতটা সুফল বয়ে আনবে, তা নির্ভর করবে দুই দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্তের ওপর।
তথ্যসূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP), ৪ নভেম্বর ২০২৬-এর নির্বাচনী প্রতিবেদন। AP News +2