ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ বন্ধে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার স্থায়ী আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ | রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া টেকসই সংবিধান সংস্কার সম্ভব নয়
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলাদেশে ভবিষ্যতে যাতে কোনো স্বৈরতান্ত্রিক বা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনরুত্থান ঘটতে না পারে, সে লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করে ঐকমত্য ও রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার বিদ্যমান কাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে। এমন একটি সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এককভাবে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধিকারী হতে না পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার স্থায়ী আইনি কাঠামো এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত। পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে স্বাধীন ও কার্যকর ‘ওয়াচডগ’ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর মনসুন থিয়েটারে আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ সেমিনার সিরিজের প্রথম পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সেমিনারের আলোচ্য বিষয় ছিল ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’। আলোচনায় স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনা, সংবিধানের বিভিন্ন সংশোধনী, একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ ও সংকট নিয়ে আলোচনা হয়।
বাকশাল গঠন ও সাংবিধানিক সংকটের প্রসঙ্গ
বক্তব্যে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সংবিধানে সুনির্দিষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপ দেশের সাংবিধানিক সংকট এবং পরবর্তী সময়ে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
তিনি আরও বলেন, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক মোড় ছিল। তাঁর মতে, বাকশাল-পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের ফলে ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থানের পথ তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি সৃষ্টি হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেশের ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছে। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহিও জরুরি
রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা ও দায়িত্বের ভারসাম্য নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ধারাকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে, যাতে জনগণের অভিপ্রায় বা ‘পিপলস উইল’ রাষ্ট্র পরিচালনায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচারকদের কেবল স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই হবে না; আইনের মাধ্যমে তাঁদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গ যেন অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য কার্যকর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রয়োজন।
তাঁর বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য হলো, গণতন্ত্র রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে সংবিধান ও আইনের অধীনে জবাবদিহির আওতায় রাখতে হবে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা না গেলে ভবিষ্যতেও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ফিরে আসার আশঙ্কা থেকে যাবে।
উচ্চকক্ষ, পিআর পদ্ধতি ও গণভোট নিয়ে আলোচনার আহ্বান
সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচনী ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রস্তাবনা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতি এবং গণভোটসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এককভাবে চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরি করা প্রয়োজন। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ও টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
বিশেষ করে নির্বাচনী ব্যবস্থা, সংসদীয় কাঠামো এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব রাজনৈতিক পক্ষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। তাঁর মতে, আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে যে সংস্কার আসবে, তা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অস্থিরতা কমাতে এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকেও গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য। গণমাধ্যম যেন কোনো ধরনের চাপ, নিয়ন্ত্রণ কিংবা ভয়ভীতির বাইরে থেকে দায়িত্বশীলভাবে সংবাদ প্রকাশ করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যম, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করবে—এমন ব্যবস্থার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। এসব প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম এবং কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা প্রতিরোধ করা সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।
প্রতিহিংসা নয়, ঐক্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কার
রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহারের আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা বিভাজন চায় না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এবং তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সব রাজনৈতিক দল ও জনগণের পারস্পরিক ঐক্য এবং রাজনৈতিক সমঝোতা অপরিহার্য।
তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা রেখে যেতে হবে, যেখানে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ সীমিত থাকবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান।
আলোচনায় স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাস, বাকশাল প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশ, সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।
সেমিনারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে—শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সংস্কারই ভবিষ্যতে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর অন্যতম শর্ত। তবে সেই সংস্কার কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থা, ঐকমত্য, সাংবিধানিক উদ্যোগ এবং কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর।
সূত্র: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সল হাসানের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।