রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার দাবি; অতীতের মামলা ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নির্বাচনী মাঠে আসার আগ্রহ, ইউনিয়নের উন্নয়ন, মাদক-সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি
সুজন চন্দ্র দাস, দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করে আলোচনায় এসেছেন ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক, কুশিয়ারা গ্রামের সন্তান মোঃ দুলাল সরকার। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে এবার জনপ্রতিনিধি হিসেবে ইউনিয়নবাসীর সেবা করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি।
দুলাল সরকারের প্রার্থিতার আগ্রহ প্রকাশের পর স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তাঁকে নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং এলাকার উন্নয়ন নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা ঘিরে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তবে নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণ, দলীয় সমর্থন এবং চূড়ান্ত প্রার্থিতা নির্ধারণের বিষয়টি এখনো ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
আট মামলার আসামি হওয়ার দাবি, পেরিয়েছেন রাজনৈতিক প্রতিকূলতা
দুলাল সরকার জানিয়েছেন, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে তাঁকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক কারণে তিনি আটটি হয়রানিমূলক মামলার আসামি হয়েছেন। এসব মামলার কারণে তাঁকে কারাবরণসহ বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আটটি মামলার নম্বর, মামলার প্রকৃতি, বর্তমান আইনি অবস্থা কিংবা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে মামলাগুলোকে হয়রানিমূলক বলে যে দাবি তিনি করেছেন, তা তাঁর বক্তব্য হিসেবেই বিবেচ্য।
নিজের রাজনৈতিক অতীত তুলে ধরে দুলাল সরকার বলেন, “আমি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. খন্দকার মারুফ হোসেনের নেতৃত্বে বিশ্বাসী হয়ে বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলাম। সে কারণে মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে নানা হয়রানির শিকার হয়েছি। তারপরও মাথানত করিনি। সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং নেতাকে নির্বাচিত করার লক্ষ্যে কাজ করে গেছি।”
তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক জীবনে প্রতিকূলতা থাকলেও মানুষের পাশে থাকার মানসিকতা এবং সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা একজন জনপ্রতিনিধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ইউনিয়নবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে চান তিনি।
১৮ হাজারের বেশি ভোটার, নয়টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইলিয়টগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নে ভোটার সংখ্যা ১৮ হাজারের বেশি। ইউনিয়নটিতে মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে নয়টি। এর মধ্যে কুশিয়ারা ভোটকেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ১৮৮ জন। ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ও এলাকার ভোটারদের সমর্থন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
এলাকার ভোটারদের প্রত্যাশা, আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এমন নেতৃত্ব সামনে আসুক, যারা দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সমস্যা, নাগরিক সেবা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেবেন।
স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও নির্বাচনের চূড়ান্ত সময়সূচি, প্রার্থীদের মনোনয়ন এবং নির্বাচনী সমীকরণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে দুলাল সরকারের নির্বাচনী প্রস্তুতি কতটা এগোয়, দলীয় পর্যায়ে তাঁর অবস্থান কী হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি প্রার্থী হতে পারেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
মৎস্য খাত ও জমির মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় অগ্রাধিকার
চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে ইউনিয়নের সার্বিক উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন দুলাল সরকার। বিশেষ করে মৎস্য খাতসংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ, স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ এবং এলাকার মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে চান তিনি।
তাঁর মতে, ইউনিয়নের অনেক মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি, মৎস্য এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। এসব খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। জমির মালিকদের ন্যায্য স্বার্থ যাতে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে জনপ্রতিনিধির বিশেষ নজর থাকা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ইউনিয়নের উন্নয়ন শুধু রাস্তাঘাট নির্মাণ বা অবকাঠামোগত কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জনপ্রতিনিধির দায়িত্বের অংশ।
সরকারি বরাদ্দ বণ্টনে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি
ইউনিয়ন পরিষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সরকারি বরাদ্দ ও বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন দুলাল সরকার।
তিনি জানিয়েছেন, চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে সরকারি বরাদ্দ, উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিভিন্ন ভাতাভিত্তিক সুবিধা বণ্টনে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব চান না। প্রকৃত অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করবেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব শুধু নির্বাচনের সময় মানুষের কাছে যাওয়া নয়; বরং নির্বাচনের পরও মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হওয়া। ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডের মানুষের কথা শোনা এবং সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই হবে তাঁর পরিকল্পনার অংশ।
সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকমুক্ত ইউনিয়ন গড়ার প্রত্যয়
দুলাল সরকারের নির্বাচনী পরিকল্পনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি বলেন, ইউনিয়নবাসীকে সঙ্গে নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে চান। এলাকার তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, এলাকায় কোনো ব্যক্তি যেন ভয়ভীতি, হয়রানি কিংবা চাঁদাবাজির শিকার না হন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে চান। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সহযোগিতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং আইন অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রত্যাশা, সামনে নানা চ্যালেঞ্জ
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একজন চেয়ারম্যানকে ইউনিয়নের উন্নয়ন, নাগরিক সেবা, সরকারি বরাদ্দ ব্যবস্থাপনা, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তিসহ নানা বিষয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
এ কারণে শুধু রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা নয়, প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সমন্বয় করার সক্ষমতাও একজন প্রার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দুলাল সরকার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করলেও তাঁর সামনে দলীয় মনোনয়ন, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভোটারদের আস্থা অর্জনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। স্থানীয় ভোটারদের কাছে তাঁর উন্নয়ন পরিকল্পনা কতটা গ্রহণযোগ্যতা পায়, সেটিও নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, যিনিই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হোন না কেন, তিনি যেন দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য কাজ করেন। ইউনিয়নের উন্নয়ন যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়।
সমর্থন ও দোয়া চাইলেন দুলাল সরকার
নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইলিয়টগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নবাসীর সমর্থন, দোয়া ও আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন যুবদল নেতা মোঃ দুলাল সরকার।
তিনি জানান, মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থন নিয়ে জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পেলে ইউনিয়নের উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করতে চান। এলাকার মানুষের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও উন্নয়নমুখী ইউনিয়ন গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য।
আটটি মামলার আসামি হওয়ার দাবি, রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা সামনে রেখে ইলিয়টগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নিজের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন তিনি।
এখন দেখার বিষয়, আসন্ন নির্বাচনে স্থানীয় ভোটারদের সমর্থন কতটা অর্জন করতে পারেন দুলাল সরকার এবং দলীয় ও নির্বাচনী বাস্তবতায় তাঁর এই প্রত্যাশা কতদূর এগিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে জনগণের রায়ই নির্ধারণ করবে ইলিয়টগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের আগামী দিনের নেতৃত্ব।