যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় কঠোর বার্তা; স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ, জনগণের স্বার্থে কাউকে ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা
মু. অলি উল্লাহ ইয়াছিন, স্টাফ রিপোর্টার, নোয়াখালী:
মাদক, সন্ত্রাস, দখলবাজি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য ফখরুল ইসলাম। তিনি বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ দলের সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণকে এ ধরনের অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সাংগঠনিক পদ-পদবি যা-ই হোক না কেন, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, মানুষের সম্পদ দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও স্বস্তির জীবন নিশ্চিত করতে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত র্যালিপূর্ব আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বসুরহাট পৌরসভা ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবদলের উদ্যোগে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে যুবদলের সাংগঠনিক ঐতিহ্য, রাজনৈতিক ভূমিকা, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
বিএনপিকে জনগণের আস্থার দল হিসেবে উল্লেখ
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য ফখরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এ দেশের মানুষের হৃদয়ের দল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ জিয়া পরিবারের প্রতি দেশের মানুষের আবেগ ও ভালোবাসা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, বিএনপিকে দেশের মানুষ নিরাপদ আশ্রয় মনে করে। জনগণের সমর্থন ও আস্থার কারণেই ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলটি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফখরুল ইসলাম আরও বলেন, বর্তমান সরকার কোনো রক্তচক্ষুকে ভয় করে না। জনগণ ও দেশের স্বার্থে কোনো অন্যায়, অনিয়ম কিংবা অপরাধের সঙ্গে আপস করা হবে না। জনস্বার্থ রক্ষায় কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্যে সরকার পরিচালনায় জনআস্থা, রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান
ফখরুল ইসলাম এমপি বলেন, একটি এলাকার প্রকৃত উন্নয়ন শুধু রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট কিংবা অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক শান্তি, আইনের শাসন এবং অপরাধমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাঁর মতে, মাদক একটি পরিবারকে ধ্বংস করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে। অন্যদিকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোই রাজনৈতিক সংগঠনের অন্যতম দায়িত্ব। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে নেতাকর্মীদের আচরণে শৃঙ্খলা, সততা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অন্যায়, অনিয়ম কিংবা সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ উঠলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
তিনি আরও আহ্বান জানান, দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। মাদকাসক্তি থেকে তরুণদের রক্ষা, অপরাধপ্রবণতা কমানো এবং এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পরিবার, সমাজ, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় নেতাকর্মীদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য ফখরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় যেভাবে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছেন, একইভাবে আগামী ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনেও দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনের সরাসরি সম্পর্ক তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এ নির্বাচনে সাংগঠনিক শক্তি, পারস্পরিক সমন্বয় এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন।
তিনি যুবদলসহ বিএনপির সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, বিভেদ কিংবা অভ্যন্তরীণ বিরোধ পরিহার করে দলের বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী কার্যক্রমে জনগণের প্রত্যাশা ও এলাকার বাস্তব সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে তাদের সমস্যা ও দাবিদাওয়া জানতে হবে। রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও নেতাকর্মীদের সক্রিয় থাকতে হবে।
যুবদলের রাজনৈতিক ভূমিকা ও সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে আলোচনা
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন নোয়াখালী জেলা যুবদলের সভাপতি মনজুরুল আজীম সুমন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন খান।
বক্তারা যুবদলের ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলা, সংগঠনের ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে যুবসমাজের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, যুবসমাজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। এই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে রাজনৈতিক সচেতনতা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের সমন্বয় প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, একটি রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তি শুধু কর্মীর সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং সংগঠনের নেতাকর্মীরা মানুষের বিপদে-আপদে কতটা পাশে দাঁড়াচ্ছেন এবং সামাজিক দায়িত্ব কতটা পালন করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
যুবদলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তাঁরা বলেন, সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে মানুষের সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে হবে। এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, মাদক প্রতিরোধ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুবকদের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত আলোচনা সভা
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক ফজলুল কবির ফয়সালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভাটি পরিচালনা করেন আবদুল্লাহ আল মামুন।
সভায় বিশেষ অতিথি ও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আলম শিকদার, সদস্যসচিব মাহমুদুর রহমান রিপন, নোয়াখালী আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আজম খান, বসুরহাট পৌর বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল মতিন লিটন, সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল মামুন, সগীর, মেহেদী হাসান টিপু, ছালেহ উদ্দীন সুমন, ওবায়দুল হক রাফেল, মাজহারুল হক তৌহিদ ও ফরহাদসহ বিএনপি এবং যুবদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
এ সময় উপস্থিত নেতারা যুবদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা, তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনের বিস্তৃতি বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
রাজনীতির পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে যুবকদের সম্পৃক্ত করার তাগিদ
আলোচনা সভায় উঠে আসে, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব। যুবসমাজকে মাদক, অপরাধ ও হতাশা থেকে দূরে রাখতে শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বক্তাদের বক্তব্যে প্রতীয়মান হয়, রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে যুবদলের নেতাকর্মীদের শুধু দলীয় কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং এলাকার সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধান, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে হবে।
বিশেষ করে মাদকবিরোধী সচেতনতা, কিশোর ও তরুণদের অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখা এবং এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
কোম্পানীগঞ্জের রাজনীতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নতুন আলোচনা
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপজেলা। এখানকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতা ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় সংসদ সদস্য ফখরুল ইসলামের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতির আহ্বানকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় সমন্বয় ও সাংগঠনিক তৎপরতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে নির্বাচনের সময়সূচি, প্রার্থী নির্ধারণ কিংবা দলীয় মনোনয়নের বিষয়ে সভায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় প্রস্তুতি কীভাবে এগোয়, তা পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে থাকবে।
অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ার বার্তায় শেষ হয় আয়োজন
যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ আলোচনা সভায় রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সামাজিক শৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা, তরুণদের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং স্থানীয় উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাদক, সন্ত্রাস, দখলবাজি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে যে অবস্থানের কথা তুলে ধরা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার যেন বাস্তব কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয় এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে না পারে।
সামাজিক শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ আয়োজন শেষ হয়।