• সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:২০ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
শিরোনাম
গাজীপুরে মেট্রিক্স গার্মেন্টসে আগুন, ৬৭ জনকে জীবিত উদ্ধার আটতলা ভবনের তৃতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ড, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট নারীর মেসেঞ্জারে পুরুষাঙ্গের ছবি পাঠানোর অভিযোগ মোঃ দিদারের বিরুদ্ধে, সাইবার আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা, মালিকানা ও ট্রাস্ট নিয়ে পুরোনো বিরোধ: ২০১৪ সালের জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে একাধিক গুরুতর অসংগতি ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ বন্ধে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মাদক-সন্ত্রাস, দখলবাজি ও চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গড়তে ফখরুল ইসলাম এমপির আহ্বান হাতিয়ায় জাতীয় যুব দিবস ২০২৬ উদযাপন: যুব র‍্যালি, ঋণের চেক বিতরণ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত ৮ মামলার বাধা পেরিয়ে এবার ইলিয়টগঞ্জ উত্তর ইউপির চেয়ারম্যান হওয়ার প্রত্যাশায় দুলাল সরকার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগ, থোয়াইচিং মং শাককে সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের কারণ দর্শানোর নোটিশ মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না: এমপি নূরুল ইসলাম নয়ন সাংবাদিক অরিত্র কুন্ডুকে কনডেম সেলে রাখার অভিযোগ: ২৪ ঘণ্টার আইনি আলটিমেটাম, অন্যথায় হাইকোর্টে রিট পুরোনো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে বিজিবির বিরুদ্ধে অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারে সতর্ক করল সীমান্তরক্ষী বাহিনী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে বাংলাদেশ–জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক অগ্রগতি: ১ লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা, দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা; জ্বালানি, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সহযোগিতার দিগন্ত উন্মোচন

বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ ডেস্ক রিপোর্ট / ৩২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

 

বাংলাদেশ–জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক অগ্রগতি: ১ লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্য, দুই লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
তারেক রহমান–সানায়ে তাকাইচি শীর্ষ বৈঠকে জ্বালানি, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সহযোগিতা; যৌথ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে দুই দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক বাংলাদেশ প্রথম সংবাদ

বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় এবং কৌশলগত অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে জাপান সফরে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন, আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বিএসএস) প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বৈঠকের এসব বিষয় উঠে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরসংক্রান্ত বক্তব্যে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির প্রত্যাশা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ককে বাংলাদেশের মানুষের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক সুযোগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের পথে কাজে লাগানো।

এ সফরকে কেন্দ্র করে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে আগামী পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ কোটি জাপানি ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্য এবং প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। পাশাপাশি জ্বালানি খাতে আর্থিক সহযোগিতা, বাংলাদেশ–জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব, উচ্চগতির রেল যোগাযোগ এবং বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা BIG-B উদ্যোগকে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ভিত্তিতে নতুন পথচলা

বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাপান অন্যতম প্রথম স্বীকৃতিদাতা দেশ হিসেবে দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপান বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্কের ভিত্তি নির্মাণে তাঁর বাবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। একই সঙ্গে তাঁর প্রয়াত মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জাপান সফর ও দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও তুলে ধরেন।

এই বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনগণের কল্যাণকে কেন্দ্র করে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

শীর্ষ বৈঠকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার কথাও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাঁচ বছরে ১ লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্য

সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক হলো বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা। আগামী পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ কোটি জাপানি ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ৬ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্যের কথা যৌথ বিবৃতির ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

এই সম্ভাব্য বিনিয়োগের সঙ্গে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশাও যুক্ত রয়েছে। শিল্প উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কারিগরি দক্ষতা অর্জন, আধুনিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় প্রবেশের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সম্প্রসারণের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।

তবে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা এবং বাস্তবে বিনিয়োগ সম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়। প্রকল্পভিত্তিক চুক্তি, অর্থায়ন, বাস্তবায়ন সময়সূচি এবং কর্মসংস্থানের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারিত হওয়ার পরই এ উদ্যোগের পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তায় জাপানের সহযোগিতা

অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্প উৎপাদন এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জাপানের পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া উদ্যোগের আওতায় ৫ হাজার কোটি জাপানি ইয়েনের জরুরি আর্থিক সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩২ কোটি মার্কিন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য জাপানের ঋণসহায়তার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

জ্বালানি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারিত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে সহায়তার চূড়ান্ত শর্ত, অর্থ ছাড়ের সময়সূচি এবং অর্থের ব্যবহারসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হলে প্রকৃত আর্থিক প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে।

বাংলাদেশ–জাপান টেক পার্ক: প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সম্ভাবনা

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা এবং দেশে উদ্ভাবন ও গবেষণার পরিবেশ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ–জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রস্তাবিত উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন এবং উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ধরনের প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠিত হলে জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয়, বিনিয়োগকারী, দেশীয় উদ্যোক্তা এবং দক্ষ তরুণদের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, গবেষণা, উদ্ভাবন, নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে প্রযুক্তি পার্কের কার্যকর সাফল্যের জন্য প্রয়োজন হবে উপযুক্ত অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি, গবেষণায় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও আধুনিক পরিবহন

বাংলাদেশ ও জাপানের আলোচনায় মহাকাশবিজ্ঞান এবং স্যাটেলাইট প্রকৌশলে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টিও স্থান পেয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা উন্নয়নে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

এ ছাড়া দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরের মধ্যে উচ্চগতির রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

উন্নত রেল যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হলে যাতায়াতের সময় কমানো, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর সংযোগ বৃদ্ধি এবং মানুষের চলাচল সহজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে উচ্চগতির রেলসহ বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যয় নির্ধারণ, পরিবেশগত প্রভাব, অর্থায়নের উৎস এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।

BIG-B উদ্যোগে যৌথ সমৃদ্ধির নতুন কাঠামো

শীর্ষ বৈঠকের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা Bay of Bengal Industrial Growth Belt (BIG-B) উদ্যোগকে ‘BIG-B for Shared Prosperity’ বা যৌথ সমৃদ্ধির নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত।

এই উদ্যোগে জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাপান ও বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতিসংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদনেও এ উদ্যোগের নতুন কাঠামোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সমুদ্রবন্দর, সড়ক, রেল, শিল্পাঞ্চল ও জ্বালানি অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়ন ঘটলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে মাতারবাড়ী–মহেশখালী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে জ্বালানি, শিল্প ও লজিস্টিকসের সমন্বিত উন্নয়নের সম্ভাবনা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এ উদ্যোগের সুফল নিশ্চিত করতে প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা, বিনিয়োগের কার্যকারিতা এবং স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি ও যৌথ কমিশন

বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (Economic Partnership Agreement—EPA) দ্রুত কার্যকর করার বিষয়েও দুই পক্ষের আলোচনা হয়েছে। চুক্তিটি কার্যকর হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বাংলাদেশের পণ্যের জন্য জাপানের বাজারে সুযোগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে।

এ ধরনের কমিশন গঠিত হলে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করা, প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকটে জাপানের ভূমিকার প্রত্যাশা

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য জাপানের অব্যাহত মানবিক সহায়তার প্রতি বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদাপূর্ণভাবে এবং টেকসই উপায়ে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপানের সক্রিয় সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি প্রয়োজন।

প্রত্যাবাসন অবশ্যই স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই হতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাপানসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কূটনৈতিক ও মানবিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় জাপানের অবদান

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় জাপান গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। অবকাঠামো, যোগাযোগ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দুই দেশের সহযোগিতা দীর্ঘদিনের।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে জাপানের বন্ধুত্ব, উদারতা ও দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশের জনগণের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি, জাপান সরকার এবং দেশটির জনগণকে উষ্ণ আতিথেয়তা ও বাংলাদেশের প্রতি অব্যাহত আস্থার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।

দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হলে এই বন্ধুত্বের ভিত্তি ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হতে পারে।

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের গুরুত্ব

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কেবল সম্ভাবনা তুলে ধরা যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, স্বচ্ছ নীতিমালা, কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সহজ বাণিজ্যপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও জরুরি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থবহ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সম্ভাব্য দুই লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাস্তবে সৃষ্টি হলে তার গুণগত মান, স্থায়িত্ব, শ্রমিকের অধিকার এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সম্পর্কের নতুন অধ্যায়: প্রত্যাশা থেকে বাস্তবায়ন

বাংলাদেশ–জাপান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও ঘোষণাগুলো কতটা কার্যকর চুক্তি, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে রূপ নেয় তার ওপর।

১ লাখ কোটি ইয়েন পর্যন্ত সম্ভাব্য বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা, জ্বালানি নিরাপত্তায় সহযোগিতা, বাংলাদেশ–জাপান টেক পার্কের প্রস্তাব এবং আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য প্রকল্পভিত্তিক চুক্তি, অর্থায়ন, বিনিয়োগের সময়সূচি এবং কর্মসংস্থানের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তব অর্জনের মধ্যে স্বচ্ছতা বজায় থাকবে।

সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা সামনে এনেছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হোক, দুই দেশের জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ুক এবং বন্ধুত্বের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাক—এটাই এ সফরকে ঘিরে প্রত্যাশা।

তথ্যসূত্র: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর ও শীর্ষ বৈঠকসংক্রান্ত প্রকাশিত বক্তব্য; জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বিএসএস); দ্য ডেইলি স্টার; ২৭ অক্টোবর ২০২৬।

 

 


More News Of This Category
bdit.com.bd