সরাপপুর মৌজায় জমিতে গাছের চারা রোপণ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের প্রস্তুতির অভিযোগ; বাধা দিতে গেলে সাবেক সেনা সদস্যকে গালিগালাজ ও মারধরের হুমকি, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পুলিশের
হাফিজুর রহমান, যশোর প্রতিনিধি
যশোরের কেশবপুর উপজেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্টের মালিকানাধীন ৬৮ দশমিক ৭৫ শতক জমি জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ২ নম্বর সাগরদাঁড়ী ইউনিয়নের রঘুরামপুর ও বরুয়ামপুর এলাকার কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মোঃ সামছুর রহমান লাভলু (৬২)। জমির মালিকানা, পূর্ববর্তী দেওয়ানি মামলার রায়, নামজারি এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জমিতে গাছের চারা রোপণ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
এ ঘটনায় মোঃ মিজানুর রহমান ও মোঃ রফিকুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে কেশবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সামছুর রহমান। অভিযোগে তিনি দাবি করেছেন, তাঁর ও তাঁর প্রয়াত বাবার ক্রয়কৃত জমি তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে আদালতে মামলা হয় এবং আদালত সংশ্লিষ্ট জমির ওপর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেন। তা সত্ত্বেও প্রতিপক্ষের লোকজন জমিতে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে দখলের চেষ্টা করছেন বলে তাঁর অভিযোগ।
কেশবপুর থানা পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানানো হয়েছে, তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পাঁচটি দলিলে ৬৮.৭৫ শতক জমি ক্রয়ের দাবি
থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে সামছুর রহমান উল্লেখ করেন, কেশবপুর থানাধীন ১৩ নম্বর সরাপপুর মৌজার এসএ খতিয়ান নম্বর ১১২ এবং এসএ দাগ নম্বর ৫৬৬-এর অন্তর্ভুক্ত মোট ১ একর ৪৫ শতক জমির মধ্যে পাঁচটি পৃথক দলিলের মাধ্যমে তিনি ও তাঁর বাবা ৬৮ দশমিক ৭৫ শতক জমি ক্রয় করেন।
পরবর্তী সময়ে জমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য তাঁরা ভাগবণ্টনসংক্রান্ত একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নম্বর ৯৪/১৩। অভিযোগকারীর দাবি, ওই মামলায় তাঁরা আদালতের রায় পান এবং পরবর্তী সময়ে জমির নামজারি সম্পন্ন করেন। নামজারি খতিয়ান নম্বর ২৫-৬৩৪।
তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছর পর্যন্ত জমির ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে নিয়মিত দাখিলা সংগ্রহ করেছেন। এসব দলিল, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের ভিত্তিতে তাঁরা সংশ্লিষ্ট জমি দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছিলেন।
তবে জমির প্রকৃত মালিকানা, দলিলের ধারাবাহিকতা, রেকর্ডের অবস্থা এবং আদালতের রায়ের কার্যকর পরিধি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
জমি নিয়ে নতুন বিরোধ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্যের অভিযোগ
অভিযোগকারী সামছুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে ওই জমি নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
তাঁর দাবি, পরবর্তী মামলায় বিজ্ঞ আদালত তফসিলভুক্ত জমির ওপর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আদালতের এমন নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্রতিপক্ষের লোকজন জমিতে গাছের চারা রোপণ, বাউন্ডারি নির্মাণের প্রস্তুতি এবং অন্যান্য কার্যক্রম শুরু করেন।
সামছুর রহমানের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে জমির দখল নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে তাঁর জমির স্বাভাবিক ভোগদখল ও আইনগত অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশটি কোন তারিখে দেওয়া হয়েছে, আদেশে ঠিক কী ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বর্তমানে মামলাটি কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে আদালতের আদেশ অমান্যের অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট আদেশের সত্যায়িত কপি ও মামলার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
জমিতে গিয়ে বাধা দিলে গালিগালাজ ও প্রাণনাশের আশঙ্কার অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে সামছুর রহমান উল্লেখ করেন, গত ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখ সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে তিনি নালিশি জমিতে গিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেখতে পান। এ সময় জমিতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে এবং তাঁদের বাধা প্রদান করলে অভিযুক্তরা তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হন।
অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁকে বিভিন্ন অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়। এতে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, প্রতিপক্ষের লোকজন প্রভাব বিস্তার করে জমি নিয়ে বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছেন। ভবিষ্যতে তাঁরা আরও কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তবে ঘটনাস্থলে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল, কারা উপস্থিত ছিলেন এবং অভিযোগে উল্লিখিত হুমকির প্রকৃতি কী ছিল, তা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও পুলিশের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সাক্ষী হিসেবে ইউপি সদস্যসহ তিনজনের নাম উল্লেখ
সামছুর রহমান তাঁর লিখিত অভিযোগে ঘটনার সাক্ষী হিসেবে তিনজনের নাম উল্লেখ করেছেন।
তাঁরা হলেন—মোছাঃ নাজমুন নাহার (৫০), ডা. শিমুল হোসেন (৪০), স্থানীয় ইউপি সদস্য এবং সাদেকুর রহমান হৃদয় (১৯)। অভিযোগকারীর দাবি, তাঁরা ছাড়াও স্থানীয় আরও অনেকে জমি নিয়ে বিরোধ এবং ঘটনার বিষয়ে অবগত রয়েছেন।
অভিযোগপত্রে সাক্ষীদের নাম ও পরিচয় উল্লেখ থাকলেও তাঁরা প্রত্যেকে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে জমি নিয়ে বিরোধের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য হিসেবে আইনের প্রতি আস্থার কথা জানালেন অভিযোগকারী
লিখিত অভিযোগে সামছুর রহমান নিজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি আইন ও শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
তাঁর দাবি, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে না জড়িয়ে প্রথমে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সফল না হওয়ায় এবং জমি নিয়ে বিরোধ অব্যাহত থাকায় তিনি শেষ পর্যন্ত থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে বাধ্য হয়েছেন।
তিনি প্রশাসনের কাছে জমির বিষয়ে আইনগত অবস্থান যাচাই, আদালতের আদেশের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
থানার বক্তব্য: অভিযোগ পেয়েছি, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে
এ বিষয়ে কেশবপুর থানার অফিসার ইনচার্জের কাছে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পুলিশের এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সামনে রয়েছে। তবে অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে কি না, তদন্তের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হয়েছে এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
জমি বিরোধে আদালতের নির্দেশনা কতটা মানা হচ্ছে, উঠছে প্রশ্ন
বাংলাদেশে জমিজমা নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের একটি পরিচিত সমস্যা। জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি, দখল এবং উত্তরাধিকারসংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে একই জমি নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এসব বিরোধের নিষ্পত্তির জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়া নাগরিকদের আইনগত অধিকার।
কোনো আদালত নির্দিষ্ট জমির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলে সংশ্লিষ্ট আদেশের পরিধি ও নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের আদেশ অমান্য করে কোনো পক্ষ নিজ উদ্যোগে জমির অবস্থার পরিবর্তন বা বিরোধপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে কি না, তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে শুধু অভিযোগকারীর বক্তব্য নয়, অভিযুক্তদের বক্তব্য, জমির দলিল, পূর্ববর্তী দেওয়ানি মামলার রায়, বর্তমান মামলার আদেশ, নামজারি খতিয়ান এবং ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা পর্যালোচনা করা জরুরি।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত সমাধানের প্রত্যাশা
কেশবপুরের এ জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের সংঘাত, অপ্রীতিকর ঘটনা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসনের উচিত জমির অবস্থান, দখল, দলিলপত্র এবং আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা। একই সঙ্গে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ করে তাঁদের দাবির ভিত্তিও যাচাই করা প্রয়োজন।
একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যের জমি নিয়ে বিরোধ হোক কিংবা সাধারণ কোনো নাগরিকের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ—সব ক্ষেত্রেই আইনের আশ্রয় ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সমান। কোনো পক্ষ যেন পেশিশক্তি বা প্রভাব খাটিয়ে অন্য পক্ষের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
এখন দেখার বিষয়, আদালতের আদেশ ও জমির কাগজপত্র যাচাই করে কেশবপুর থানা পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসন কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করাই হবে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশিত পথ।
সংবাদসূত্র: অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মোঃ সামছুর রহমানের কেশবপুর থানায় দাখিল করা লিখিত অভিযোগ এবং কেশবপুর থানা পুলিশের বক্তব্য।
প্রতিবেদক: হাফিজুর রহমান, যশোর প্রতিনিধি।