জনৈতিক নেতৃত্বের প্রভাব কি খুলনার সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রতিফলিত হয়েছে, নাকি রাজনৈতিক অর্জনের তুলনায় জনসাধারণের প্রত্যাশা এখনো অনেক বেশি?
বিশেষ প্রতিবেদক, খুলনা:
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র খুলনায় একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। প্রায় প্রতিটি সরকারের আমলেই খুলনা অঞ্চল থেকে মন্ত্রী কিংবা প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রী করার সংস্কৃতি দেখা গেছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে—এই প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব খুলনাবাসীর ভাগ্যোন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখতে পেরেছেন? অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিল্পায়ন কিংবা যোগাযোগ ব্যবস্থায় একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া হয়ে খুলনা আজ দেশের অন্যতম অবহেলিত ও বৈষম্যের শিকার এক বিভাগীয় শহরে পরিণত হয়েছে।
ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চল হাতছাড়া: শিল্পহীন খুলনার করুণ দশা
খুলনায় একসময় শিল্পকারখানার সুবাতাস থাকলেও গত দুই দশকে একের পর এক ঐতিহ্যবাহী মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন করে কোনো ভারি শিল্প বা কর্মসংস্থান গড়ে ওঠেনি।
ইপিজেড স্থানান্তর: খুলনায় একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) বাস্তবায়নের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা স্থানান্তরিত হয়ে চলে যায় যশোরে।
অর্থনৈতিক অঞ্চল ঝুলন্ত: খুলনা সদর সংলগ্ন বটিয়াঘাটা ও রূপসা উপজেলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল (Economic Zone) গড়ে তোলার জোরালো প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
কর্মসংস্থানের অভাবে রূপসা পাড়ের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পনগরী থেকে প্রতিনিয়ত তরুণ ও দক্ষ জনগোষ্ঠী মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। দেশের সব বিভাগীয় শহরে যেখানে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে খুলনা দেশের একমাত্র ব্যতিক্রমী বিভাগীয় শহর—যেখানে উল্টো জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। কয়েকটি উঁচু ভবন আর বাহ্যিক অবকাঠামোকে ‘উন্নয়ন’ বলা হলেও বাস্তবে এটি খুলনার অর্থনীতির ভঙ্গুর চিত্রই প্রকাশ করে।
পদ্মা সেতু ও রেল নেটওয়ার্ক: রুট পরিকল্পনায় ভুল সিদ্ধান্ত ও আঞ্চলিক বৈষম্য
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের রুটিং নিয়েও চরম ক্ষোভ রয়েছে খুলনাবাসীর মধ্যে। তৎকালীন মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতারা উদ্যোগ নিলে এই রুটটি ‘পদ্মা সেতু-ফুলতলা’ হয়ে সহজেই খুলনা শহরের কাছাকাছি সংযুক্ত হতে পারতো। কিন্তু তা না হয়ে রুট চলে যায় পদ্মা সেতু থেকে যশোর সিংগিয়া পর্যন্ত।
ডুমুরিয়া-ফুলতলাবাসীর আক্ষেপ: ওই রুটে একজন হেভিওয়েট মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও ডুমুরিয়া ও ফুলতলাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি উপেক্ষিত থেকে গেছে।
ট্রেন থামানো ও আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব: রুট পরিবর্তনের কারণে খুলনাবাসীকে চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, খুলনার জন্য কোনো নতুন ট্রেন বা রুটের ঘোষণা এলেই পার্শ্ববর্তী যশোর অঞ্চলের পক্ষ থেকে রেলপথ অবরুদ্ধ করার হুমকিসহ নানামুখী চাপ তৈরি করা হয়। সচেতন মহলের মতে, যদি রেলপথটি ফুলতলায় যুক্ত হতো, তবে খুলনার মানুষ ২০ কিলোমিটার এগিয়ে গিয়েও কাঙ্ক্ষিত ট্রেন ধরতে পারতো। বিপরীতে যশোরের যাত্রীরাও মাত্র ১০ কিলোমিটার এগোলেই সিংগিয়া হয়ে যাতায়াত নিশ্চিত করতে পারতেন। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে আজ দুই আঞ্চলিক প্রতিবেশীর মধ্যে কৃত্রিম বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে।
রেলের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনে খুলনার সঙ্গে বৈষম্য
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের সদর দপ্তর রাজশাহীতে অবস্থিত হওয়ায় নতুন কোচ এবং রোলিং স্টক বণ্টনের ক্ষেত্রে খুলনা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ।
বিবরণরাজশাহী অঞ্চলখুলনা অঞ্চল (সম্ভাব্য)
নতুন সংগৃহীত কোচের ভাগ
সিংহভাগ (প্রায় ৫০%)
নামমাত্র ভাগ
ভারত থেকে আমদানিকৃত ২০০ নতুন কোচ
আনুমানিক ৫টি নতুন ট্রেন
সর্বোচ্চ ১-২টি ট্রেন
রেলওয়ের যাত্রী চাহিদা এবং রাজস্ব আয়ের দিক থেকে খুলনা সবসময় এগিয়ে থাকলেও বণ্টনের ক্ষেত্রে রাজশাহীর পাল্লাই ভারী থাকে। এই স্পষ্ট অন্যায্য বণ্টনের বিরুদ্ধে অতীতে খুলনার কোনো রাজনৈতিক নেতাকে জোরালো প্রতিবাদ বা আওয়াজ তুলতে দেখা যায়নি।
ক্রীড়াঙ্গনে ধস: শেখ সোহেল ও ‘শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম’
ক্রীড়াপ্রেমী শহর খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম একসময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ এবং বিপিএল (BPL)-এর নিয়মিত ভেন্যু ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (BCB) প্রভাবশালী পরিচালক ও বিসিবি সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করা খুলনা অঞ্চল থেকে নির্বাচিত ক্রীড়া সংগঠক শেখ সোহেল থাকা সত্ত্বেও খুলনার ক্রিকেট ধীরে ধীরে নির্বাসিত হয়েছে।
নিজের পরিবারের নামে নামকরণ করা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এই স্টেডিয়ামটিকে আধুনিকায়ন বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্টেডিয়ামটি আজ ম্যাচহীন অলস পড়ে রয়েছে, যা খুলনা অঞ্চলের ক্রিকেট ভক্ত ও উদীয়মান খেলোয়াড়দের হতাশ করেছে।
আলোর মুখ দেখেনি খান জাহান আলী বিমানবন্দর
খুলনাবাসীর গত কয়েক দশকের অন্যতম প্রধান দাবি ‘খান জাহান আলী বিমানবন্দর’। একের পর এক জমি অধিগ্রহণ ও বারবার প্রকল্প মেয়াদের পরিবর্তন হলেও বিমানবন্দরটির কাজ চূড়ান্ত রূপ নেয়নি। একটি বিভাগীয় শহর এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মংলা ও সুন্দরবনসংলগ্ন পর্যটন সম্ভাবনাময় এলাকা হওয়া সত্ত্বেও খুলনাবাসী একটি কার্যকর বিমানবন্দর থেকে এখনো বঞ্চিত।
নেতৃত্ব বনাম জনদুর্ভোগ: খুলনা বনাম যশোর
স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, যশোর অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তুলনামূলকভাবে জনগণকে সাথে নিয়ে নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ে সোচ্চার ছিলেন। অন্যদিকে, খুলনায় একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতা থাকা সত্ত্বেও তারা খুলনার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ও জনদাবিকে উপেক্ষা করে নিজেদের আখের গোছাতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দূরদর্শিতার অভাব এবং নিজ পকেট ভারী করার রাজনীতির কারণে আজ অবহেলার শিকার তিলোত্তমা খুলনা। নগরবাসীর দাবি—অবিলম্বে বিমানবন্দর চালুকরণ, শিল্পায়ন, বন্ধ জুটমিল পুনরায় চালু এবং রেলে খুলনার ন্যায্য হিস্যা সুনিশ্চিত করতে দলমত নির্বিশেষে নতুন দিনের আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।